আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তদন্ত একই বাহিনীর হাতে দেওয়া হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
বুধবার রাজধানীর বিডিবিএল ভবনে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ও গুম প্রতিরোধ আইন ২০২৬ (খসড়া): প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা একথা বলেন।
সংস্কার ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ভয়েস ফর রিফর্ম ও নাগরিক কোয়ালিশন যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে।
আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গুম কমিশনের সাবেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিস। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ভয়েস ফর রিফর্মের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর।
নাবিলা ইদ্রিস বলেন, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬’, ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬’ এবং র্যাব-সংক্রান্ত নতুন আইনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। তিনটি আইনের ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার ওপরই দেওয়া হয়েছে।
তার মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত বাহিনীর সদস্য—উভয়ের জন্যই কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, ক্ষমতা কখনো চিরস্থায়ী নয়। ভবিষ্যতে বর্তমান সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও এসব আইনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীতে পরিণত হতে পারেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, কোনো নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সেই বাহিনীকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে না। তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘অপরাধীই যদি তদন্তকারী হয়, ন্যায়বিচার হবে কীভাবে?’
তিনি আরও বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে আইনে কারাদণ্ডের ঝুঁকি রাখা হয়েছে। এতে আগে থেকেই ট্রমার মধ্যে থাকা পরিবারগুলো অভিযোগ করতে আরও ভয় পাবে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো পরিকল্পনা বা ইচ্ছা না থাকলে এ ধরনের আইন করার প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, কমিশনের প্রধান ও সদস্যদের নির্বাচনের জন্য যে সার্চ কমিটি করা হয়েছে, সেখানে নয়জনের মধ্যে আটজনই সরকারি দলের হওয়ায় কমিশন দলীয় আজ্ঞাবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এনপিএর অনিক সেন বলেন, প্রস্তাবিত আইন দুটি জুলাইয়ের আত্মত্যাগের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। খসড়া আইন পরিবর্তন না হলে জনগণের করের টাকায় নতুন করে একটি দলীয় কমিশন গঠনের কোনো প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মানবাধিকারকর্মী ও আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, নিরাপত্তা বাহিনী জনগণের করের টাকায় পরিচালিত হয়। তাদের প্রধান দায়িত্ব শুধু সরকার বা কোনো দলের নিরাপত্তা দেওয়া নয়, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পেশাজীবী হিসেবে কাজ করার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আরমান বলেন, নতুন দুটি আইন দেশে ‘ডিপ স্টেট’-এর প্রভাব কতটা শক্তিশালী, তা প্রমাণ করে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্ব এ ধরনের আইন তৈরি করতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার দল অন্যান্য বিরোধী দলের সঙ্গে নিয়ে সংসদে খসড়া আইনের বিতর্কিত ধারাগুলো বাতিলের দাবিতে লড়াই করবে বলেও জানান।
আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন গুমের শিকার ফাহাদ চৌধুরী দিপু, এবি পার্টির সভাপতি মুজিবুর রহমান মঞ্জু, দৈনিক ওয়াদার ম্যানেজিং এডিটর ফয়সাল মাহমুদ, অল্টারনেটিভসের সংগঠক তাজনূভা জাবীন, রাষ্ট্র সংস্কারের হাসিব হোসাইন, সাবেক পুলিশ সংস্কার কমিশনের সদস্য জারিফ রহমানসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।


