মিয়ানমারের প্রায় এক হাজার ৫০০ বাস্তুচ্যুত নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে মালয়েশিয়া। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের আপত্তি উপেক্ষা করেই মঙ্গলবার এই প্রত্যাবাসন শুরু হয়।
মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধের মধ্যে ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
এর মধ্য দিয়ে কয়েক ধাপের প্রত্যাবাসন কর্মসূচির প্রথম ধাপ শুরু হলো। এ কর্মসূচির আওতায় সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার নাগরিককে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
মালয়েশিয়া বলছে, পুরো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি স্বেচ্ছামূলক। তবে ইউএনএইচসিআরসহ বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন বলছে, মিয়ানমারে এখনো নিরাপদ ও টেকসইভাবে শরণার্থীদের ফেরার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে জানা যায়, মঙ্গলবার সকালে মালয়েশিয়ার পেরাক রাজ্যের লুমুত নৌঘাঁটির কাছে একটি স্টেডিয়ামে নিরাপত্তাবাহিনীর গাড়ির সঙ্গে কয়েকটি বাস আসে। পরে বাসগুলোকে বন্দরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মিয়ানমারের দুটি নৌযান ও একটি চিকিৎসা সেবাদানকারী জাহাজ নোঙর করা ছিল। বাসগুলোতে কারা ছিলেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করলেও বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানান। এ বিষয়ে তিনি গত ২৭ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের দেওয়া বিবৃতির দিকে গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
ওই বিবৃতিতে বলা হয়, মিয়ানমার সরকারের শনাক্ত করা এক হাজার ৪৭৬ জন নাগরিককে প্রথম দফায় ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
মিয়ানমার সরকারের একজন মুখপাত্র এবং কুয়ালালামপুরে দেশটির দূতাবাস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চলতি মাসে জানিয়েছিল, যাচাই করা বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে স্বেচ্ছায় ফেরত পাঠানোর জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কাজ করছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ চলছে। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় সামরিক বাহিনী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে লড়াই করছে।
ইউএনএইচসিআর বলেছে, মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি দেশটির শরণার্থীদের নিরাপদ ও টেকসইভাবে ফেরার উপযোগী নয়। ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়ায় ইউএনএইচসিআরও যুক্ত ছিল না বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
শরণার্থীদের নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধিতা বাড়তে থাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মালয়েশিয়া অভিবাসন আইন আরও জোরদার করেছে। বিশেষ করে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিয়ে দেশটিতে বিরোধিতা বেড়েছে।
ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় মিয়ানমারের প্রায় এক লাখ ৯৩ হাজার শরণার্থী রয়েছে। তাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রোহিঙ্গা।
চলতি বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাদের হয়রানি ও নজরদারি বেড়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন স্থানে স্কুল বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম চলতি মাসে বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের বিনিময়ে তিনি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর প্রধান থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া মিন অং হ্লাইংকে মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানাবেন।
এর আগে জুলাইয়ে আনোয়ার জানিয়েছিলেন, মিয়ানমার সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। এ ঘোষণার পর মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। তবে মঙ্গলবার ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো রোহিঙ্গা ছিলেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
মালয়েশিয়ায় মিয়ানমারের চিন জনগোষ্ঠীর শরণার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী জেমস বাউই থাং বিকি বলেন, ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন আশ্রয়প্রার্থী রয়েছেন। তাদের মধ্যে কমিউনিটি নেতাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি জানান ইউএনএইচসিআরের কার্ডধারী একজনও রয়েছেন।
আগে ফেরত পাঠানো শরণার্থীদের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে জেমস বলেন, দেশে ফেরার পর এসব ব্যক্তিকে জোর করে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ বা আটক করা হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমরা আশঙ্কা করছি, তাদের সংঘাতের সম্মুখসারিতে লড়াই করতে বাধ্য করা হতে পারে। অনেকের জন্য এটি নিজের দেশেই মৃত্যুদণ্ডের সমান।’


