ইন্দোনেশিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে বহু মানুষের প্রাণহানির ছয় সপ্তাহ পার হলেও এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি দুর্গতরা। অনেকে এখনো মসজিদের বাইরে অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করছেন। ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হওয়া হাজারো মানুষের সাধারণ জীবনে ফেরার পথ যে কতটা কঠিন ও অনিশ্চিত, সাহরিয়া লেলু ও তার পরিবারের বর্তমান অবস্থাই তার স্পষ্ট প্রমাণ।
বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, গত ১৫ আগস্ট দেশটির ফ্লোরেস দ্বীপের কাছে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে কয়েক হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। অনিশ্চিত হয়ে পড়ে ছোট ছোট দ্বীপগুলোতে সুপেয় পানির সরবরাহ।
সরকারি হিসাবে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন ১৫১ জন। আর মূল ভূমিকম্পের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার পরাঘাত (আফটারশক) রেকর্ড করা হয়েছে অঞ্চলটিতে।
দুর্যোগকবলিত নাগেকেও জেলার ৩৮ বছর বয়সী বাসিন্দা সাহরিয়া বলেন, ‘আমরা বাড়ি ফিরতে পারছি না। কারণ আমরা এখনো ভীষণ আতঙ্কিত।’
ভূমিকম্পের পর সুনামির সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। সমুদ্রের পানি সাহরিয়ার বাড়ির উঠান পর্যন্ত পৌঁছালেও ঘরটি পুরো ধ্বংস হয়নি। তবে ঘনঘন পরাঘাতে আবারও ভয়াবহ ঢেউ আসতে পারে–এমন আশঙ্কায় তিনি পরিবার নিয়ে ঘরে ফিরছেন না। সাহরিয়া বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, এখানে খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। স্বেচ্ছাসেবকেরাও আমাদের নানাভাবে সহায়তা করছেন।’
ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় দুর্যোগ প্রশমন সংস্থার (বিএনপিবি) মুখপাত্র বার্টন পাঞ্জাইতান জানান, এই ভূমিকম্পে ৪৬ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২৮ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় ছিলেন।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দেড় লাখের বেশি বলে জানানো হয়েছিল। তবে এই সংখ্যা কমলেও সামগ্রিক উদ্বেগের চিত্র বদলায়নি। কারণ, যারা বাড়ি ফিরেছেন তাদের অনেকে নতুন ভূমিকম্পে ঘর ভেঙে পড়ার আতঙ্কে খোলা জায়গায় বা আঙিনায় তাঁবু টাঙিয়ে রাত কাটাচ্ছেন।
পানীয় জলের সংকট ও জীবিকার টানাপোড়েন
ফ্লোরেসের সিক্কা জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির বাইরে বসে ৫৯ বছর বয়সী মারিয়া ওনসেলিয়া জানান, দুর্যোগের পর থেকে তার বোনা কাপড় কেনার কোনো ক্রেতা মিলছে না। চরম অর্থসংকটে পড়া মারিয়া বলেন, ‘খাবারের জোগাড় করতেই আমরা হিমশিম খাচ্ছি। তার ওপর এই মৌসুমে পানি পাওয়া কঠিন। চাল কেনার আগেই এখন আমাদের পানি কিনতে হচ্ছে।’ আতঙ্কের কারণে তিনিও তাঁবুতেই দিন কাটাচ্ছেন।
ফ্লোরেসের উত্তরাংশের ছোট দ্বীপ পালুয়েতে বাস করেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। সমুদ্রবেষ্টিত এই দুর্গম দ্বীপের বাসিন্দাদের কাছে বিশুদ্ধ পানীয় জল এখন সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ। প্রয়োজন মেটাতে স্থানীয়রা চড়া দামে পানি কিনছেন। কেউ কেউ আবার আগ্নেয় দ্বীপটির ভূ-তাপীয় উৎস থেকে বাঁশের নল ব্যবহার করে বাষ্প ঘনীভূত করার মতো ঐতিহ্যবাহী উপায়ে পানি সংগ্রহ করছেন।
৪০ বছর বয়সী স্থানীয় শিক্ষক মেথিলডুস নেস্টর লাঙ্গা বলেন, ‘আমাদের মূল উদ্বেগের বিষয় হলো বিশুদ্ধ পানির অভাব। পুরো এলাকা শুকিয়ে গেছে, আর পানি ধরে রাখার সব ট্যাংক ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।’
ধসে পড়া অর্থনীতি আর হারিয়ে যাওয়া জীবিকা নিয়ে টিকে থাকার সংগ্রাম চালাচ্ছেন দুর্গতরা। সাহরিয়া জানান, ভূমিকম্পে তার স্বামীর গাড়ি ও মোটরসাইকেল মেরামতের দোকানটি পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে তাদের আয়ের প্রধান উৎসটি বন্ধ হয়ে যায়। এখন সংসার চালাতে ও সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে সাহরিয়াকে রাস্তায় মাছ বিক্রি করতে হচ্ছে।
সাহরিয়া জানেন না আর কতদিন তাদের এভাবে গৃহহীন থাকতে হবে। যদিও তার গ্রামে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে সরকারি কর্মকর্তাদের পাঠানো হয়েছে। সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানোসহ ঘুরে দাঁড়াতে সরকারের জরুরি সহায়তা চেয়ে আকুতি জানিয়ে সাহরিয়া বলেন, ‘দয়া করে আমাদের আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে সাহায্য করুন।’
পরিস্থিতি সামাল দিতে নাগেকেও জেলার উপপ্রধান গনজালো গ্রাতিয়ানুস মুগা সাদা জানান, আগামী নভেম্বরের শেষ নাগাদ ৩১৪টি অস্থায়ী আবাসন নির্মাণের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
অন্যদিকে দুর্যোগ সংস্থার মুখপাত্র বার্টন পাঞ্জাইতান জানান, মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলোর স্থানে সরকার ২ হাজার ৪০০টির বেশি স্থায়ী আবাসন তৈরি করে দেবে। তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত খোলা আকাশের নিচে তাঁবুতেই কাটাতে হচ্ছে বাস্তুচ্যুত হাজারো মানুষকে।


