সরকার ঘোষিত নতুন বাজেটকে ‘বাস্তবতা বিবর্জিত’ ও ‘উচ্চাভিলাষী’ বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতিকে দিশা দেখানোর মতো কোনো পরিকল্পনা বা কার্যকর সংস্কার এ বাজেটে নেই।
শুক্রবার বিকাল ৩টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের কাজীর দেউড়ি সার্কিট হাউসে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন। এর আগে, তিনি চট্টগ্রামের জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসা-সংলগ্ন মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীসহ স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে এবং রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে প্রায় ছয় লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে এতো রাজস্ব আদায় কখনো সম্ভব হয়নি। বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো ও করব্যবস্থার মধ্যে এমন লক্ষ্য অর্জন বাস্তবসম্মত নয়।
তিনি বলেন, সর্বশেষ বাজেটেও রাজস্ব আদায় হয়েছে তিন লাখ কোটির কিছু বেশি। সেখানে এক বছরের ব্যবধানে দ্বিগুণ রাজস্ব আদায় সম্ভব নয়। ফলে সরকারের এ বাজেটকে তারা উচ্চাভিলাষী মনে করছেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বাজেট ঘোষণার আগে এনসিপি নিজেদের পক্ষ থেকে একটি ‘ছায়া বাজেট’ উপস্থাপন করেছিল। তারা আশা করেছিলেন, সরকার সেটি বিবেচনায় নেবে। এখনো সরকার চাইলে তাদের প্রস্তাবনা বিবেচনা করতে পারে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক সংস্কারের পর অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু এ বাজেটের মাধ্যমে তা সম্ভব হবে না। যদিও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং কিছু পণ্যে কর কমানোর উদ্যোগ ইতিবাচক, তবে সেগুলো বাস্তবায়নযোগ্য হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, এতো কম সময়ে বিদ্যুতের দাম অতীতে এত বেশি বাড়েনি। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে গেছে।
তিনি বলেন, বড় বাজেট মানেই বড় দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হওয়া। বিভিন্ন খাল খনন বা কার্ডভিত্তিক কর্মসূচিতে সরকারি দলের এমপিরা বরাদ্দ পেলেও সেখানে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যে ঋণখেলাপিদের টাকা ফেরত আনা, আওয়ামী লীগ আমলে লুটপাট ও বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধার কিংবা সংশ্লিষ্টদের বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই বলেও মন্তব্য করেন এনসিপির আহ্বায়ক।
এস আলম গ্রুপের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ‘পুষ্ট’ বড় বড় মাফিয়া ও অলিগার্করা জনগণের টাকা লুট করে বিদেশে অবস্থান করছে। কিন্তু তাদের বিচারের আওতায় আনার কোনো বক্তব্য সরকার থেকে পাওয়া যায়নি। বরং ইসলামী ব্যাংককে আবার এস আলমের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন নাহিদ ইসলাম।
আদ-দীন হাসপাতাল প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, হাসপাতালটির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে জামায়াত বা ১১ দলকে কোনঠাসা করার চেষ্টা করছে। একইসঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপরও আঘাত আসছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখন নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের প্রায় তিন কোটি আমানতকারী মুখ ফিরিয়ে নিলে তার প্রভাব অন্য ব্যাংকেও পড়বে। ফলে সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য এটি বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাজেট ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে তিনটি মৌলিক সংকট রয়েছে বলে মনে করে এনসিপি। এগুলো হলো- ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের অসম চুক্তি এবং তরুণদের কর্মসংস্থান সংকট।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারকে বিদেশি উৎস ও দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হবে। এতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান আরও সংকুচিত হবে। তরুণদের কর্মসংস্থান কীভাবে বাড়ানো হবে কিংবা ব্যাংকিং খাতের লুটপাট ও সংকট থেকে কীভাবে উত্তরণ হবে, সে বিষয়ে বাজেটে কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই।
আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দলটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দলগতভাবে তাদের বিচার হবে। সংসদেও দলটিকে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এবং গণমাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচারণা চলতে থাকলে তা আইন লঙ্ঘনের শামিল হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিয়েও কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, বৃষ্টি হলেই নগরবাসী চরম ভোগান্তিতে পড়ে। এ সমস্যা সমাধানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও প্রশাসনকে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সংসদের ভেতরে ও বাইরে এনসিপি তাদের প্রস্তাবনা ও সমালোচনা অব্যাহত রাখবে জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার তাদের বক্তব্য গুরুত্ব দিয়ে শুনবে বলে তারা আশা করছেন। একই সঙ্গে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় অনুযায়ী দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নেরও দাবি জানান তিনি।


