যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভাষণকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। গাজায় ৭২ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যার জন্য নেতানিয়াহুকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ আখ্যা দিয়ে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বাইরে বিক্ষোভে নামেন মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও বিশিষ্ট তারকারা।
এ সময় বিক্ষোভ রুখতে চড়াও হয় নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ (এনওয়াইপিডি)। ফার্স্ট অ্যাভিনিউয়ের অবস্থান কর্মসূচি থেকে অস্কারজয়ী হলিউড তারকা সুসান সারান্ডন এবং ‘হ্যাকস’ সিরিজের অভিনেত্রী হানা আইনবাইন্ডারসহ অন্তত ১০৩ জনকে আটক করা হয়েছে।
সিএনএন জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নেতানিয়াহুর বক্তব্যের আগে সদর দপ্তর থেকে কয়েক ব্লক দূরে ফার্স্ট অ্যাভিনিউয়ে অবস্থান নেওয়া বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিতে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে ১০৩ জনকে হেফাজতে নেওয়া হয়।
ঘটনাস্থলের ভিডিওতে সুসান সারান্ডন ও আইনবাইন্ডারের হাতে প্লাস্টিকের হাতকড়া বা বাঁধন লাগিয়ে এনওয়াইপিডির বাসে তুলতে দেখা যায়। বিক্ষোভকারীদের পরনে ছিল ‘বোমার বদলে মানুষের জন্য অর্থ দিন’ লেখা টি-শার্ট এবং হাতে ‘ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করুন’ ও ‘গাজায় গণহত্যা বন্ধ করুন’ লেখা প্ল্যাকার্ড।
ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা মানবাধিকার সংগঠন ‘জিউইশ ভয়েস ফর পিস’ এই অবস্থান কর্মসূচির আয়োজন করে। সংগঠনটি জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কমেডিয়ান ক্যালেব হিয়ারন, লেখক গ্লেনন ডয়েল, নিউইয়র্কের কংগ্রেস নির্বাচনের প্রার্থী দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ে এবং সাবেক মার্কিন সেনা গোয়েন্দা বিশ্লেষক চেলসি ম্যানিং ছিলেন।
এ ছাড়া বিক্ষোভে অভিনেত্রী ও রাজনৈতিক কর্মী সিনথিয়া নিক্সন, নাট্যকার টনি কুশনার, আলোকচিত্রী ন্যান গোল্ডিন, কবি আইলিন মাইলস এবং কংগ্রেস নির্বাচনের প্রার্থী ব্র্যাড ল্যান্ডারও শরিক হন।
বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করা এবং গাজায় গণহত্যা থামানোর আহ্বান জানাতেই এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল বলে সংগঠনটি উল্লেখ করে।
ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। বিক্ষোভকারীরা শান্তিপূর্ণ থাকলেও সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দুপুর ১২টার পর এনওয়াইপিডির কর্মকর্তারা এসে বিক্ষোভকারীদের সরে যেতে বলেন। তখন প্রায় ৩০ জন রাস্তায় বসে ও দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন। পরবর্তীতে বেলা ১টার দিকে সতর্কবার্তা দেওয়ার পর পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সরাসরি আটক করা শুরু করে।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর বক্তব্য চলাকালেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বক্তব্য শুরু হতে বিপুলসংখ্যক কূটনীতিক ক্ষোভ প্রকাশ করে অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। বক্তব্যে নেতানিয়াহু গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পক্ষ সমর্থন করেন এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে দাবি করেন, ইরানে হামলা না চালালে ‘আমরা সবাই মারা যেতাম’।
গত বছর জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্তে বলা হয়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে। ওই দিন হামাস ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। তবে ইসরায়েল সরকার বরাবরের মতোই দাবি করে আসছে, তারা আত্মরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক আইন মেনে যুদ্ধ চালাচ্ছে এবং গণহত্যার অভিযোগ তারা অস্বীকার করে।
ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) নেতানিয়াহু, ইসরায়েলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট এবং হামাসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। নেতানিয়াহু এই পরোয়ানাকে ‘অযৌক্তিক’ ও ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির সদস্য নয়।
নেতানিয়াহুর বক্তব্যের পর নিউইয়র্কের রাস্তায় শত শত ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকারী মিছিল বের করেন। তারা ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’, ‘গাজা’ এবং ‘নেতানিয়াহু, তুমি লুকাতে পারবে না–আমরা তোমাকে গণহত্যার জন্য অভিযুক্ত করছি’ বলে স্লোগান দেন।
ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে দীর্ঘদিনের সোচ্চার সুসান সারান্ডন গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধেরও প্রকাশ্য সমালোচনা করে আসছেন। তার আটকের পর বক্তব্য জানতে সিএনএন তার প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
অন্যদিকে ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে নিজের আটকের খবর নিশ্চিত করে হানা আইনবাইন্ডার লেখেন, ‘নিউইয়র্কে নেতানিয়াহুর লজ্জাজনক সফরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে গিয়ে আমাকে ও আমার বন্ধুদের গ্রেপ্তারের ছবিগুলো যদি কোনো কিছুর প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তাহলে তা যেন ফিলিস্তিন ও দক্ষিণ লেবাননের মানুষের বিরুদ্ধে চলা গণহত্যার দিকে হয়।’
এ ছাড়া জামিনে মুক্ত হওয়ার পর কমেডিয়ান ক্যালেব হিয়ারনও ইনস্টাগ্রামে আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে পোস্ট দিয়েছেন।


