নেত্রকোনা পৌরসভার বর্জ্য শোধনাগার এখন ময়লার ভাগাড়

নেত্রকোনা পৌরসভার বর্জ্য শোধনাগার এখন ময়লার ভাগাড়
Advertisement
Advertisement

১৮৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত মগড়া ও ধলাই নদী বেষ্টিত ১ম শ্রেনীর নেত্রকোনা পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিকতা আনতে প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল বর্জ্য শোধনাগার। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ঘটা করে উদ্বোধনও করা হয় এই প্রকল্পটি। কিন্তু উদ্বোধনের পরদিন থেকেই বন্ধ রয়েছে কার্যক্রম। দুই একর জায়গাজুড়ে নির্মিত শোধনাগার এখন পরিণত হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে। ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ, বাড়ছে দূষণ আর দুর্ভোগে পড়েছেন আশপাশের বাসিন্দারা।

২০২৪ সালের ২৭ এপ্রিল উদ্বোধন করা হয় নেত্রকোনা পৌরসভার বাহির চাপড়া এলাকার এই শোধনাগার। প্রায় দুই একর জায়গায় নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১১ কোটি টাকা। কিন্তু উদ্বোধনের পরদিন থেকেই বন্ধ রয়েছে এর কার্যক্রম। এখন শোধনাগারের পুরো এলাকাজুড়ে ময়লার স্তূপ। প্রতিদিন নেত্রকোনা শহরের প্রায় ৪২ মেট্রিক টন জমে থাকা বর্জ্য ফেলা হয় এই স্থানে। শোধনাগারটি বন্ধ থাকায় এসব বর্জ্য জমছে প্রকল্প এলাকায়। পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন সড়ক ও নদীতেও ফেলা হচ্ছে ময়লা। দুর্গন্ধ আর মশা-মাছির উপদ্রবে অতিষ্ঠ আশপাশের মানুষ। আক্রান্ত হচ্ছেন নানা রোগে। জায়গাটি এখন ‘ময়লাকান্দা’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে স্থানীয়দের কাছে।

পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, ২১ দশমিক ০২ কিলোমিটার আয়তনের পৌর শহরের বর্জ্য শোধন করে পরিবেশ দূষণ কমানোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল এই প্রকল্পের। পচনশীল বর্জ্য থেকে জৈব সার এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য থেকে আয়ের পরিকল্পনাও ছিল।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্প এলাকায় সীমানাপ্রাচীর ও একটি ছোট ভবন ছাড়া আর কিছুই নেই। ভবনটিও পরিত্যক্ত। চারপাশে ছড়িয়ে আছে আবর্জনার স্তূপ। শহর থেকে নিয়মিত ট্রাকে করে প্লাস্টিক, পলিথিন, বাজার ও গৃহস্থালির বর্জ্য নিয়ে সেখানে ফেলা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে সব ধরনের বর্জ্য একসঙ্গে ফেলার কারণে ডাম্পিং এলাকাটি রীতিমতো ভরে গেছে। এদিকে পচনশীল বর্জ্য থেকে সারাক্ষণ তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বর্জ্যের স্তূপে ঘুরে বেড়াচ্ছে কুকুর, শিয়ালসহ বিভিন্ন প্রাণী। এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুর্গন্ধ, মশা-মাছির উপদ্রব আর পরিবেশদূষণের কারণে তাদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। একটু বাতাস হলেই আর টেকা যায় না। অসুস্থ পরিবেশে বসবাস করতে হয়। উৎকট দুর্গন্ধে টেকাই দায়। শোধনাগারটি সরিয়ে ফেলার দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের।

স্থানীয় বাসিন্দা খায়রুল মিয়া বলেন,‘অনেক টাকা ব্যয় করে এখানে বাসা তৈরি করেছিলাম। কিন্তু এখন দুর্গন্ধ আর পরিবেশদূষণে টিকতে পারছি না। এই এলাকায় কোনো ভাড়াটে এসে থাকতে চায় না। আত্মীয়স্বজনরা পর্যন্ত আসে না।’

আরও পড়ুন

আতিকুর রহমান নামে একজন বলেন, ‘এখন আর এখানে কেউ জায়গা-জমি কিনতেও আসেন না। কারণ জায়গাটির নামকরণই হয়েছে ময়লাকান্দা।’

গৃহিণী সালনা বেগম বলেন, ‘বাচ্চাদের স্কুলে আনা নেওয়ায় দুর্গন্ধের কারনে নাকে কাপড় দিয়ে যেতে হয়। বাড়ির শিশুদের খেলাধুলা করার সুযোগ নাই গন্ধের কারণে। পরিবারে সব সময় অসুখ লেগেই থাকে। দুর্গন্ধের কারণে ঠিকমতো খাবারও খেতে পারি না। নাকে এখন আর কোনো গন্ধই টের পাই না।

এদিকে শোধনাগারটি চালু না হওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে শহরের নাগরিক জীবনে। নির্ধারিত এই স্থান ছাড়াও শহরের যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। বিশেষ করে জেলা শহরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত মগড়া নদীর থানার মোড়, নাগড়া, সাতপাই, আনন্দবাজার, মোক্তারপাড়া, হাসপাতাল সড়কসহ বিভিন্ন স্থানে মগড়া নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে আবর্জনার স্তূপ।

পৌরবাসী বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী বলেন,‘আধুনিক বর্জ্য শোধনাগারের কাজ কেবল এক জায়গায় ময়লা জমিয়ে রাখা নয়। বর্জ্য সংগ্রহ, বাছাই, শোধন ও পুনর্ব্যবহারের একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা থাকতে হয়। এখানে সেই ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়নি। তাই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল নিয়োগ করে প্রকল্পটি দ্রুত চালু করা দরকার।

পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী হুমায়ুন কবীর বলেন, এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের অধীন ইউজিআইপি-৩ প্রকল্পের আওতায় ২০২০ সালে স্যানিটারি ল্যান্ডফিল নির্মাণ ও বিদ্যমান মলস্লাজ শোধনাগার সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পৌর এলাকার ৪ নং ওয়ার্ডের বাহিরচাপড়া এলাকার চার একর জায়গার ওপর প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পটির কাজ শেষ হয় ২০২৪ সালে। এরপর ওই বছরের ২৭ এপ্রিল প্রকল্পটির উদ্বোধন করা হয়। শোধনাগারের প্রযোজনীয় সরঞ্জামও সেখানে না থাকায় শোধনাগারটি চালু যায়নি। ‘শোধনাগারটি চালু হলে পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় শোধন করা যাবে। তা ছাড়া প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং পচনশীল অংশ থেকে জৈবসার তৈরি করে বিক্রি করা যাবে।

পৌরসভার বর্জ্য শোধনাগারের স্থান সম্প্রতি পরিদর্শন করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক আনোয়ারুল হক। এ সময় তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘ক্লিন সিটি, গ্রিন সিটি’ পরিকল্পনা ও পরিবেশবান্ধব নগর গড়ার অঙ্গীকার করেছেন এবং তা বাস্তবায়নে শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক, কার্যকর ও পরিবেশসম্মত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। ‘আমরা চাই পরিচ্ছন্ন, সবুজ, সুন্দর ও বাসযোগ্য নেত্রকোনা গড়ে তুলতে।’ বলেন তিনি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad