কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টার মাঝে বাংলাদেশকে এক কঠিন পরিস্থিতির মুখে ফেলেছে মারাত্মক জলবায়ু ঝুঁকি ও আইনের নানা ফাঁকফোকর। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে মানবপাচারকারী ও অবৈধভাবে মানুষ পারাপার করা অসাধু চক্র।
জাতিসংঘের ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইমস বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে কীভাবে পরিবেশগত বিপর্যয় এবং অপরাধীদের শোষণ এক সুতোয় গেঁথে গেছে তা তুলে ধরেছে।
প্রায় ১৭ কোটি ৭০ লাখ মানুষের বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিচারে অত্যন্ত বিপজ্জনক ও দুর্যোগপ্রবণ এক দেশ।
কাজের খোঁজে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। বর্তমানে প্রায় ৭৪ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী হিসেবে বাইরে বসবাস ও কাজ করছেন।
বিদেশে থাকা এসব মানুষের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিগুলোর একটি, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১১ শতাংশ জোগান দেয়।
তবে কাজের অভাব, বিশেষ করে তরুণদের বেকারত্ব এবং হঠাৎ কোনো বিপদে গ্রামঞ্চলের গরীব পরিবারগুলোর চরম অসহায়ত্ব এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। টিকে থাকার তাগিদে হাজার হাজার মানুষ বাধ্য হয়ে পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ছেন কিংবা অবৈধ উপায়ে বিদেশ যাওয়ার পথ খুঁজছেন।
ইউএনওডিসি’র ‘জিএলও.এসিটি’ দক্ষিণ এশিয়া প্রজেক্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব চাপের মুখে পড়ে অসহায় মানুষ বিদেশে পাড়ি দিতে সাগরের ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছেন, আন্তর্জাতিক পাচারকারীদের জালে পা দিচ্ছেন এবং বিদেশের আইনি জটিলতায় পড়ে অপরাধী হিসেবে সাজা পাচ্ছেন।

জলবায়ু-অভিবাসন ফাঁদ
এই সংকট গভীর হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে অপরাধীদের শোষণের সরাসরি সম্পর্ক। হঠাৎ ঘটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত পরিবর্তন–উভয় দিক থেকেই মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়া।
২০২০ সালেই পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে এই অঞ্চলে প্রায় ৯৩ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ওই বছর সারা বিশ্বে প্রাকৃতিক দুর্যোগে যত মানুষ ঘর ছেড়েছেন, তার প্রায় তিন ভাগের এক ভাগই ঘটেছে এই দক্ষিণ এশিয়ায়।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া পরিবারগুলো শেষ সম্বল হিসেবে এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়াকেই বাঁচার পথ মনে করে।
নিরাপদ ও আইনি উপায়ে বিদেশ যাওয়ার সহজ সুযোগ না থাকায় এই জলবায়ু উদ্বাস্তুরা সরাসরি পাচারকারীদের ফাঁদে পা দেন। এর ফলে তারা প্রায়শই বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে কঠোর শ্রম দিতে বাধ্য হন কিংবা দেনার দায়ে বন্দি হয়ে পড়েন। দক্ষিণ এশিয়ায় এটিই শোষণের সবচেয়ে বড় রূপ।
জলবায়ু, অপরাধ ও শোষণ প্রতিরোধে নীতিগত নির্দেশিকা তৈরি হলেও, বাংলাদেশে তথ্য সংগ্রহের জাতীয় ব্যবস্থা এখনও যথেষ্ট শক্ত নয়। তাই এই ক্রমবর্ধমান সংকট সঠিকভাবে পরিমাপ করার মতো প্রয়োজনীয় জলবায়ু-সংক্রান্ত তথ্যের অভাব রয়েই গেছে।
বঙ্গোপসাগরে আশঙ্কাজনক প্রাণহানি
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরের মানবিক সংকট সমুদ্রপথে এই অবৈধ যাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে আসা ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা এখানে বসবাস করছেন।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই শরণার্থী শিবিরের দুর্বল ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো সামান্য ঝড়-বৃষ্টি বা পাহাড়ধসেই ভেঙে পড়ে। আশ্রয়ের অনিশ্চয়তা, চরম আবহাওয়া আর কোনো কাজ না থাকায় রোহিঙ্গারা বাধ্য হয়ে বিপজ্জনক সমুদ্রপথ বেছে নিচ্ছেন।
২০২২ সালে ৩,৭০০ জনেরও বেশি রোহিঙ্গা সমুদ্রপথে রওনা দেন, যার মধ্যে অন্তত ৩৫০ জন নিখোঁজ বা মারা যান। ২০১৫ সালের আন্দামান সাগরের সংকটের পর এটিই ছিল সাগরে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির বছর। ২০২৩ সালে এসে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট—এই আট মাসেই আরও ৩ হাজার ৪০০ জন জল ও স্থলপথে পালানোর চেষ্টা করেন এবং ২০৭ জন প্রাণ হারান। ২০২২ সালের ওই একই সময়ের তুলনায় ২০২৩ সালে সমুদ্রযাত্রা ৫৬ শতাংশ বাড়ে এবং প্রাণহানির ঘটনা বাড়ে প্রায় ১৯২ শতাংশ।
ইউএনওডিসি’র গবেষণায় দেখা গেছে, রোহিঙ্গা পাচারে ব্যবহৃত ট্রলার, রুট ও একই পাচারকারী সিন্ডিকেট ব্যবহার করে এখন বাংলাদেশি নাগরিকদেরও মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় পাচার করা হচ্ছে।

ভূমধ্যসাগরীয় রুট ও অন্যায় শাস্তি
এই পাচার চক্রের হাত কেবল এশিয়াতেই থেমে নেই। ইউরোপের উদ্দেশ্যে মধ্য-ভূমধ্যসাগরীয় বিপজ্জনক পথ পাড়ি দেওয়া মানুষদের মধ্যে বাংলাদেশিরা এখন পঞ্চম স্থানে রয়েছেন।
লিবিয়া ও তিউনিশিয়া হয়ে ইউরোপগামী এই যাত্রায় ২০২২ ও ২০২৩ সালে ইতালিতে অবৈধভাবে পৌঁছানো মানুষের শীর্ষ পাঁচটি দেশের তালিকায় ছিল বাংলাদেশ।
কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নে পৌঁছানোর পর এই মানুষগুলোর ওপর আরেকটি বড় অন্যায় ঘটে। ইইউভুক্ত দেশগুলোতে মানব পাচারের অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত অ-ইউরোপীয় নাগরিকদের তালিকায় শীর্ষ ১০-এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশিদের নাম। ইউএনওডিসি বলছে, এটি আসলে ভুক্তভোগী ও আসল অপরাধীকে আলাদা করতে পারার ব্যর্থতার ফল।
যথাযথ যাচাই-বাছাই না করার কারণে যে সাধারণ মানুষগুলোকে ভয় দেখিয়ে বা প্রতারণা করে পাচার করা হয়েছিল, বিদেশের আদালত তাদের ভুক্তভোগী হিসেবে না দেখে উল্টো অপরাধী বানিয়ে সাজা দিচ্ছে।
আইনি শূন্যতায় পার পাচ্ছে পাচারকারীরা
বাংলাদেশে আইনের কিছু ফাঁক থাকার কারণে এই অসাধু চক্রগুলোকে পুরোপুরি থামানো যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক আইনে ‘মানব পাচার’ এবং ‘অবৈধভাবে অভিবাসী পারাপার’ দুটি আলাদা অপরাধ হলেও, বাংলাদেশে অবৈধভাবে অভিবাসী পারাপার বা পাচার বন্ধে আলাদা কোনো জাতীয় আইন নেই।
বাংলাদেশ ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক মানের ‘মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন’ এবং ২০১৭ সালে তার বিধিমালা তৈরি করলেও, অভিবাসী পারাপার বন্ধে সমান্তরাল আইন করতে পারেনি।
এর মূল কারণ আন্তর্জাতিক চুক্তির বাধ্যবাধকতা। বাংলাদেশ ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ প্রতিরোধ বিষয়ক কনভেনশন এবং মানব পাচার প্রতিরোধ প্রোটোকলে স্বাক্ষর করলেও, অভিবাসী পারাপার সংক্রান্ত প্রোটোকলে এখনও সই করেনি।
পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় কেবল ভারত এই প্রোটোকলে সই করেছে। ফলে বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলের অভিবাসী পাচারকারীরা আইনের ফাঁক গলে বহাল তবিয়তে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
সুনির্দিষ্ট আইনি ক্ষমতা না থাকায় পুলিশ বা বিচার বিভাগ এই হাজার কোটি টাকার পাচার ব্যবসার পেছনে থাকা অবৈধ লেনদেন ও টাকার উৎস খুঁজে বের করে তা বন্ধ করতে পারছে না।

জাতীয় পদক্ষেপ জোরদার করার তাগিদ
বাংলাদেশে মানব পাচার দমনে প্রধান দায়িত্ব পালন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পরিস্থিতি সামলাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। যেমন–২০২০ সালের মার্চে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর ও সিলেট–এই সাতটি বিভাগীয় শহরে বিশেষ ‘মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করা হয়েছে। বাকি ৫৭টি জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল অতিরিক্ত হিসেবে এই মামলাগুলো দেখছে।
পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের তিনটি ধাপে পাচার বিরোধী কমিটি কাজ করছে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ভুক্তভোগীদের আশ্রয় দিচ্ছে এবং সরকারি আইন সহায়তা সংস্থা (এনএলএএসও) বিনামূল্যে আইনি সেবা দিচ্ছে।
তবে পাচারকারী সিন্ডিকেটগুলোকে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিতে এবং সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে ইউএনওডিসি কয়েকটি জরুরি পরামর্শ দিয়েছে।
এর মধ্যে প্রধান হলো–অবৈধ অভিবাসী পারাপারকে জাতীয় আইনে স্পষ্ট অপরাধ হিসেবে গণ্য করা, আন্তর্জাতিক প্রোটোকলে সই করা এবং জাতীয় তথ্যে জলবায়ুজনিত সংকটের হিসাব অন্তর্ভুক্ত করা।
একই সঙ্গে, জাতীয় পর্যায়ে একটি নির্দিষ্ট নির্দেশিকা তৈরি করা দরকার, যাতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর সমন্বয় করে আসল ভুক্তভোগীদের চিহ্নিত করতে পারে। এর ফলে শোষণের শিকার হওয়া সাধারণ মানুষকে শাস্তি না দিয়ে আইনি সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।


