ডেঙ্গুতে ফলের চাহিদার সঙ্গে বেড়েছে দামও

ডেঙ্গুতে ফলের চাহিদার সঙ্গে বেড়েছে দামও
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে ফলের চাহিদাও বেড়েছে। বিশেষ করে মাল্টা, কমলা, আপেল, আঙ্গুর ও ডাবের চাহিদা বেড়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দাম। রোগীর জন্য ফল কিনতে গিয়ে বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে স্বজনদের।

বাজারের অবস্থা এমন, ৫০০ টাকা নিয়েও অনেক ক্ষেত্রে এক কেজি ফল কিনে ফেরত টাকা পাওয়া যাচ্ছে না।

২৫ সেপ্টেম্বর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৬৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ৯৮৫ জন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২১২ জন। সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে রোগীর চাপ বাড়ছে।

ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় ফলের বাজারেও চাহিদা বেড়েছে। হামজারবাগের বাসিন্দা মোহাম্মদ শাহজাহান সন্তানকে খাওয়ানোর জন্য ফল কিনতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন। মাল্টা, আপেল ও কমলার দাম শুনে তুলনামূলক কম দামের পেয়ারা কেনার কথা ভাবছেন তিনি।

ফুটপাত ও ভ্যানের ফল বিক্রেতারা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে বলছেন, ‘মাল্টা, আপেল না খেয়ে মাত্র ৮০ টাকায় পেয়ারা খান, আপেলের মতো মিষ্টি।’

পাইকারি ও খুচরা দামে বড় ব্যবধান

স্টেশন রোডের ফলমন্ডির পাইকারি বাজার ও নগরের খুচরা বাজারে ফলের দামে বড় পার্থক্য দেখা গেছে।

পাইকারিতে ২০ কেজির চীনা আপেলের কার্টন বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকায়। কেজিপ্রতি দাম ২০০ থেকে ২১০ টাকা। ব্রাজিলিয়ান ১৮ কেজির আপেলের কার্টন ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা। দক্ষিণ আফ্রিকার ১৮ কেজির আপেল ৫ হাজার থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকা। খুচরা বাজারে এসব আপেল বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি।

দক্ষিণ আফ্রিকার ১০ কেজির এক কার্টন কমলার পাইকারি দাম ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকা। কেজিপ্রতি দাম ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকা। খুচরা বাজারে কমলা বিক্রি হচ্ছে ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকায়।

৬ দশমিক ৫ কেজির লাল আঙ্গুরের কার্টন পাইকারিতে ১ হাজার ৮৫০ থেকে ১ হাজার ৯৫০ টাকা। একই পরিমাণ সাদা আঙ্গুরের কার্টন ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা। খুচরা বাজারে লাল আঙ্গুরের দাম প্রায় ৪৫০ টাকা কেজি। বাজারে কালো আঙ্গুরের সরবরাহ নেই।

১৫ কেজির মাল্টার কার্টন পাইকারিতে ৫ হাজার ৭০০ থেকে ৬ হাজার টাকা। কেজিপ্রতি দাম ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা। খুচরা বাজারে মাল্টা বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা কেজি।

আরও পড়ুন

রোগীর জন্য একসঙ্গে কয়েক ধরনের ফল কিনলে একটি পরিবারের দৈনিক খরচ কয়েকশ টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। স্থানভেদে দাম আরও বেশি।

মোহাম্মদপুর এলাকার গৃহিণী ফারজানা রুবায়েত বলেন, ‘মোহাম্মদপুর এলাকায় দাম অনেক কম। হাসপাতাল এলাকায় গেলে দাম আরও ৪০-৫০ টাকা বেশি।’

দাম বাড়ার পেছনে যেসব কারণ

চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ তৌহিদুল আলম বলেন, ফলের দাম বাড়ার পেছনে শুধু ডেঙ্গুর বাড়তি চাহিদা দায়ী নয়। আমদানি, পরিবহন, সংরক্ষণ ও পচনের কারণে ফলের খরচও বেড়েছে।

তিনি বলেন, বিদেশ থেকে জাহাজে ফল আসতে সময় লাগে। এ সময় কার্টনের কিছু ফল নষ্ট হয়। সেই ক্ষতি বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে যুক্ত হয়। তবে সরবরাহ কম থাকার সুযোগে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানোর অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

ব্যবসায়ীদের মতে, আমদানি করা ফল সংরক্ষণের জন্য দেশে পর্যাপ্ত পৃথক কোল্ড-চেইন অবকাঠামো নেই। বিভিন্ন পণ্য একই ধরনের সংরক্ষণ ব্যবস্থায় রাখায় ফলের মান ও সংরক্ষণকাল ধরে রাখা কঠিন হয়।

খুচরা পর্যায়ের পরিচালন ব্যয়ও দামের ওপর প্রভাব ফেলছে। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, স্থায়ী দোকান বা সুপারস্টোরে ভাড়া, বিদ্যুৎসহ মাসে প্রায় ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্দিষ্ট খরচ থাকে। ফলে খুচরা বিক্রেতাকে কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত মার্জিন রাখতে হয়।
ফুটপাতের ভ্যান ও ফেরিওয়ালাদের স্থায়ী খরচ কম। তাই একই ফলের দামেও বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।

বড় চালান এলে কমতে পারে দাম

চীন থেকে আমদানি করা ফলের প্রায় ১৩০ কনটেইনারের একটি বড় চালান চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। সাপ্তাহিক ছুটির পর রবিবার ব্যাংক ও শুল্ক-সংক্রান্ত কার্যক্রম শুরু হলে চালানগুলোর খালাস প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা।

তৌহিদুল ইসলাম বলেন, বড় চালান বাজারে এলে পাইকারি পর্যায়ে কার্টনপ্রতি অন্তত ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম কমতে পারে। এর প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়তে পারে।

তবে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ায় সরবরাহ বাড়লেও ফলের চাহিদা কতটা কমবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাই বন্দরে থাকা চালান দ্রুত বাজারে আনা ও আমদানি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত দামের ওপর নজরদারি জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাজার তদারকির দাবি
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট নাজের হোসাইন বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের প্রয়োজনীয় এসব ফলের দাম সাধারণ সময়ের তুলনায় পাইকারি ও খুচরা বাজারে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘বহদ্দারহাট বাজার, চকবাজার ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকায় অল্প দূরত্বের ব্যবধানেও ইচ্ছেমতো বেশি দামে ফল ও ডাব বিক্রি করা হচ্ছে।’

নাজের হোসাইন বলেন, ফল আমদানিতে সরকার শুল্ক কমালেও বাজারে এর প্রভাব পড়েনি। শুল্ক কমানোর পরও একই দামে ফল বিক্রি হচ্ছে। ফলে কর ছাড়ের সুফল সাধারণ ভোক্তারা পাচ্ছেন না।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা যেকোনো সংকট বা চিকিৎসকদের পরামর্শকে সুযোগ বানিয়ে দাম বাড়িয়ে দেয়। ব্যবসায়ীদের এই সুযোগসন্ধানী মনোভাব এতটাই চূড়ান্ত যে, মহামারিতে মানুষ মারা গেলেও কাফনের কাপড় নিয়ে সিন্ডিকেট করতে তারা দ্বিধা করবে না।’

বাজারে প্রশাসনিক নজরদারি ও নিয়মিত তদারকির অভাবে ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দাম বাড়াতে পারছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। বাজার তদারকি জোরদার করে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিন

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad