চলতি বছর শেষ হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আরও দুটি বৈঠক করবেন বলে জানিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় সফর শেষে দেশে ফেরার আগে এ কথা জানান তিনি।
বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়, আরও দুই দফা বৈঠক হলে এর ফলে ২০২৬ সালে বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের নেতাদের মধ্যে সরাসরি আলোচনার সংখ্যা দ্বিগুণ হবে।
বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, শি জিনপিং নভেম্বরে চীনে এশিয়া-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্মেলনের আয়োজন করবেন। তিনি ট্রাম্প ও তার স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্পকে ওই সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
শি জানান, এক মাস পর ফ্লোরিডার ট্রাম্প ন্যাশনাল ডোরাল মায়ামি গলফ ক্লাবে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনেও দুই নেতার আবার দেখা হতে পারে। চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্ট লেডিকে চীন সফরের জন্য স্বাগত জানাই।’
জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যাব এবং আমরা অনেক কথা বলব।’ পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দুই বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

শি জিনপিংয়ের এবারের তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তুমুল সমালোচনাও হয়েছে। অনেকে বলেছেন, সফরে আড়ম্বর বেশি ছিল, বাস্তব ফলাফল কম। তবে ট্রাম্প জানিয়েছেন, শিয়ের সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ ছিল। দুই দেশের বাণিজ্য ও ইরান যুদ্ধ নিয়েও তাদের আলোচনা হয়েছে।
দুই নেতা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন এমন বার্তা দিলেও বাণিজ্য কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এই সপ্তাহে কোনো বড় অগ্রগতি হয়নি। বৈঠক থেকে দৃশ্যমান অর্জন খুব কম এসেছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন বাণিজ্য বিশ্লেষক। এই বৈঠকে দুই দেশ কেবল বাণিজ্য যুদ্ধে বিরতি বাড়িয়ে জানুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাটো ইনস্টিটিউটের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট স্কট লিঙ্কিকোম বলেন, ‘শি জিনপিংকে প্রভাবিত করতে অনেক আড়ম্বর ও আনুষ্ঠানিকতা ছিল, কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছু নেই।’
সাবেক মার্কিন বাণিজ্য কর্মকর্তা ও প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রশাসনের কূটনীতিক জেফ মুন বলেন, ‘বাস্তব ফলাফল ছাড়া আরেকটি শীর্ষ বৈঠক শুধু চীনকে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের সময় পার করার সুযোগ দিচ্ছে, যেখানে উল্লেখযোগ্য ছাড় আদায় করা যাচ্ছে না।’
আরও পড়ুন>>>
ট্রাম্প দেখাচ্ছেন ‘গভীর সখ্য’, শি জিনপিং হাঁটছেন মেপে
শি জিনপিংয়ের জন্য ট্রাম্পের যত আয়োজন
অবশ্য হোয়াইট হাউস সূত্রে এপি জানায়, বৃহস্পতিবার দুই নেতা ৯০ মিনিটের একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। চীনা সরকারের প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, ওই বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন ও কোরীয় উপদ্বীপের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
শুক্রবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানান, তিনি ও শি জিনপিং ইরান যুদ্ধ নিয়েও আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের বৈঠক খুব ভালো হয়েছে। সত্যিই খুব ভালো বৈঠক হয়েছে। কৃষকদের জন্য ভালো, সবার জন্য ভালো।’
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ প্রায় সাত মাসে গড়ালেও চীন তেহরানকে যে কোনো ধরনের সহায়তা দিচ্ছে- এমন অভিযোগের প্রভাব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে চীনে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড পারডিউ শুক্রবার বলেন, ট্রাম্প শি জিনপিংকে ইরানকে সহায়তা না করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কয়েক সপ্তাহ আগেই তাদের স্পষ্ট করে জানিয়েছি, তারা ইরানকে সরাসরি বা পরোক্ষ কোনো ধরনের সহায়তা দিলে, গোয়েন্দা তথ্য, যন্ত্রাংশ কিংবা সামরিক সরঞ্জাম হলেও—তা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গতকালও বিষয়টি খুব স্পষ্ট করে জানিয়েছেন।’
এবারের সফরে ট্রাম্প শি জিনপিংকে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল আর্কাইভ পরিদর্শনে নিয়ে যান। সেখানে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের নেতাকে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলো দেখান।
ট্রাম্প রিপাবলিকান দলের নেতা হিসেবে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাটদের কমিউনিস্ট হিসেবে আখ্যায়িত করার প্রচার চালিয়ে আসছেন। তবে শি জিনপিংকে দেওয়া রাষ্ট্রীয় মর্যাদাপূর্ণ অভ্যর্থনার কারণে ওই বার্তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

ন্যাশনাল আর্কাইভে রাখা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণা, সংবিধান এবং অধিকার সনদের মতো গুরুত্বপূর্ণ নথি সুরক্ষিত কাচের ভেতর থেকে দেখেন শি। এ সময় একজন গাইড তাকে এসব দলিল সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন।
সংবিধান দেখার পর ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, তারা নিজ নিজ দেশের ইতিহাসের বয়স নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু তুলনা করছিলাম। আমাদের বয়স ২৫০ বছর, যা অসাধারণ এবং এ নিয়ে আমরা গর্বিত। কিন্তু তাদের বয়স ছয় হাজার বছর। এই সময়কালের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য আছে, তবে আমরা আমাদের ২৫০ বছর নিয়ে খুবই গর্বিত।’
বৃহস্পতিবার রাতে ট্রাম্প দম্পতি অতিথি শি জিনপিং ও তার স্ত্রী পেং লিইউয়ানের সম্মানে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করেন। এতে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিরাও অংশ নেন।
এর আগে ওই দিন ট্রাম্প শি জিনপিংকে হোয়াইট হাউসের বিভিন্ন নতুন সংযোজন দেখান। এর মধ্যে ছিল প্রেসিডেন্টদের প্রতিকৃতি সংবলিত গ্যালারি, নতুন ১০০ ফুট দীর্ঘ গ্রানাইটের হেলিকপ্টার অবতরণ স্থান (হেলিপ্যাড) এবং নির্মাণাধীন নাচের ঘর (বলরুম)।
মেলানিয়া ট্রাম্প ও পেং লিইউয়ান স্মিথসোনিয়ানের জাতীয় এশীয় শিল্প জাদুঘর পরিদর্শন করেন।


