নতুন হেলিপ্যাড দেখানো থেকে শুরু করে পূর্বসূরিকে ব্যঙ্গ করা ছবি–হোয়াইট হাউসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে সবকিছুই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চীনা রাষ্ট্রপ্রধানকে নিজের ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ হিসেবে তুলে ধরতে ট্রাম্পের তোড়জোড় ছিল স্পষ্ট। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, শি জিনপিংও কি বিষয়টিকে সেভাবে দেখছেন?
বার্তা সংস্থা এএফপি ওয়াশিংটন থেকে এ খবর জানিয়েছে।
হোয়াইট হাউসে শি’র সফর ঘিরে অভ্যর্থনার কোনো কমতি রাখেননি ট্রাম্প। বারবার চীনা প্রেসিডেন্টের বাহু স্পর্শ করে তাদের ‘দারুণ বন্ধুত্বের’ প্রশংসা করেন তিনি।
মাঝেমধ্যে শিকেও এই আবহে তাল মেলাতে দেখা গেছে। হোয়াইট হাউসের কলোনেডে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের ছবি দেখানোর সময় সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ছবির জায়গায় রাখা ছিল একটি স্বয়ংক্রিয় সই করার যন্ত্র (অটোপেন)।
ট্রাম্পের এক সহযোগীর পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা যায়, সেটি দেখে শি হাসলে ট্রাম্প তার বাহুতে হাত রাখেন। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, আগের মেয়াদের এক বৈঠকের ছবির দিকে আঙুল উঁচিয়ে শিকে দেখাচ্ছেন ট্রাম্প।
এর আগের দিন তো শিকে স্বাগত জানাতে সোজা বিমানবন্দরে হাজির হয়ে যান ট্রাম্প। কোনো চীনা নেতাকে অভ্যর্থনা জানাতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এভাবে বিমানবন্দরে যাওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। তবে গত মে মাসে ট্রাম্প যখন বেইজিং যান, শি কিন্তু এমন কোনো আলগা খাতির দেখাননি।
বৃহস্পতিবার এই প্রদর্শনী চূড়ান্ত করতে শিকে হোয়াইট হাউসের দক্ষিণ লনে সদ্য নির্মিত বিশাল হেলিপ্যাডে নিয়ে যান ট্রাম্প। সেখান থেকে ঘুরিয়ে দেখান মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ হেলিকপ্টার ‘মেরিন ওয়ান’।
এরপর সংবাদকর্মীরা যখন ইরান, তাইওয়ান বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রশ্ন করতে যান, তা এড়িয়ে কথা ঘোরাতে শুরু করেন ট্রাম্প। শি-এর দিকে নির্দেশ করে তিনি বলেন, ‘তিনি গ্রানাইট খুব পছন্দ করেন। তিনি পাথরের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। আরও অনেক কিছুর পাশাপাশি ভালো গ্রানাইটও চেনেন।’ সারা দিন গম্ভীর মুখে থাকা শি এ সময় মৃদু হাসেন।
ট্রাম্পের উছ্বাস এতটাই বেশি ছিল যে, ওভাল অফিসে বসে চীনা সাংবাদিকদেরও ‘সবচেয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সংবাদকর্মী’ বলে প্রশংসা করেন। অথচ এর মাত্র কয়েক দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি সংবাদমাধ্যমকে হোয়াইট হাউসে ঢোকা সাময়িকভাবে বন্ধ করেছিলেন তিনি।
প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দেখানো এবং তাদের ক্ষমতার প্রশংসা করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে ট্রাম্পের। তবে আবার ক্ষমতায় ফিরে শি-এর সঙ্গে ভাব জমাতে তাকে যতটা উদগ্রীব দেখাচ্ছে, তা নজর কাড়ার মতো। প্রথম মেয়াদের সময় বাণিজ্য ও কোভিডের মতো ইস্যুতে চীনের বিরুদ্ধে তপ্ত বাক্যবাণ ছোড়া ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এটি বড় একটি পরিবর্তন।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শীর্ষ চীনবিষয়ক উপদেষ্টা রায়ান হাসের মতে, নির্ধারিত সফরসূচি কাটছাঁট করে হেলিপ্যাড দেখানোর জন্য সময় বের করা মোটেও সাধারণ বিষয় নয়। এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘শি কথা বলেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আর কূটনীতির ভাষায়, আর ট্রাম্প চলেন ব্যক্তিগত রসায়নে। দুই নেতার দর্শনের পার্থক্য এখানেই স্পষ্ট।’
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের রসিকতায় শি হাসলেও মুখে কিন্তু আলগা আবেগ ছিল না। ট্রাম্প যখন তাদের ‘বন্ধুত্ব’ নিয়ে গলে যাচ্ছিলেন, শি তখন দুই দেশের ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের দায়িত্বের’ কথা বলেন। একই সঙ্গে তাইওয়ান, ইরান কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে বেইজিংয়ের অবস্থানের ‘লাল রেখা’ বা চূড়ান্ত সীমানাও স্মরণ করিয়ে দেন।
বিশ্লেষকদের মতে, শি হয়তো ট্রাম্পকে এই পরিবেশ উপভোগ করতে দিচ্ছেন, তবে নিজে হাঁটছেন হিসাব কষে। কারণ তিনি জানেন, ট্রাম্পের এই মেয়াদের মেয়াদ আর বছর দুয়েকের কিছু বেশি। কিন্তু চীনের সম্মান আর নীতি দীর্ঘমেয়াদি।
আমেরিকান ইউনিভার্সিটির চীনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ জুডিথ শাপিরো বলেন, ‘বিষয়টি এমন যে, পরাশক্তি হিসেবে চীন তার প্রাপ্য সম্মানটুকুই আদায় করে নিচ্ছে। শি-এর জন্য হোয়াইট হাউসে রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা পাওয়াটা তার প্রত্যাশার বাইরে কিছু নয়, এটি স্বাভাবিক।’


