১৯৯৬ সালে দেশের ১২তম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অনুমোদন পায় ‘দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ’। দেখতে দেখতে তিন দশক পেরিয়ে গেলেও নিজস্ব কোনো স্থায়ী ক্যাম্পাস তৈরি করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
এই দীর্ঘ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে কোনো উপ-উপাচার্য (প্রো-ভিসি) ও কোষাধ্যক্ষ (ট্রেজারার) নিয়োগ দেওয়া হয়নি। মাঝে মাঝে উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগ দেওয়া হলেও, অনেক সময় বিভিন্ন অনুষদের ডিনরাই ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে কাজ চালিয়ে নিয়েছেন। তবুও সেখানে পড়াশোনা থামেনি, স্বাভাবিক নিয়মেই চলছে।
পিপলস ইউনিভার্সিটির এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খাতের সার্বিক বেহাল দশারই এক বাস্তব চিত্র। দেশের বহু প্রতিষ্ঠান নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই বছরের পর বছর পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে।
দেশের ১১৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৫৪টির স্থায়ী ক্যাম্পাস আছে। আবার এদের মধ্যে মাত্র ২২টি বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক কার্যক্রম চালানোর সব শর্ত পূরণ করে গত বছর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সনদ পেয়েছে।
সহজ কথায়, দেশের ৯৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই ইউজিসির সনদ নেই।
দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটির রেজিস্টার মো. মনিরুল ইসলাম জানান, তারা উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ পদের জন্য প্রার্থী বাছাই করে একটি প্যানেল তৈরি করেছেন এবং দু-এক দিনের মধ্যেই তা ইউজিসিতে জমা দেবেন।
প্রতিষ্ঠার ৩০ বছর পরও কেন উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া হয়নি—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নানা কারণে এতদিন এটা করা সম্ভব হয়নি। তবে খুব শিগগিরই কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া হবে। আর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টি ছোট হওয়ায় এখানে উপ-উপাচার্যের কোনো পদ রাখা হয়নি। ডিন ও অন্য কর্মকর্তারা মিলেই এসব দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।’
স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকা ৬৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৫টিতে এখনো ক্লাসই শুরু হয়নি। আর নানা অনিয়মের কারণে অন্য ৫টির কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।
বাকিদের অবস্থা আরও করুণ—অর্ধেকেরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনো ক্যাম্পাস নেই। অন্তত ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয় ১২ বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসলেও স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ অনুযায়ী, অনুমোদনের সাত বছরের মধ্যে নিজস্ব ক্যাম্পাসে যেতে হয়। ব্যর্থ হলে সর্বোচ্চ আরও পাঁচ বছর সময় বাড়ানো যায়।
বাড়তি সময় পার হওয়ার পরও শর্ত না মানলে ইউজিসি শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধসহ নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে বাস্তবে এমন কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার নজির মেলা ভার।
শুধুই লোকদেখানো সতর্কতা
ইউজিসির কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, অনেক উদ্যোক্তাই শুরুতেই অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন নেন। কিন্তু পরে পুরো প্রশাসন ও অর্থের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন।
তাদের অভিযোগ, উদ্যোক্তারা নিজেদের পরিবার ও পছন্দের মানুষদের নিয়ে ট্রাস্টি বোর্ড বানান, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়কে মনের মতো নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইউজিসির সাবেক এক সদস্য বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দাপট রয়েছে। এ কারণেই ইউজিসি তাদের বিরুদ্ধে কোনো শক্ত পদক্ষেপ নিতে পারে না।’
তিনি জানান, গত বছর ৮০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা খামখেয়ালি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছিল ইউজিসি, যেখানে কিছু পরিবর্তনের পরামর্শ দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘এমনকি ২০ থেকে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে চরম ব্যবস্থা নেওয়ার তালিকাও তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু ওপরমহল শেষ পর্যন্ত কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে রাজি হয়নি।’ ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে ইউজিসি কেবল সতর্কবার্তা দিয়েই দায় সারে।
২০২৪ সালে কমিশন ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হতে শিক্ষার্থীদের সতর্ক করে এবং ভর্তির আগে ইউজিসির ওয়েবসাইট দেখে নেওয়ার পরামর্শ দেয়। কমিশন পরিষ্কার জানিয়ে দেয়, এসব জায়গায় ভর্তি হয়ে প্রতারিত হলে তার দায় ইউজিসি নেবে না।
চলতি বছর ইউজিসি আটটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘লাল তালিকাভুক্ত (রেড লিস্ট)’ করে অভিভাবকদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি স্থগিত করেছে।
লাল তালিকায় আটকা ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়
২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ চলতি বছরের সেই লাল তালিকায় রয়েছে।প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় দুই দশক ধরে রাজধানীর একটি অনুমোদিত ভবনে তারা শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে ইউজিসি সেখানে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়।
ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটির উপাচার্যের কার্যালয়ের কর্মকর্তা মো. ইমাম উদ্দিন বলেন, ২০১৩ সালে ইউজিসি তাদের ভবন ও ক্যাম্পাস নিয়ে আপত্তি তুলেছিল।
তিনি বলেন, ‘আমরা ভবন বদলে ইউজিসিতে নতুন তথ্য পাঠাই। কিন্তু ইউজিসি আমাদের নতুন ভবনটি অনুমোদন দেয়নি। আমরা এখন স্থায়ীভাবে কুমিল্লায় চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
ইউজিসির অনুমোদন ছাড়া ভবন ও ক্যাম্পাসে এতদিন কীভাবে পড়াশোনা চলল—জানতে চাইলে তিনি কোনো কথা বলতে চাননি। ‘এটা প্রশাসনিক বিষয়’—এই বলেই তিনি ফোন রেখে দেন।
বিশ্ববিদ্যালয়টি সম্পর্কে ইউজিসির ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য যতটুকু জমি থাকা দরকার, তা তাদের নেই। চলতি বছর ঘোষিত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের লাল তালিকাতেও তাদের নাম রয়েছে।
ইউজিসির আরেক সাবেক সদস্য বলেন, ‘বছরের পর বছর তাগাদা দেওয়ার পরও ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর কোনো উদ্যোগ নেননি।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘ভেতরের এসব জটিলতা সবার জানা। সরকার আর ইউজিসির নীতি নির্ধারকরা চাইলে একদিনেই সব ঠিক করা সম্ভব। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তারা চুপ মেরে যান।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা বিভাগের পরিচালক এমএসটি জেসমিন পারভিনের সঙ্গে টানা দুই সপ্তাহ যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তার দপ্তরে দুবার গিয়ে দেখা করার পর তিনি পরে তথ্য দেবেন বলে জানান। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি আর ফোন ধরেননি, খুদে বার্তারও কোনো জবাব দেননি।
৭০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি প্যানেল তৈরির মতো শিক্ষক নেই
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংকট কেবল স্থায়ী ক্যাম্পাসের অভাব বা প্রশাসনিক ঘাপলাতেই সীমাবদ্ধ নয়। সম্প্রতি সরকার ঠাকুরগাঁওয়ে ‘ইকো ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’কে দেশের ১১৭তম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে।
এর আগে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ৬০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
ইউজিসির জুলাই মাসের হিসাব অনুযায়ী, দেশের ৩৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো স্থায়ী উপাচার্য নেই।এ ছাড়া ৯৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-উপাচার্য এবং ৪৭টিতে কোনো কোষাধ্যক্ষ নেই।
অবাক করার বিষয় হলো, প্রায় ৭০ শতাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের প্যানেল তৈরি করার মতো পর্যাপ্ত অধ্যাপকই নেই।
ইউজিসির ৫০তম বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শীর্ষ তিনটি পদ—উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের জন্য যে অন্তত ৯ জন অধ্যাপকের প্যানেল দরকার, ৭৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ন্যূনতম যোগ্যতাই নেই।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী, ট্রাস্টি বোর্ডকে প্রতিটি পদের জন্য ৩ জন করে ৯ জন অধ্যাপকের একটি তালিকা তৈরি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হয়।
ইউজিসি সেই তালিকা যাচাই করার পর মন্ত্রণালয় তা রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠায়, আর তিনিই চূড়ান্ত নিয়োগ দেন।
ইউজিসির ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৎকালীন ১১৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটির সুপারিশে ৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছিল।
বাকি ১১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে সব মিলিয়ে ৯৫২ জন পূর্ণকালীন অধ্যাপক কর্মরত ছিলেন।
তবে ৭৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকের সংখ্যা ছিল ৯ জনেরও কম। অন্য ২১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকের সংখ্যা ছিল ২০ জন বা তার কম। আর মাত্র ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ জনের বেশি অধ্যাপক ছিলেন।
৯টি বিশ্ববিদ্যালয় মাত্র ১ জন অধ্যাপক নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল, আর শিক্ষা কার্যক্রম চালু থাকা ৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো অধ্যাপকই ছিলেন না!
ইউজিসির এক কর্মকর্তা জানান, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাধারণত ভিসি বানানোর জন্য নিজেদের শিক্ষকদের নাম পাঠায় না।
তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাইরে থেকে ভাড়া করে ভিসি আনে। তারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা অবসরপ্রাপ্তদেরই পছন্দ করে।’
আইন অনুযায়ী, মাস্টার্সসহ কোনো বিষয় চালু করতে হলে একটি বিভাগে অন্তত চারজন শিক্ষক থাকতে হয়—যার মধ্যে একজন অধ্যাপক, একজন সহযোগী অধ্যাপক এবং দুজন প্রভাষক বা সহকারী অধ্যাপক থাকা বাধ্যতামূলক।
ফলে বিভাগগুলোতে অধ্যাপকদের এই অনুপস্থিতি শিক্ষার গুণগত মানে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি করছে।
এগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয় বলা চলে না
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন বলেন, বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বৈশ্বিক নিয়মের তোয়াক্কাই করে না।
তিনি বলেন, ‘বিশ্বের অন্যান্য দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চালায় ট্রাস্টি বোর্ড এবং কেউ এখান থেকে লাভের টাকা পকেটে পুরে না। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের একক মালিক হতে পারে না। কিন্তু আমাদের দেশে ট্রাস্টি বোর্ডই মালিক সেজে বসে। উদ্যোক্তারা নিজেদের মানুষদের নিয়ে বোর্ড বানান, যাতে নিজের ইচ্ছামতো সবকিছু চালানো যায়। পরবর্তীতে তাদের ছেলেমেয়েরাই ওই গদিতে বসে।’
তিনি জানান, উপাচার্য থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল প্রশাসনিক দেখভালের দায়িত্বে, আর ডিন ও বিভাগীয় প্রধানরা পড়াশোনার বিষয়গুলো তদারকি করেন।
তিনি বলেন, ‘উপাচার্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে কেউ না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকরা মনমতো প্রতিষ্ঠান চালানোর সুযোগ পেয়ে যান। তারা উপাচার্য নিয়োগ দেওয়াকে বাড়তি খরচ মনে করেন। বাস্তবে এগুলোকে কোনোভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় বলা চলে না।’


