জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে দুই বিভাগের টানাপোড়েন

জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে দুই বিভাগের টানাপোড়েন
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের আইনগত ক্ষমতা নিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের অবসান ঘটছে না। প্রয়োজনীয় বিধিমালার অভাবে পেট্রল, ডিজেল ও অকটেনের দাম নির্ধারণে কোনো গণশুনানির আয়োজন করতে পারছে না বিইআরসি, আর এর পেছনে জ্বালানি বিভাগ কর্তৃক সমন্বিত বিধিমালা আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য দীর্ঘদিন আটকে রাখাকে দায়ী করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন, ২০০৩ অনুযায়ী জ্বালানি পণ্যের দাম বা ট্যারিফ নির্ধারণের ক্ষমতা বিইআরসির। তবে দাম নির্ধারণের আগে ট্যারিফ নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে বিধিমালা করতে হবে কমিশনকে। এরপর লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে গণশুনানি করতে হবে।

বিইআরসির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা টাইমসকে বলেন, ২০১২ সালে তিনটি পেট্রোলিয়াম পণ্যের জন্য আলাদা বিধিমালা তৈরি করে জ্বালানি বিভাগে পাঠিয়েছিল কমিশন। ২০২৩ ও ২০২৪ সালেও বিধিমালাগুলো পাঠানো হয়।

২০২৪ সালে বিধিমালা পাওয়ার পর জ্বালানি বিভাগ তিন পণ্যের জন্য একটি সমন্বিত বিধিমালা তৈরির নির্দেশ দেয়। বিইআরসি ২০২৫ সালে সমন্বিত বিধিমালা তৈরি করে বিভাগে পাঠায়।

তবে সেই বিধিমালা এখনো আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়নি। ফলে সমন্বিত বিধিমালা পাঠানোর পর এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও প্রক্রিয়াটি ঝুলে আছে।

২০১২ সালে আলাদা বিধিমালা পাঠানোর পর প্রায় ১৪ বছর ধরে এই জটিলতা চলছে।

বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ টাইমসকে বলেন, পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম নির্ধারণের আইনগত ক্ষমতা কমিশনের রয়েছে। তবে সেই ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য নির্দিষ্ট বিধিমালা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘ওই বিধিমালা এখনো সরকার অনুমোদন করেনি। তাই বিধিমালা অনুমোদন ছাড়া আমরা এগোতে পারছি না।’

জ্বালানি বিভাগের কাছ থেকে কোনো জবাব পাওয়া গেছে কিনা জানতে চাইলে জালাল আহমেদ বলেন, সমন্বিত বিধিমালা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা জ্বালানি বিভাগের।

তিনি বলেন, ‘আইন মন্ত্রণালয় ভেটিং দেওয়ার পর এটি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।’

তবে বিইআরসি এই দায়িত্ব নেওয়ার মতো প্রস্তুত কি না, সে বিষয়ে ভিন্ন মত জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের।

বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, পেট্রল, অকটেন ও ডিজেলের দাম কৌশলগত পণ্য বিবেচনায় সরকার এখনো মাসিক গেজেটের মাধ্যমে নির্ধারণ করছে।

বিভাগের অপারেশন উইংয়ের যুগ্ম সচিব ও মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী টাইমসকে বলেন, ভবিষ্যতে জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব বিইআরসির কাছেই যেতে হবে। তবে তার আগে কমিশনের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে কোনো এক সময় দায়িত্ব বিইআরসির কাছে যেতে হবে। তবে তার আগে তাদের সক্ষমতা যথেষ্ট বাড়াতে হবে।’

আরও পড়ুন

মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের দাম রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণ, মিন অব প্ল্যাটস (এমওপি) রেট অনুসরণ এবং দাম নির্ধারণের আগে সংশ্লিষ্ট নথি ও ভাউচার যাচাইয়ের সক্ষমতা বিইআরসির থাকতে হবে।

বিইআরসির সক্ষমতা নিয়ে এই মতপার্থক্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তা অধিকারকর্মীদের সমালোচনার মুখে পড়েছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম টাইমসকে বলেন, পণ্য কেনার আগে দামের ভিত্তি যাচাই ও তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার ভোক্তার রয়েছে। তার মতে, সরকার সরাসরি দাম নির্ধারণ করায় ভোক্তাদের এই যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘বিইআরসি এই কাজের জন্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সরকার নয়। সরকার এই ক্ষমতা কোথা থেকে পেল? বিইআরসির এই কাজ করার সক্ষমতা নেই, এমন দাবি করার অধিকার মন্ত্রণালয় বা জ্বালানি বিভাগ কী ভিত্তিতে রাখে?’

শামসুল আলম বিচার বিভাগের দায়িত্ব বণ্টনের সঙ্গে বিষয়টির তুলনা করেন। তার যুক্তি, একটি সরকারি মন্ত্রণালয় চাইলেই কোনো আদালতের নির্দিষ্ট মামলা শুনানির ক্ষমতা নেই বলে সিদ্ধান্ত দিতে পারে না।

তিনি বলেন, জ্বালানি বিভাগের বিইআরসির এখতিয়ার নিয়ে মন্তব্যের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন ওঠে। কারণ কমিশনকে জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব দিয়েই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এ ধরনের মন্তব্য বিইআরসি আইন লঙ্ঘনের শামিল। বিইআরসি আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।’

জ্বালানি পণ্যের দাম কে নির্ধারণ করবে, সেই বিরোধের পেছনে মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য রয়েছে।

অংশীজন ও বিশেষজ্ঞরা আগে বলেছেন, জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব বিইআরসির কাছে গেলে তা নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় আসবে। সেখানে গণশুনানি ও ব্যয়ের বিভিন্ন উপাদান যাচাইয়ের সুযোগ থাকবে।

এ ধরনের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) দাম নির্ধারণের প্রস্তাবের সঙ্গে আমদানি ব্যয়, সিস্টেম লস ও মুনাফার হারসহ বিভিন্ন তথ্য দিতে হবে। গণশুনানিতে অংশীজনরা এসব তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবেন।

তবে বিভিন্ন সরকার দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দামের পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত সমন্বয়ের জন্য জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত পরিবর্তন করা প্রয়োজন। দীর্ঘ গণশুনানি প্রক্রিয়ায় জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে বলেও উদ্বেগ রয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা পণ্য মজুত করার সুযোগ পেতে পারেন।

নির্দিষ্ট বিধিমালা না থাকায় ২০০৩ সালের আইনে ট্যারিফ নির্ধারণের দায়িত্ব বিইআরসিকে দেওয়া হলেও সরকার প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করে আসছে।

২০২৩ সালে বিইআরসি আইন সংশোধনের পর বিষয়টির আইনগত অবস্থান আরও জটিল হয়।

২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি সরকার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০২৩ পাস করে। এতে নির্দিষ্ট বিশেষ পরিস্থিতিতে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সরকারকে জ্বালানি ট্যারিফ নির্ধারণ, সংশোধন বা সমন্বয়ের ক্ষমতা দেওয়া হয়।

এই সংশোধনের ফলে ট্যারিফ নির্ধারণে বিইআরসির ভূমিকার পরিধি বদলে যায়। পরে এই ক্ষমতা ব্যবহার করে সরকার কমিশনের প্রচলিত গণশুনানি প্রক্রিয়া ছাড়াই বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ বিভিন্ন জ্বালানি পণ্যের দাম সমন্বয় করে।

এর কিছুদিন পর জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে আরেকটি বড় পরিবর্তন আসে।

২০২৪ সালের মার্চে সরকার পেট্রোলিয়াম পণ্যের জন্য ফর্মুলাভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু করে।

এই ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ও মূল্য নির্ধারণের ফর্মুলার অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম নির্দিষ্ট সময় পরপর সমন্বয় করার কথা ছিল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহায়তায় পরিচালিত কর্মসূচির আওতায় এই ব্যবস্থা চালু করা হয়।

স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালুর পরও বিইআরসির গণশুনানির মাধ্যমে নয়, সরকারের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মাসিক জ্বালানি মূল্য সমন্বয় অব্যাহত থাকে। এই ব্যবস্থায় প্রথম মূল্য সমন্বয় কার্যকর হয় ২০২৪ সালের মার্চে।

সরকার পরিবর্তনের পর আবার আইনে পরিবর্তন আসে। বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার বিইআরসি আইনের ৩৪এ ধারা বাতিল করে।

এর ফলে সংশোধিত আইনে সরকারকে ট্যারিফ নির্ধারণের যে নির্দিষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, তা বাতিল হয়। তবে পেট্রল, ডিজেল ও অকটেনের দাম নির্ধারণে বিইআরসির ক্ষমতা কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় বিধিমালা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

ফলে ট্যারিফ নির্ধারণে আইনি দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও এসব পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়া কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় বিধিমালা না থাকায় বিইআরসি এখনো জটিলতার মধ্যে রয়েছে।

লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অংশীজনকে নিয়ে গণশুনানির মাধ্যমে পেট্রল, ডিজেল ও অকটেনের দাম নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় বিধিমালা এখনো চূড়ান্ত করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার বা বর্তমান সরকার।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad