আলোচিত এপস্টেইন নথির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে হাজতে জন্মদিন কাটাতে হলো ব্রিটেইনের রাজা তৃতীয় চার্লসের ছোট ভাই অ্যান্ড্রুকে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বৃহস্পতিবার সারাদিন তাকে থেমস ভ্যালির থানায় আটকে রাখে গোয়েন্দারা। এরপর সন্ধ্যায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ব্রিটিশ সিংহাসনের অষ্টম উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচিত এই জ্যেষ্ঠ রাজপরিবারের সদস্যের গ্রেপ্তার আধুনিক ব্রিটেনে এক বিরল ঘটনা। তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে বাকিংহাম প্যালেসকেও আগাম বার্তা দেওয়া হয়নি।
রাজা চার্লস এক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, ‘আইন তার নিজস্ব পথে চলবে।’ কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ রাজপরিবারের ‘পূর্ণ ও আন্তরিক সমর্থন ও সহযোগিতা’ পাবে বলেও জানান তিনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও অ্যান্ড্রুর গ্রেপ্তারকে ‘দুঃখজনক’ বলেছেন। তার ভাষায়, ‘এটি রাজপরিবারের জন্য খুবই খারাপ সময়।’
এদিকে এপস্টেইন বিতর্কে যুবরাজের টাইটেল ছেড়ে দিলেও মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর অ্যান্ড্রুর দুর্গতি শেষ হচ্ছে না। অভিযোগ উঠেছে- যুবরাজ থাকাকালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে বন্দি অবস্থায় ‘আত্মহত্যা’ করা দণ্ডিত কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের কাছে সরকারি নথি পাঠিয়েছিলেন।
‘পাবলিক অফিসে অসদাচরণ’-এর সন্দেহ থেকেই তাকে গ্রেপ্তার বলে জানিয়েছে থেমস ভ্যালি পুলিশ।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবারই তার ৬৬তম জন্মদিন ছিল। সন্ধ্যা ৭টার কিছু পর পূর্ব ইংল্যান্ডের আইলশামের একটি পুলিশ স্টেশন থেকে তাকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়।
থেমস ভ্যালি পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে তদন্তাধীন অবস্থায় মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
‘পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন’ শেষে মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে উল্লেখ করে সহকারী প্রধান কনস্টেবল অলিভার রাইট বলেন, ‘মামলাটিতে মূলত জনস্বার্থ রয়েছে। এখানে সাধারণ জনগণের ক্ষতি সাধন করা হয়ে থাকতে পারে। সময়মতো হালনাগাদ তথ্য দেওয়া হবে।’

প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের দ্বিতীয় ছেলে অ্যান্ড্রু অবশ্য তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছেন। কুখ্যাত যৌন অপরাধী এপস্টেইনের সঙ্গে বন্ধুত্বের জন্য অনুতাপ প্রকাশ করলেও তিনি যুবরাজ পদবী ব্যবহার করে ব্রিটেনবিরোধী কোনো অপরাধের কথা স্বীকার করেননি।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সরকার এপস্টেইন-সংক্রান্ত ৩০ লাখের বেশি নথি প্রকাশ করার পরও তিনি প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
ওয়াশিংটনের ফেডারেল আদালতের প্রকাশিত নথিতে বলা হয়েছে, ২০১০ সালে সরকারের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে ভিয়েতনাম ও সিঙ্গাপুর সফরের গোপনীয় প্রতিবেদন এপস্টেইনের কাছে পাঠিয়েছিলেন তিনি।
২০১১ সালে এপস্টেইনের সঙ্গে অ্যান্ড্রুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও যৌন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর তিনি সরকারি ওই পদে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন।
এরপর ২০১৯ সালে এপস্টেইনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ মিললে সব সরকারি রাজকীয় দায়িত্ব থেকেও সরে দাঁড়ান অ্যান্ড্রু। পরে গত অক্টোবরে তার ‘প্রিন্স’ টাইটেল ও সম্মাননা কেড়ে নেন বড় ভাই ও ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লস।
যেভাবে গ্রেপ্তার হন অ্যান্ড্রু
গ্রেপ্তারের দিন স্যান্ড্রিংহাম এস্টেটের উড ফার্মে অবস্থান করছিলেন মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ছয়টি পুলিশের গাড়ি ও প্রায় আটজন সাদা পোশাকের কর্মকর্তাকে তার বাড়ি ঘিরে ফেলতে দেখা যায়। এরপর তাকে নিয়ে বেড়িয়ে আসেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
এমনকি সবশেষ রাজপরিবারের যে উইন্ডসর প্যালেসে অ্যান্ড্রু থাকতেন, একইসময়ে সেখানেও তল্লাশি চালানো হয়।
পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তার মানেই দোষী সাব্যস্ত হওয়া নয়। তবে তাদের কাছে সাবেক এই যুবরাজের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ ছিল।
যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী, পাবলিক অফিসে অসদাচরণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এ ধরনের মামলা ক্রাউন কোর্টে বিচার হয়। এটি কমন ল’ভিত্তিক অপরাধ যা লিখিত আইনে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত নয়।
পুলিশ বলেছে, এ ধরনের মামলায় ‘বিশেষ জটিলতা’ থাকে। এপস্টেইনের সহযোগিতায় অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আনা ভার্জিনিয়া গিউফ্রের মামলার সঙ্গেও এই মামলার কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন তারা। কারণ ওই মামলা ২০২২ সালেই সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করেন ব্রিটিশ রাজপরিবারের এই গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
তবে একই সময়ে অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের রাজতন্ত্রবিরোধী সংগঠন ‘রিপাবলিক’ অভিযোগ করেছে, ২০১০ সালে এক নারীকে যৌন অপরাধ সংগঠনের উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যে আনার ঘটনায় জড়িত ছিলেন মাউন্টব্যাটন অ্যান্ড্রু। থেমস ভ্যালি পুলিশ জানিয়েছে, উইন্ডসর ক্যাসেলের ভেতরেই ওই নারীকে নিয়ে আসার অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা তারা মূল্যায়ন করছেন।
যদি শেষ পর্যন্ত সাবেক যুবরাজ অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ গঠন হয়, তবে তিনি অল্প কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্যের একজন হবেন, যাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়েছে।


