প্রথমবার কক্ষপথে স্পেসএক্সের স্টারশিপ, ত্রুটি সত্ত্বেও সফল উৎক্ষেপণ

প্রথমবার কক্ষপথে স্পেসএক্সের স্টারশিপ, ত্রুটি সত্ত্বেও সফল উৎক্ষেপণ
টেক্সাসের স্টারবেস থেকে পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন করে স্পেসএক্সের বিশাল রকেট স্টারশিপ। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

টেক জায়ান্ট ইলন মাস্কের মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের স্টারশিপ রকেট প্রথমবারের মতো কক্ষপথে পৌঁছেছে। সোমবার মহাকাশে রকেটটি নতুন স্টারলিংক উপগ্রহ স্থাপন করেছে। ১৪তম পরীক্ষামূলক উড্ডয়নে ইঞ্জিন বিকল হওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই অভিযান শেষ করার বিষয়ে স্পেসএক্সের ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তের মধ্যেও বিশাল আকৃতির এই রকেটটি সফলতা অর্জন করল।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়, মানববিহীন এই মহাকাশ অভিযান শুরুতে ১০ ঘণ্টা চলার কথা থাকলেও স্টারশিপের নিচের স্তরের সুপার হেভি বুস্টার রকেট থেকে আলাদা হওয়ার পর তিনটি প্রধান ইঞ্জিনের একটি বিকল হয়ে পড়ে। পড়ে রকেটের কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে অভিযানটি তিন ঘণ্টায় শেষ করার সিদ্ধান্ত নেন স্পেসএক্স কর্মকর্তারা।

২০২৩ সালে স্টারশিপের পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন শুরু হওয়ার পর সবশেষ এই ইঞ্জিন ত্রুটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে চলতি বছরের শেষ নাগাদ শক্তিশালী এই মহাকাশযানকে নিয়মিত ব্যবহারে আনার লক্ষ্য রয়েছে ইলন মাস্কের। এমনকি সেই আশা দেখানোতেই সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ার বাজারে জায়গা করে নিয়েছে স্পেসএক্স।

আগের স্টারশিপ পরীক্ষাগুলোর তুলনায় সোমবারের অভিযান ছিল উচ্চ ঝুঁকির প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম। এই পরীক্ষামূলক অভিযানেই কয়েক কোটি ডলার মূল্যের স্টারলিংক উপগ্রহ বহন করা হয়। রকেটের চূড়ান্ত নকশায় আরও উন্নয়নের কাজ চলছে। তবুও এই স্টারশিপ অভিযান প্রথমবারের মতো অর্থ উপার্জন নিশ্চিত করেছে। কাজেই এটিকে স্টারশিপের প্রথম বাণিজ্যিক অভিযানও বলা হচ্ছে।

স্পেসএক্সের রকেট স্টারশিপ। ছবি: এপি/ইউএনবি

 

এদিকে সফল অভিযানের পরও সোমবার স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম প্রায় দুই শতাংশ কমেছে। গত শুক্রবার সপ্তাহ শেষের আগে বাজার বন্ধের হিসাব অনুযায়ী, স্পেসএক্সের মূল্য ছিল প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলার।

স্পেসএক্সের কর্মকর্তারা জানান, স্টারশিপকে বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ পুনর্ব্যবহারযোগ্য মহাকাশযান হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে। ৪০ তলা ভবনের সমান উচ্চতার এই যানটি তৈরি হয়েছে সুপার হেভি বুস্টার রকেটের ওপর বসানো মূল স্টারশিপ মহাকাশযান বা রকেট নিয়ে।

রকেটটি মেক্সিকো উপসাগরের কাছে ব্রাউনসভিলের পাশে স্পেসএক্সের স্টারবেস উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে যাত্রা শুরু করে। সুপার হেভি বুস্টার স্টারশিপের ওপরের অংশকে মহাকাশে পৌঁছে দেওয়ার পর নিজে ফিরে আসে এবং ইঞ্জিন নিয়ন্ত্রিতভাবে সাগরের পানিতে অবতরণ করে।

এর আগে দুটি অভিযানে বুস্টারটি অবতরণের সময় আছড়ে পড়ে (রাফ ল্যান্ডিং), তবে সে সময় রকেট বিধ্বস্তের ঘটনা ঘটেনি। স্পেসএক্স জানিয়েছে, এবারও বুস্টারের নিচে নামার সময় কয়েকটি ইঞ্জিন কাজ করা বন্ধ করে দেয়।

মহাকাশে পৌঁছানোর পর স্টারশিপের তিনটি প্রধান ইঞ্জিনের একটি নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ হয়ে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্পেসএক্সের মুখপাত্র ড্যান হুয়ট সরাসরি সম্প্রচারে জানান, মহাকাশযানটি কক্ষপথে পৌঁছাতে পারবে না। তিনি বলেন, ‘আমাদের নিয়ন্ত্রক দল কক্ষপথে যাওয়ার চেষ্টা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

তবে কয়েক মিনিট পর প্রকৌশলীদের কাছ থেকে নতুন তথ্য পাওয়ার পর ড্যান হুয়ট জানান, মহাকাশযানটি এখনো বাকি ইঞ্জিন ব্যবহার করে কক্ষপথে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে পারবে। এর কিছুক্ষণ পর স্টারশিপ সফলভাবে কক্ষপথে পৌঁছে যায়।

কক্ষপথে পৌঁছানোর পর প্রায় ২৬৯ কিলোমিটার উচ্চতায় একে একে ২৬টি নতুন প্রজন্মের স্টারলিংক উপগ্রহ স্থাপন করে স্টারশিপ। এটি ছিল স্টারশিপের প্রথম কক্ষপথভিত্তিক উপগ্রহ স্থাপন।

আরও পড়ুন

স্পেসএক্সের রকেট স্টারশিপ। ছবি: এপি/ইউএনবি

 

ইলন মাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘২৬টি স্টারলিংক ভি৩ উপগ্রহ সফলভাবে স্থাপন করা হয়েছে এবং স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে।’

অ্যাকিউ কম্পোনেন্টসের মান ব্যবস্থাপক ও মহাকাশ প্রকৌশলী ডিন স্লেডেন বলেন, স্টারশিপের প্রথম আয়-সৃষ্টিকারী বাণিজ্যিক অভিযানে ২৬টি স্টারলিংক ভি৩ উপগ্রহ নির্ধারিত কক্ষপথে স্থাপন বড় সাফল্য। তবে প্রকৌশলগত দিক থেকে আসল বিষয় ছিল উড্ডয়নের সময় ইঞ্জিন ত্রুটির পরিস্থিতি দল কীভাবে সামাল দিয়েছে।

স্টারশিপের আগের কয়েকটি মহাকাশ পরীক্ষামূলক উড্ডয়নেও ইঞ্জিন সমস্যার ঘটনা ঘটেছিল। মহাকাশে যান পরিচালনার ক্ষেত্রে এটি এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

এবারের অভিযানের শেষ পর্যায়ে স্টারশিপ প্রশান্ত মহাসাগরে নিয়ন্ত্রিতভাবে অবতরণ করে। অবতরণের আগে যানটিকে উল্লম্ব অবস্থানে আনা হয়, যেন সেটি সম্মুখ ভাগ ওপরে রেখে পানিতে অবতরণ করতে পারে। পানির পৃষ্ঠে আঘাত করার সময় রকেটের নিচের অংশে আগুন ধরে যায়। পরে এটি এক পাশে হেলে পড়ে এবং বড় ধরনের অগ্নিগোলকের সৃষ্টি হয়।

তবে এই অভিযানের পর মহাকাশযানটি উদ্ধার করে পুনর্ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল না স্পেসএক্সের।

নিম্ন কক্ষপথে স্টারলিংক উপগ্রহ স্থাপনের জন্য এই কার্যক্রমের গুরুত্ব তুলনামূলক কম হলেও ভবিষ্যতে স্টারশিপের মাধ্যমে নাসার নভোচারীদের চাঁদে পাঠানোর অভিযানে মহাকাশে যান নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে নিরাপদ, দায়িত্বশীল ও বিশেষভাবে অনুপ্রেরণাদায়ক উপায়ে স্টারশিপকে কক্ষপথে নেওয়ার জন্য তিনি স্পেসএক্সকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

স্টারশিপ তৈরি করা হয়েছে দ্রুতগতিতে স্পেসএক্সের স্টারলিংক উপগ্রহ উৎক্ষেপণ এবং ভবিষ্যতে নাসার চাঁদ অভিযান পরিচালনার জন্য।

কোনো নতুন রকেটের জন্য কক্ষপথে পৌঁছানো মহাকাশে পণ্য বহনের সক্ষমতার প্রধান পরীক্ষাগুলোর একটি। স্টারশিপের ক্ষেত্রে এই অর্জন দীর্ঘদিন ধরে বিলম্বিত ছিল। ইলন মাস্ক একসময় ২০২২ সালের মধ্যে এটি অর্জনের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন এবং ২০২৩ সালে উপগ্রহ স্থাপনের কথা বলেছিলেন।

স্পেসএক্সের রকেট স্টারশিপ। ছবি: এপি/ইউএনবি

 

২০২৩ সাল থেকে স্টারশিপের আগের ১৩টি পরীক্ষামূলক উড্ডয়নই কক্ষপথের নিচের স্তরের মহাকাশ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। প্রায় এক দশকের উন্নয়ন কার্যক্রমে এ পর্যন্ত স্পেসএক্স ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেছে।

ইলন মাস্ক বলেছেন, শেষ পর্যন্ত তিনি বছরে শত শত বা হাজার হাজার স্টারশিপ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা করছেন। মহাকাশ শিল্পে এমন দ্রুত উৎক্ষেপণের হার আগে দেখা যায়নি।

রোববার ইলন মাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘স্টারশিপ প্রতি ঘণ্টায় উড্ডয়নের সক্ষমতা অর্জন থেকে এখনো দুই থেকে তিন বছর দূরে রয়েছে।’

বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, সোমবার স্পেসএক্সের নতুন প্রজন্মের ভি৩ স্টারলিংক উপগ্রহ উৎক্ষেপণ থেকে কয়েকশ কোটি ডলার সম্ভাব্য আয় হতে পারে। কারণ এসব উপগ্রহের মাধ্যমে নেটওয়ার্কের গ্রাহক সক্ষমতা বাড়বে। এতে স্পেসএক্সের মূল আয়ের উৎস হিসেবে স্টারশিপের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে।

স্পেসএক্স জানিয়েছে, সোমবার উৎক্ষেপণ করা ভি৩ স্টারলিংক উপগ্রহগুলো আগের ভি২ মিনি উপগ্রহের তুলনায় ১০ গুণ বেশি তথ্য বহন করতে সক্ষম। এর আগে ফ্যালকন ৯ রকেটের মাধ্যমে একবারে ২০ থেকে ৩০টি করে ভি২ মিনি উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করা হতো।

ইলন মাস্কের ব্রডব্যান্ড উপগ্রহ নেটওয়ার্ক দ্রুত সম্প্রসারণ করতে স্টারশিপ নিয়মিত কার্যক্রমে গেলে প্রতিটি অভিযানে ৬০টি করে ভি৩ উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করা হবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad