নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যাকে জলবায়ু পরিবর্তনের ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবে উল্লেখ করে বিশ্বনেতাদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ।
বৃহস্পতিবার রাতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, আগস্টের বন্যা শুধু নেপালের স্থানীয় দুর্যোগ ছিল না, এটি ছিল পুরো বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
বালেন্দ্র শাহ বলেন, ‘প্রায় তিন বছর আগে মাউন্ট এভারেস্টের ছায়ায় দাঁড়িয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব মানবজাতিকে আসন্ন জলবায়ু বিপর্যয়ের বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। বিশ্বের ছাদ থেকে দেওয়া সেই সতর্কবার্তা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে শোনা হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘নেপাল শুনেছিল, আমাদের জনগণ শুনেছিল, বিশ্বের বিজ্ঞানীরা শুনেছিলেন। তারা প্রমাণসহ বারবার সতর্ক করেছেন। কিন্তু আমরা রাজনৈতিক নেতারা সেই সতর্কতাকে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছি।’
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ গলা এবং পারমাফ্রস্টের অস্থিতিশীলতার সঙ্গে সাম্প্রতিক বন্যার যোগসূত্র রয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীরা। ওই দুর্যোগে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং আরও অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন।
শাহ বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণে নেপালের অবদান এক-দশমাংশেরও কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশটির হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে, পাহাড়ের ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে এবং নদীর গতিপ্রকৃতি অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
‘আমরা এই সংকট সৃষ্টি করিনি, অথচ এর জন্য বিপুল মূল্য দিচ্ছি,’ বলেন ৩৬ বছর বয়সী শাহ। সাবেক র্যাপার ও প্রকৌশলী শাহ চলতি বছর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়া সবচেয়ে কম বয়সী সরকারপ্রধান।
তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন কোনো সীমান্ত মানে না। হিমবাহ ও বন্যা পাসপোর্ট বা ভিসা নিয়ে চলাচল করে না।’
নেপালের প্রায় ৯৯ শতাংশ বিদ্যুৎ জলবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদিত হয়। সাম্প্রতিক বন্যায় অনেক শ্রমিক টানেলের ভেতর আটকা পড়েছিলেন বলেও জানান তিনি।
শাহ আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন ব্যবস্থাকে অপর্যাপ্ত ও অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক বলে সমালোচনা করেন। জলবায়ু দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র দেশগুলোর জন্য কয়েক বছর আগে সম্মত হওয়া ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিলের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্যোগের সময় সহায়তা পেতে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে বছরের পর বছর আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে ঘুরতে হওয়া উচিত নয়। তার ভাষায়, ‘ঘরে আগুন লাগলে কোনো পরিবারকে ৫০টি ফরম পূরণ করতে বলা হয় না। আমরা ব্যবস্থা নিই। জলবায়ু ন্যায়বিচার বলতে এটাই বোঝায়।’
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ত্রাণ, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের পাশাপাশি ‘দায়িত্ব, ক্ষতিপূরণ ও সহনশীলতা’ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান শাহ। জলবায়ু পরিবর্তনের ঐতিহাসিক দায় ও ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গটি শিল্পোন্নত পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কিত।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বুধবার জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে বলেন, সাম্প্রতিক দুর্যোগে প্রাথমিক হিসাবে নেপালের ক্ষতির পরিমাণ ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এটি দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৫ শতাংশ এবং বার্ষিক বাজেটের এক-তৃতীয়াংশের সমান।
তিনি বলেন, এই বিপর্যয় শুধু মানবিক জরুরি অবস্থা নয়; এটি উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও দেশের জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের জন্যও সংকট তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র চলতি সপ্তাহে নেপালের বন্যা-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের জন্য ৩ কোটি ১০ লাখ ডলার সহায়তা ঘোষণা করেছে। এর ফলে নেপালকে যুক্তরাষ্ট্রের মোট আর্থিক সহায়তা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারে। তবে নেপালের প্রয়োজনের তুলনায় এই অর্থ ১ শতাংশেরও কম।
জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর বলেন, নেপালের এই দুর্যোগ দেখিয়ে দিচ্ছে জলবায়ু সংকট মানুষের মোকাবিলা করার সক্ষমতার চেয়েও দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। তার মতে, হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে এশিয়ার প্রধান নদীগুলোর পানির প্রবাহ হুমকির মুখে পড়তে পারে, যা প্রায় ২০০ কোটি মানুষের পানি সরবরাহকে ঝুঁকিতে ফেলবে।


