যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির (মক্কা চুক্তি) আওতায় একটি জরুরি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করতে যাচ্ছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান। লোহিত সাগরে ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ক্রমাগত হামলার মুখে সৌদি আরবকে কীভাবে সহায়তা করা যায়, তা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হবে। সৌদি আরবের ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের প্রধান- গ্র্যান্ড মুফতি এরইমধ্যে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সেনাদের জীবন উৎসর্গের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির কাঠামোর আওতায় বৈঠক করেছেন। সেই বৈঠকে হুথি হামলার বিষয়ে প্রত্যেকেই নিন্দা জানিয়েছেন এবং মন্ত্রীরা বলেছেন- সৌদি আরবের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। তিন দেশের সেনাপ্রধানদের নিয়ে একটি জরুরি বৈঠক আয়োজনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
সেনাপ্রধানদের নিয়ে আসন্ন বৈঠকে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবকে সহায়তার উপায় নিয়ে আলোচনা হবে। চুক্তি অনুযায়ী, কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর হামলা হলে সেটিকে সব সদস্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। স্থানীয় একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি হুথিদের কর্মকাণ্ড থেকে ইরানকে দূরে রাখার ইঙ্গিত দেওয়ার পরপরই এই বৈঠকের ঘোষণা আসে।
বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজের ‘স্পেশাল রিপোর্ট উইথ ব্রেট বেয়ার’ অনুষ্ঠানে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘হুথিরা তাদের নিজস্ব কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী।’
এর এক দিন আগে তিনি নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন।
সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি সম্প্রতি ইয়েমেনে সৌদি সমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে হামলা জোরদার করেছে। এতে দেশটিতে ফের গৃহযুদ্ধ তীব্র হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা সৌদি আরবেও বারবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা করেছে। পাশাপাশি লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হামলা চালানোয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশটির তেল সরবরাহ ব্যবস্থাও ব্যাহত হয়েছে।
হুথি বিদ্রোহীরা বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, তারা সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে সৌদি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তারা হুথি বিদ্রোহীদের ছোড়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
এর আগে সৌদি আরব মক্কা, জেদ্দা এবং লোহিত সাগরের তীরে দেশটির প্রধান তেল বন্দর ইয়ানবুসহ কয়েকটি এলাকায় জরুরি সতর্কতা জারি করেছিল।
সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা গ্র্যান্ড মুফতি বৃহস্পতিবার রাতে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থায় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সেনাদের হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জীবন উৎসর্গের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, হুথি গোষ্ঠী ক্ষমতা থেকে উৎখাত না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। কাতারের মধ্যস্থতায় নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমিত আকারে আলোচনার চেষ্টা হয়েছে এবং সরাসরি সংঘাতেও সাময়িক বিরতি দেখা গেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জানান, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরান ওয়াশিংটনের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ইরানের শর্ত পূরণ হলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।
আরাগচি বলেন, ‘সাত দিনের মধ্যে লেবাননসহ সব যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুতা বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বন্দর অবরোধ তুলে নিতে হবে, জব্দ করা অর্থ ছাড় করতে হবে এবং দেশটির তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। শেষ দিনে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে।’
এরপর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ অন্যান্য বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরু হবে বলেও জানান তিনি।
এর আগে বুধবার ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রতিক্রিয়া তেহরান পর্যালোচনা করছে।
এদিকে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে আলোচনা চললেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় শুক্রবার তেলের দাম কমেছে। বৃহস্পতিবার প্রণালিটি দিয়ে মাত্র নয়টি জাহাজ চলাচল করেছে, যা গত ১০ দিনের গড়ের অর্ধেক।


