মেগা প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ দুর্নীতির পথ তৈরি করে- এমন যুক্তি দিয়ে মেগা প্রকল্প গ্রহণ না করার ঘোষণা দিয়েছিল তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। তবে সে ঘোষণার বাস্তব চিত্র ভিন্ন। এখন দলটির নেতৃত্বাধীন সরকারই বড় ব্যয়ের (মেগা ব্যয়) প্রকল্প হাতে নিচ্ছে।
ক্ষমতা গ্রহণের কেবল সাত মাসের মধ্যে সরকার প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের দুটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। আরও কয়েকটি বড় প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
একই সময়ে আগের সরকারের নেওয়া দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে এক লাখ কোটি টাকার বেশি।
ফলে একদিকে পুরোনো অবকাঠামোর ঋণ পরিশোধ ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ, অন্যদিকে নতুন অনুমোদিত প্রকল্পের দায়- এই দুই ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়ছে সরকার।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তাফা কে মুজেরি মনে করেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন বড় প্রকল্প নেওয়ার আগে এর প্রয়োজনীয়তা, অর্থায়নের সক্ষমতা, সম্ভাব্য সুফল এবং ঋণের চাপ গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘সাধারণ সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও বর্তমানে এমন কিছু ব্যয় দেখা যাচ্ছে, যা প্রয়োজনীয় বলে মনে হচ্ছে না। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সরকারি অর্থ এমন খাতে ব্যয় করা উচিত, যেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে অথবা বিদ্যমান বেসরকারি বিনিয়োগ শক্তিশালী হবে।’
শুধু অর্থ ছাড় করলেই হবে না, প্রকল্প বাছাইয়ে সতর্কতার মাধ্যমে প্রকৃত অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, মেগা ব্যয়ের প্রকল্প হাতে নেওয়ার এসব সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার আগামী নির্বাচনের আগে দৃশ্যমান অর্জন দেখাতে চায়। ফলে যেসব প্রকল্প আরও পরে গ্রহণ করলেও সমস্যা হবে না এমন “জনতুষ্টিমূলক” প্রকল্পও অগ্রাধিকার পাচ্ছে।’
জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, ‘বিএনপির অন্যতম লক্ষ্য হলো মেগা প্রকল্প থেকে বিরত থাকা, কারণ মেগা প্রকল্প মেগা দুর্নীতির সঙ্গে সমার্থক। রাষ্ট্রীয় সম্পদ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও মানবাধিকার উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।’
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বিভিন্ন সময়ে একই ধরনের বক্তব্য দেন।
তবে সরকার গঠনের পর নেওয়া পদক্ষেপে সেই অবস্থানের সঙ্গে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
নির্বাচনের পর অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। এর প্রথম পর্যায়ের ব্যয়ই ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। পুরো অর্থায়ন করবে সরকার। ২০২৬ সালের মে মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়।
এ ছাড়া রয়েছে এমআরটি লাইন-৫ দক্ষিণ প্রকল্প। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা। এতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়ন রয়েছে।
চলতি বাজেট বক্তৃতায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা, দ্বিতীয় যমুনা সেতু, তৃতীয় মেঘনা সেতু এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম উড়াল এক্সপ্রেসওয়ের মতো বড় প্রকল্পের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে আগের সরকারের নেওয়া এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ উত্তর প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা।
মেগা প্রকল্পে বাড়ছে আর্থিক দায়
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া কয়েকটি বড় প্রকল্প এখন রাষ্ট্রের জন্য বড় আর্থিক দায়ে পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। এর মধ্যে পায়রা বন্দর, কর্ণফুলী টানেল এবং ঢাকা-গাজীপুর বাস র্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্প অন্যতম।
প্রায় ১৫ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পায়রা বন্দর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে প্রত্যাশিত অবস্থানে যেতে পারেনি। শুধু রাবনাবাদ চ্যানেলের নাব্যতা ধরে রাখতে এরইমধ্যে ছয় হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এর বড় অংশ এসেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে।
১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেলেও যান চলাচল প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। টোলের আয় দিয়ে এর পরিচালন ব্যয় মেটানো যাচ্ছে না। ফলে প্রতি মাসে এটি পরিচালনায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তিন কোটি ৫০ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে।
২০১২ সালে শুরু হওয়া ঢাকা-গাজীপুর বাস র্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় দুই হাজার ৪০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। বিপুল ব্যয়ের পরও নগরবাসী এর তেমন সুফল পাচ্ছে না। তার ওপর এরইমধ্যে শুরু হয়েছে ঋণ পরিশোধ।
মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্পটি ২০২৪ সালের মাঝামাঝি আট হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে শেষ হলেও অপারেটর নিয়োগে চুক্তিগত জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন অচলাবস্থায় ছিল।
প্রকল্পের ভাসমান মুরিং ব্যবস্থা, পাইপলাইন এবং দুই লাখ টন ধারণক্ষমতার সংরক্ষণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় সরকারকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে, কিন্তু বিপরীতে আয় হচ্ছে না। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
বুধবার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি অপারেটর নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।
রেল খাতেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পদ্মা সেতু রেল সংযোগে বর্তমানে কেবল তিনটি আন্তনগর ও দুটি মেইল ট্রেন চলছে। পণ্য পরিবহন প্রায় নেই বললেই চলে। বছরে এক হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও ছয় মাসে এ প্রকল্প থেকে আয় হয়েছে মাত্র ৩৭ কোটি টাকা।
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে প্রত্যাশিত সুফল না পাওয়া চারটি প্রকল্পের একটি হিসেবে এটিকে উল্লেখ করা হয়।
প্রবেশপথে যানজট, কার্যকর ঢাকা রিং রোডের অভাব এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শিল্প পরিকল্পনা না থাকায় এক্সপ্রেসওয়ের যানবাহন শেষ পর্যন্ত রাজধানীতেই এসে চাপ সৃষ্টি করছে।
১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন ২০২৩ সালের নভেম্বরে চালু হলেও পুরোনো রেলপথ ও জরাজীর্ণ সেতুর কারণে এর কার্যকারিতা সীমিত রয়েছে।
এরপরও পাহাড়তলী-দোহাজারী রেললাইনকে ডুয়েল গেজে উন্নীত করা এবং নতুন কালুরঘাট রেল কাম সড়ক সেতু নির্মাণসহ মোট ২১ হাজার কোটি টাকার দুটি প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
মেগা প্রকল্প এড়ানোর আহ্বান
বিদেশি ঋণনির্ভর প্রকল্পের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ ঋণ পরিশোধের চাপ কঠোরভাবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
মুস্তাফা কে মুজেরি টাইমসকে বলেন, ‘বিদেশি ঋণ কম সুদে পাওয়া গেলে প্রকল্পের সামগ্রিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো। কিন্তু বাংলাদেশের ঋণমান দুর্বল হওয়ায় এখন ঋণের খরচ বেড়েছে এবং বৈদেশিক অর্থায়নের চাপও বাড়ছে। এই বাস্তবতায় এসব প্রকল্প এড়িয়ে চলাই যৌক্তিক ছিল।’
কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এমন খাতে এবং বেসরকারি খাতের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে সরকারি বিনিয়োগ ব্যবহার করা উচিত। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমও মানবসম্পদ উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আগে নেওয়া অসমাপ্ত বড় প্রকল্প শেষ করা যুক্তিযুক্ত হতে পারে। তবে নতুন প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে আরও সতর্ক ও সংবেদনশীল হতে হবে।’
সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক অপচয় বন্ধ করা সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের জন্য জরুরি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, রাজস্ব আদায় দুর্বল থাকলে পরিচালন ব্যয় ও ঋণ পরিশোধের জন্য নতুন ঋণ নেওয়ার একটি কঠিন আর্থিক চক্র তৈরি হতে পারে।
এদিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের সক্ষমতাও দুর্বল রয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন হার বহু বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে ছিল। এ সময়ে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র এক দশমিক ৮৫ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে।
ব্যয় বৃদ্ধি, ঋণের চাপ এবং বিদ্যমান অবকাঠামো প্রকল্পের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেও নতুন বড় প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়ে ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু টাইমসকে বলেন, ‘সরকার যেসব প্রকল্প গ্রহণ করছে, তা দেশের স্বার্থেই নেওয়া হচ্ছে।’
এর বাইরে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে টাইমস পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীসহ প্রকল্পসংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজন মন্ত্রীর বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যায়নি।


