এস আলমের নিয়ন্ত্রণ নেই। পরিচালনা পর্ষদেও এসেছে পরিবর্তন। এমনকি দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও বদলে গেছে। তবে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক লিমিটেডের অনিয়ম ও লুটপাটের কাঠামো রয়ে গেছে আগের মতোই।
ব্যাংকটির নিজস্ব নিরীক্ষা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকাকালে ব্যাংকে যে অনিয়মের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরেও অব্যাহত রয়েছে।
নথিপত্রে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও ব্যাংক কর্মকর্তাদের সহায়তায় বাণিজ্যের আড়ালে বিদেশে অর্থ পাচার করা হয়েছে। অন্য একটি ব্যাংকে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত এক কর্মকর্তাকে কমার্স ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অতি সম্প্রতি আমানত সংগ্রহের খরচের নামে নগদে তুলে নেওয়া হয়েছে ৪ কোটি টাকা।
এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকাকালে চরম তরল্য সংকটে পড়া কমার্স ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ১০০ কোটি টাকার বিশেষ ঋণ সুবিধা নিয়ে তা এস আলম-সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যাংক ইউনিয়ন ব্যাংকে জমা রাখে।
নথি অনুযায়ী, এই ধরনের লেনদেনের মাধ্যমে কমার্স ব্যাংকের অন্তত ১ হাজার ১৯২ কোটি টাকা ওই ব্যবসায়ী গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আটকে যায়, যা চূড়ান্তভাবে এস আলমকেই সুবিধা দিয়েছিল।
এসব লেনদেনে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কমার্স ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে ঘটেছে ঠিক তার উল্টো। জড়িত কর্মকর্তাদের একজনকে পদোন্নতি দিয়ে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) করা হয় এবং তিনি দুবার ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শকরা প্রতিবেদনে লিখেছেন, ‘যারা এসব বিনিয়োগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং যারা নথিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন, তারা ব্যাংকের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন এবং ব্যাংকের ক্ষতি সাধনে অন্যদের সহায়তা করেছেন বলে গণ্য হবেন। একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত পরিচালনা করে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
কিন্তু সেই নির্দেশনা সত্ত্বেও মোহাম্মদ জিয়াউল করিমকে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট থেকে ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, কমার্স ব্যাংক তখন এমন চরম তরল্য সংকটে ভুগছিল যে, গ্রাহকদের ইস্যু করা চেকের বিপরীতেও টাকা দিতে পারছিল না। তা সত্ত্বেও এস আলম-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে অর্থ পাঠানো অব্যাহত রাখা হয়।
২০২৩ সালের ২৩ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটির ট্রেজারি বিভাগকে ১০০ কোটি টাকার রেপো সুবিধা নেওয়ার নির্দেশ দেয়। ব্যাংকটি সেই টাকা ২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবর ইউনিয়ন ব্যাংকে স্থায়ী আমানত হিসেবে জমা রাখে।
এর আগে, ২০২৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পর্ষদ সভায় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংকে আমানত রাখার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কো-অর্ডিনেটর (সমন্বয়ক)।
পরে একটি বিশেষ অডিট বা নিরীক্ষায় দেখা যায়, সেই আপত্তি উপেক্ষা করেই এস আলম-সংশ্লিষ্ট ব্যাংক দুটিতে আমানত রাখা হয়েছিল।
৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ ব্যাংক কমার্স ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন পর্ষদ গঠন করে। বহু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পালিয়ে যান অথবা পদত্যাগ করেন। তবে অনিয়মের ধরন অপরিবর্তিতই থেকে যায়।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে কমার্স ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় দেখা যায়, ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন ছাড়াই ‘টিএম ট্রেডিং’-এর পক্ষে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকার সমপরিমাণ ৩ লাখ ৭ হাজার ১২৫ মার্কিন ডলার দুবাইয়ে পাঠানো হয়েছে।
অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, পণ্য বিক্রেতার অবস্থান ছিল জার্মানিতে, পণ্য পাঠানো হয়েছিল পোল্যান্ড থেকে, অথচ পেমেন্ট বা মূল্য পরিশোধ করা হয় দুবাইয়ে। নিরিক্ষকদের সন্দেহ, এই লেনদেনটি ছিল স্পষ্টত অর্থ পাচারের (মানি লন্ডারিং) ঘটনা।
অডিটে এই লেনদেনের জন্য চারজন কর্মকর্তাকে ‘প্রাথমিকভাবে দায়ী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. দেলোয়ার হোসেন।
২০২৫ সালের এপ্রিলে এনআরবিসি ব্যাংক কমার্স ব্যাংককে জানায়, দেলোয়ার হোসেন এনআরবিসি ব্যাংক থেকে কোনো ছাড়পত্র বা অনাপত্তিপত্র (ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট) না নিয়েই কমার্স ব্যাংকে যোগ দিয়েছেন এবং অনিয়মের কারণে তাকে আগের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল।
বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংককেও জানানো হয়েছিল। তা সত্ত্বেও, নথিতে দেখা যায়, তিনি কমার্স ব্যাংকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল ছিলেন এবং আরও নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন।
নিরীক্ষায় আরও দেখা গেছে, কমার্স ব্যাংকের কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবু তাহেরকে একই সঙ্গে ট্রেড বিভাগ, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধ বিভাগ, সিটিপিইউ/সুইফট এবং ট্রেজারি বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
এর অর্থ হলো, সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিরোধ থেকে শুরু করে বৈদেশিক মুদ্রা স্থানান্তরের মতো সংবেদনশীল সমস্ত দায়িত্ব একজন ব্যক্তির হাতেই পুঞ্জীভূত ছিল—যা অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, অবৈধ অর্থ পাচারের পথকে আরও সহজ করে দিয়েছিল।
এর আগে, বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তি সত্ত্বেও ব্যাংকটি দেশবন্ধু প্যাকেজিংয়ের জন্য লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খুলেছিল।
২০২৩ সালের নভেম্বরে চরম ঋণগ্রস্ত দেশবন্ধু গ্রুপের ৫ লাখ ৪৪ হাজার মার্কিন ডলারের একটি আমদানি প্রস্তাবে আপত্তি জানান বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নিযুক্ত সমন্বয়ক। শেষ পর্যন্ত পর্ষদ প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নেয়। তবে পরবর্তীতে ব্যাংকের প্রধান শাখা থেকে সেই এলসির বিপরীতে অর্থ পরিশোধ করা হয়।
ব্যাংকটিতে অনিয়ম অব্যাহত থাকার সর্বশেষ উদাহরণ সামনে এসেছে ‘উজ্জীবন ডিপোজিট ক্যাম্পেইন’ থেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ক্যাম্পেইনের নামে ১৩ জন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে ৪ কোটি টাকা স্থানান্তর করা হয় এবং পরবর্তীতে তা নগদে তুলে নেওয়া হয়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে কমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)—কারো কাছ থেকেই কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৫০ শতাংশের বেশি শেয়ারের মালিক সরকার হওয়া সত্ত্বেও, ৫ আগস্টের আগে ব্যাংকটির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ছিল এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমের হাতে।
জুলাই বিপ্লবের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পূর্বের পর্ষদ ভেঙে দিয়ে পাঁচ সদস্যের একটি নতুন পর্ষদ গঠন করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. আতাউর রহমানকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এর কয়েক সপ্তাহ পর, ২০ অক্টোবর জিয়াউল করিম ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে পদোন্নতি পান। তিনি ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রথমবারের মতো ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত আবারও একই পদে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর-১ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
গত ৯ এপ্রিল থেকে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. ওবায়দুল হক, যিনি এর আগে এনআরবিসি ব্যাংকের ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন।


