শি জিনপিংয়ের জন্য ট্রাম্পের যত আয়োজন

শি জিনপিংয়ের জন্য ট্রাম্পের যত আয়োজন
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প-শি বৈঠকে প্রায় একই ধরনের পোশাকে দেখা যায় দুই নেতাকে। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ফাঁকে চীনের প্রেসিডেন্ট  শি জিনপিংকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে শি জিনপিং ও তার স্ত্রী পেং লিয়ুয়ানকে অভ্যর্থনা জানান ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প। বহুল প্রতীক্ষিত এই রাষ্ট্রীয় সফরে দুই দেশের বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা আলোচনার কেন্দ্রে ছিল।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ট্রাম্প-শি বৈঠকের অন্যতম সফলতা হলো- যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্য সমঝোতার মেয়াদ আরও দুই মাস বাড়ানোর সিদ্ধান্ত। গত বছর ‘বুসান চুক্তির’ মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধের অবসান ঘটানো হয়। ওই সমঝোতার মেয়াদ আসন্ন নভেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল।

আপাতত বাড়ল বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, মেয়াদ বাড়ানোর ফলে ওয়াশিংটন ও বেইজিং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আর কী করা সম্ভব, তা খতিয়ে দেখার জন্য আরও সময় পাবে। তবে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধানে পৌঁছানোর পরিবর্তে এই সিদ্ধান্তের ফলে শুল্ক, চীনের পণ্য কেনা, বিরল খনিজ সরবরাহ এবং প্রযুক্তি-সংক্রান্ত বিধিনিষেধের মতো মূল বিষয়গুলোর তাৎক্ষণিক সমাধান না করে পরবর্তী দফার আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।

বেসেন্ট বুধবার বলেন, আগের সমঝোতার আওতায় ওয়াশিংটন থেকে দুই কোটি ৫০ লাখ টন সয়াবিন কেনার শর্ত বেইজিং পূরণ করছে। তবে অন্য কৃষিপণ্য কেনার জন্য এক হাজার ৭০০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে চীন এখনো পিছিয়ে রয়েছে।

রাজকীয় সংবর্ধনায় শি কে হোয়াইট হাউসে বরণ করেন ট্রাম্প। ছবি: এপি/ইউএনবি

 

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলেছেন, বিরল খনিজ সরবরাহও প্রত্যাশার চেয়ে কম হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো বড় ধরনের ব্যবধান রয়ে যাওয়ার আরেকটি ইঙ্গিত এটি। আর খনিজের ওপর নির্ভর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি এক ধরনের অনিশ্চয়তা। আপাতত শুল্কহার কম থাকলেও নীতিগত পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

শি জিনপিংয়ের হোয়াইট হাউস সফরকে ট্রাম্প নিজের পছন্দ অনুযায়ী বদলে যাওয়া ওয়াশিংটনকে পরিচিত করার সুযোগ হিসেবেও ব্যবহার করেন।

ড্রেস টু ইম্প্রেস

এর আগে বেইজিং সফরে ট্রাম্পকে মিং রাজবংশের একটি মন্দির এবং বিদেশিদের জন্য সচরাচর বন্ধ থাকা প্রাচীরঘেরা একটি বাগান ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন শি। এবার ট্রাম্পও ভিন্ন ধরনের আতিথেয়তার মাধ্যমে তার প্রতিদান দেন।

দুই ফার্স্ট লেডির পরনে ছিল কাছাকাছি ডিজাইনের পোশাক। ছবি: এপি/ইউএনবি

 

তবে নেটিজেনদের অবাক করেছে ট্রাম্প-শি ও মেলানিয়া-পেংয়ের পোশাকের সাদৃশ্য। হোয়াইট হাউসে একান্ত বৈঠকে দুই নেতাকেই প্রায় একই রঙের স্যুট-টাই পরতে দেখা যায়। মেলানিয়া-পেংয়ের পোশাক এবং জুতাও ছিল প্রায় একইধরনের ডিজাইনের। নৈশভোজেও ট্রাম্প-শি দুজনই কালো রঙের পোশাক পরেছিলেন।

নৈশভোজে ট্রাম্প-শি। ছবি: এপি/ইউএনবি

 

আরও পড়ুন

ট্রাম্পের মালিকানাধীন একটি গলফ ক্লাবের আদলে রূপান্তরিত রোজ গার্ডেনে বাদ্যের তালে তালে পরচুলা ও তিন-কোনা টুপি পরা মার্কিন সেনারা সারিবদ্ধভাবে কুচকাওয়াজ করে চীনের প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানান। এ সময় আকাশে প্রচণ্ড শব্দে যুদ্ধবিমান ও বোমারু বিমান তাদের অভিবাদন জানিয়ে উড়ে যায়। বিমানগুলোর শব্দ এতটাই তীব্র ছিল যে খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও চমকে উঠেছিলেন।

হোয়াইট হাউসের সাংবাদিকদের যখন দুই নেতার কর্মসূচি কাভার করতে ডাকা হয়, তখন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের আলোচনার পরিবর্তে শিকে মেরিন ওয়ান নামের প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টার এবং সম্প্রতি নতুন করে সাজানো হোয়াইট হাউসের দক্ষিণ প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখান ট্রাম্প।

শি কে হোয়াইট হাউস ঘুরিয়ে দেখান ট্রাম্প। ছবি: এপি/ইউএনবি

 

হোয়াইট হাউসের ওই অংশে নতুন করে প্রেসিডেন্টের প্রতীকসংবলিত একটি বড় হেলিকপ্টার অবতরণস্থল (হেলিপ্যাড) তৈরি করা হয়েছে।

সাংবাদিকেরা নীতিগত আলোচনা নিয়ে জানতে চাইলে ট্রাম্প বিষয়টি এড়িয়ে যান। শি জিনপিংয়ের সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তিনি ভালো মানের গ্রানাইট পছন্দ করেন। আমাদের মধ্যে দারুণ বৈঠক হয়েছে।’

তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিচক্ষণতা’ চান শি

আলোচনায় প্রত্যাশিতভাবেই তাইওয়ান প্রসঙ্গ তোলেন চীনের প্রেসিডেন্ট। দেশটির সরকারি বার্তা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, শি আশা করেন- যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ান প্রশ্নটি ‘বিচক্ষণতার সঙ্গে’ মোকাবিলা করবে। সেই সঙ্গে তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করবে।

যুক্তরাষ্ট্রও এত দিন বলে এসেছে যে তারা তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে ‘সমর্থন’ করে না। ট্রাম্প প্রশাসন এই প্রচলিত মত পরিবর্তন করবে বৈঠকে এমন কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি।

কৌশলগত সংঘাতের ঝুঁকি

ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে শি আবারও ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ তত্ত্বের প্রসঙ্গ তোলেন। এটি এমন একটি তাত্ত্বিক ধারণা, যেখানে বলা হয়- একটি উদীয়মান শক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠিত শক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের দিকে গড়ানোর প্রবণতা তৈরি করতে পারে।

চীনের প্রেসিডেন্টের ভাষায়, ‘যুক্তি দিয়ে চিন্তা করলে এই ঝুঁকি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।’ তবে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে এই প্রসঙ্গ তোলা বিশ্বের দুই বৃহত্তম শক্তির মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা এখনো বিরাজ করার প্রেক্ষাপটকে সামনে আনে।

হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প-শি বৈঠক। ছবি: এপি/ইউএনবি

 

শি বলেন, সহযোগিতা করলে উভয় দেশেরই লাভ হবে এবং সংঘাতে গেলে উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত সংলাপ এবং সংকট প্রতিরোধের আরও শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

অন্যদিকে ট্রাম্প দুই দেশের অভিন্ন ইতিহাসের কথা তুলে ধরে পারস্পারিক সহযোগিতার সম্ভাবনার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, অভিন্ন স্বার্থে কাজ করলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন অনেক কিছু অর্জন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে তিনি জাপানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দুই দেশের বন্ধুত্বের কথাও উল্লেখ করেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে মতপার্থক্য

বর্তমান বিশ্বের অন্যতম আলোচিত প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিষয়েও আলোচনা করেন দুই নেতা। ট্রাম্প আগেই বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ‘অতিবুদ্ধিমত্তা’ বলা উচিত। তিনি জানান, এ ক্ষেত্রে নতুন কোনো নিয়ন্ত্রণমূলক সুরক্ষাব্যবস্থা আরোপের পরিবর্তে বিষয়টি আপাতত ঠিক যেখানে আছে, তিনি সেখানেই রাখতে চান এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ওপর নির্ভর করতে চান।

ট্রাম্প দাবি করেন, চীনের অবস্থানও একই। কিন্তু শি বৃহস্পতিবার বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নেতৃত্বস্থানীয় দুই দেশ হিসেবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েরই প্রযুক্তিটির বিকাশ সঠিকভাবে পরিচালনার দায়িত্ব রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘মানবকল্যাণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা ও দায়িত্ব আমাদের উভয়েরই রয়েছে। এর বিকাশ যেন সব সময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।’

শি জিনপিংয়ের সম্মানে বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের আয়োজিত রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তি উপস্থিত থাকার কথা ছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন গুগলের প্রধান কোম্পানি অ্যালফাবেটের সিইও সুন্দর পিচাই, ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান এবং এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad