রাত সাড়ে আটটা। ঢাকার একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের চারজন মানুষ একই ডাইনিং টেবিলে বসে আছেন। ভাত পরিবেশন করা হয়েছে, কিন্তু টেবিলে কথাবার্তা খুব একটা নেই। বাবা অফিস থেকে ফিরে মোবাইলে একটি রাজনৈতিক টকশো দেখছেন। মা ইউটিউবে নতুন একটি রান্নার রেসিপি দেখছেন। তেরো বছরের ছেলেটা হেডফোন কানে দিয়ে শর্ট ভিডিও স্ক্রল করছে। ছোট মেয়েটা ট্যাবলেটে কার্টুনে ডুবে আছে। একই ছাদের নিচে, একই টেবিলে বসে থেকেও যেন চারজন চারটি আলাদা পৃথিবীতে বাস করছে। দৃশ্যটা আমাদের কাছে এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে আমরা আর এটাকে প্রশ্ন করি না। কিন্তু এই দৃশ্যটা আমাকে বারবার আরেকটি দৃশ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। মাত্র ত্রিশ বছর আগে বাংলাদেশের সন্ধ্যাগুলো কি এমন ছিল?
নব্বইয়ের দশকের একটি সাধারণ সন্ধ্যার কথা মনে করুন। বাবা অফিস থেকে ফিরেছেন, মা রান্নাঘরের শেষ কাজগুলো গুছিয়ে নিচ্ছেন, ছোটরা পড়ার টেবিল ছেড়ে ড্রয়িংরুমে এসে বসেছে। একটু পর বিটিভিতে নাটক শুরু হবে, অথবা ‘ইত্যাদি’। অনেক বাড়িতে রাতের খাবারের সময়টাই অনুষ্ঠান দেখার সময় ছিল। অনুষ্ঠান শেষ হলে টেলিভিশন বন্ধ হয়ে যেত, কিন্তু গল্পটা শেষ হতো না। পরদিন স্কুলে সেই নাটক নিয়ে আলোচনা হতো, অফিসে আড্ডা জমত, চায়ের দোকানে তর্ক হতো। একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান তখন শুধু বিনোদন ছিল না; সেটি ছিল একটি সমাজের সম্মিলিত স্মৃতির অংশ। আমি বলছি না, সেই সময় আজকের চেয়ে ভালো ছিল। তখন তথ্যের সীমাবদ্ধতা ছিল, পছন্দের স্বাধীনতা কম ছিল। কিন্তু একটি বিষয় ছিল—আমরা একই সময়ে একই গল্প দেখতাম, একই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতাম। আজ একই পরিবারের মানুষ একই ছাদের নিচে থেকেও ভিন্ন ভিন্ন গল্পের মধ্যে বাস করে। এই পরিবর্তনটাই আমাকে ভাবায়।
তারপর পৃথিবী বদলাতে শুরু করল। স্যাটেলাইট টেলিভিশন এলো, আমাদের ঘরে ঢুকে পড়ল নতুন ভাষা, নতুন সংস্কৃতি, নতুন গল্প। শাহরুখ খান, অমিতাভ বচ্চন, দক্ষিণ ভারতের সিনেমা, পরে কোরিয়ান নাটক—সবই আমাদের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে উঠল। এরপর এলো ইন্টারনেট, স্মার্টফোন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। পৃথিবীর দরজা যেন এক মুহূর্তে খুলে গেল। একজন গ্রামের কৃষক ইউটিউব দেখে নতুন কৃষি প্রযুক্তি শিখতে পারলেন, একজন শিক্ষার্থী বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তৃতা শুনতে পারলেন, একজন তরুণ নিজের তৈরি ভিডিও দিয়ে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও পৌঁছে গেলেন। একই প্রযুক্তি আবার সেই কৃষককেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা উদ্দেশ্যহীন ভিডিও দেখিয়ে সময়ও কেড়ে নিতে পারল। প্রযুক্তি আমাদের সম্ভাবনাও দিয়েছে, বিভ্রান্তিও দিয়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের সঙ্গে আরেকটি পরিবর্তন ঘটল, যেটি নিয়ে আমরা খুব কম কথা বলি। এক সময় একজন সম্পাদক ঠিক করতেন আমরা কী দেখব। আজ সেই সিদ্ধান্তের বড় একটি অংশ নিচ্ছে একটি অ্যালগরিদম। এক সময় একটি পরিবার একই গল্প দেখত। আজ একই পরিবারের চারজন মানুষ চারটি আলাদা গল্পের মধ্যে বাস করে। প্রশ্নটা প্রযুক্তির নয়। প্রশ্নটা হলো—একটি জাতির সম্মিলিত মনোযোগের মানচিত্র কীভাবে বদলে গেল?
আমার কাছে মনে হয়, এখানেই আলোচনাটা নতুন দিকে মোড় নেয়। বাংলাদেশে এখন প্রায় দশ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। যদি গড়ে ধরে নেওয়া যায় এই মানুষগুলোর প্রত্যেকে দিনে তিন ঘণ্টাও অনলাইনে কাটান, তাহলে প্রতিদিন ত্রিশ কোটি মানবঘণ্টা স্ক্রিনের সামনে ব্যয় হচ্ছে। এক মাসে, এক বছরে সেই সময়ের পরিমাণ কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়। এই সময়ের খুব সামান্য অংশও যদি জ্ঞান, গবেষণা কিংবা সৃজনশীল কাজে বিনিয়োগ করা যেত, তাহলে তার সামাজিক মূল্য কত হতে পারত—সেই হিসাব আমরা কখনো করি না। আমরা অবকাঠামো পরিকল্পনা করি টাকা দিয়ে, বিদ্যুৎ উৎপাদন মাপি মেগাওয়াটে, অর্থনীতি হিসাব করি জিডিপি দিয়ে। কিন্তু একটি জাতির সম্মিলিত মনোযোগের মূল্য কি কখনো হিসাব করেছি? আজ একজন বাংলাদেশি দর্শকের হাতে পৃথিবীর প্রায় সব কনটেন্ট পৌঁছে গেছে। কিন্তু সেই বিপুল কনটেন্টের ভিড়ে বাংলা ভাষার মানসম্মত কনটেন্টের অবস্থান কোথায়? ভারতের উদাহরণই ধরা যাক। বিশাল দর্শকসংখ্যা, বহু ভাষার বাজার, বড় বিনিয়োগ এবং দীর্ঘদিনের সৃজনশীল শিল্পের কারণে সেখানে প্রতি বছর অসংখ্য চলচ্চিত্র, সিরিজ, শিশুতোষ অনুষ্ঠান, তথ্যচিত্র ও শিক্ষামূলক কনটেন্ট তৈরি হয়। সব কাজ যে অসাধারণ, তা নয়। কিন্তু বড় বাজারের একটি সুবিধা হলো, ভালো কাজের টিকে থাকার সুযোগও বেশি। বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। আমাদের বাজার ছোট, বিনিয়োগ সীমিত, আর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। ফলে একজন নির্মাতা প্রায়ই শিল্প আর টিকে থাকার লড়াই—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যান। তিন মাস ধরে গবেষণা করে একটি তথ্যচিত্র বানাবেন, নাকি তিন দিনে এমন একটি ভিডিও তৈরি করবেন, যা অ্যালগরিদম দ্রুত ছড়িয়ে দেবে? এই দ্বন্দ্ব একজন ব্যক্তির নয়; এটি পুরো সৃজনশীল অর্থনীতির বাস্তবতা। আজ আমরা সৃজনশীল অর্থনীতি নিয়ে কথা বলি, কিন্তু সেই অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল যে মানুষের মনোযোগ, সে বিষয়টি নিয়ে আমাদের আলোচনা খুবই সীমিত।
এই বাস্তবতা শুধু চলচ্চিত্র বা ইউটিউবেই সীমাবদ্ধ নয়। একদিন রাত সাড়ে এগারোটায় এক অনলাইন সাংবাদিকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন, খবর বদলায়নি, কিন্তু শিরোনাম তিনবার বদলাতে হয়েছে। কারণ আগের শিরোনামে ক্লিক কম এসেছে। আরেকজন তরুণ নির্মাতা বললেন, কয়েক মাস ধরে একটি তথ্যচিত্র বানানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। পরে সেটি স্থগিত রেখে কয়েক দিনের মধ্যে ছোট ছোট ভিডিও বানাতে শুরু করেছেন। কারণ অ্যালগরিদম তিন মাস অপেক্ষা করে না। আমরা প্রায়ই ক্লিকবেইট, ভাইরাল কনটেন্ট কিংবা অগভীর ভিডিওর সমালোচনা করি। কিন্তু খুব কমই ভাবি, এই মানুষগুলো আসলে কোন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কাজ করছেন। তাদের আয়ের বড় অংশ নির্ভর করে মানুষের মনোযোগের ওপর। ফলে ভাইরাল হওয়া অনেক সময় ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, টিকে থাকার কৌশল। প্রশ্নটা তাই কনটেন্ট নির্মাতাদের দোষের নয়। প্রশ্নটা হলো, আমরা কি এমন একটি সৃজনশীল পরিবেশ তৈরি করেছি, যেখানে গবেষণাভিত্তিক, চিন্তাশীল এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্য তৈরি করতে পারে—এমন বাংলা কনটেন্টও অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকতে পারে? যদি না পারে, তাহলে সমস্যাটা ব্যক্তি নয়; সমস্যাটা সেই কাঠামো, যেখানে গভীরতার চেয়ে গতি, আর স্থায়ী মূল্যের চেয়ে তাৎক্ষণিক মনোযোগ বেশি পুরস্কৃত হয়।
এই জায়গায় এসে আমার বারবার বাংলাদেশ টেলিভিশনের কথা মনে পড়ে। বিটিভির অনুষ্ঠান ভালো ছিল না খারাপ ছিল, সেই বিতর্কে আমি যেতে চাই না। বরং আমাকে অন্য একটি বিষয় ভাবায়। স্বাধীনতার পর বহু বছর ধরে রাষ্ট্রের হাতে দেশের সবচেয়ে বড় পর্দাটি ছিল। কোটি কোটি মানুষ একই সময়ে সেই পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকত। রাষ্ট্রের হাতে মানুষের মনোযোগের এমন বিরল সুযোগ খুব কম দেশই পায়। কিন্তু সেই সুযোগকে কি আমরা ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরির একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হিসেবে ব্যবহার করতে পেরেছিলাম? বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য, শিশুদের কল্পনাশক্তি কিংবা সৃজনশীল চিন্তাকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক বিনিয়োগ কি আমরা করতে পেরেছি? নাকি বিটিভি ধীরে ধীরে সরকারের মুখপাত্রে পরিণত হয়েছে, আর মানুষও ধীরে ধীরে অন্য পর্দায় চলে গেছে? আমার কাছে মনে হয়, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হারানো সুযোগগুলোর একটি এখানেই। একসময় রাষ্ট্র মানুষের সম্মিলিত মনোযোগের বড় অংশের অভিভাবক ছিল। আজ সেই জায়গার বড় অংশ দখল করে নিয়েছে বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অ্যালগরিদম। এই পরিবর্তনকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু এখান থেকেই নতুন প্রশ্ন শুরু হয়—রাষ্ট্রের ভূমিকা এখন কী? আমার কাছে মনে হয়, রাষ্ট্রের কাজ ফেসবুক বা ইউটিউবের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা নয়; রাষ্ট্রের কাজ এমন একটি সৃজনশীল পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে একজন লেখক, নির্মাতা, গবেষক বা সাংবাদিক জানবেন—মানসম্মত কাজেরও একটি টেকসই ভবিষ্যৎ আছে। কারণ একটি সুস্থ সৃজনশীল অর্থনীতি কেবল বাজার দিয়ে গড়ে ওঠে না; সেটি গড়ে ওঠে দীর্ঘমেয়াদি নীতি, সাংস্কৃতিক বিনিয়োগ এবং জনস্বার্থভিত্তিক চিন্তার ওপর।
হয়তো এই কারণেই পৃথিবীর অনেক দেশ এখন শুধু স্ক্রিন টাইম নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়; তারা ভবিষ্যতের নাগরিক নিয়ে ভাবছে। অস্ট্রেলিয়া শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের জন্য ন্যূনতম বয়সসীমা নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ডিজিটাল নিরাপত্তা ও মিডিয়া লিটারেসিকে শিক্ষার অংশ করছে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো বহুদিন ধরেই মাতৃভাষাভিত্তিক জ্ঞান, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং সৃজনশীল শিল্পে বিনিয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরছে। কারণ তারা বুঝতে শুরু করেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তথ্যই আর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ নয়। আমাদের বাবা-মায়েরা তথ্যের অভাবে বড় হয়েছেন। আমরা তথ্যের প্রাচুর্যে বড় হয়েছি। আমাদের সন্তানরা বড় হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। এআই কয়েক সেকেন্ডে একটি প্রবন্ধ লিখে দিতে পারে, ছবি বানাতে পারে, ভিডিও তৈরি করতে পারে। কিন্তু নতুন প্রশ্ন করার ক্ষমতা, নিজের সমাজের অভিজ্ঞতা থেকে নতুন গল্প নির্মাণের ক্ষমতা, কিংবা নিজের ভাষায় নতুন চিন্তা সৃষ্টি করার ক্ষমতা এখনো মানুষের। তাই আগামী দিনের প্রতিযোগিতা শুধু প্রযুক্তির নয়; প্রতিযোগিতা হবে সৃজনশীলতার। আর সেই সৃজনশীলতা তৈরি হয় পরিবারে, বিদ্যালয়ে, বইয়ে, নাটকে, সিনেমায়, গবেষণায় এবং প্রতিদিন আমরা যে সাংস্কৃতিক পরিবেশের ভেতর দিয়ে বড় হই, তার মধ্য দিয়ে।
হয়তো তাই, এই লেখার উদ্দেশ্য প্রযুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। প্রযুক্তি বদলাবে, প্ল্যাটফর্ম বদলাবে, অ্যালগরিদম বদলাবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আরও শক্তিশালী হবে। এই পরিবর্তন থামানোর কোনো সুযোগও নেই, প্রয়োজনও নেই। কিন্তু পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের উন্নয়ন-ভাবনাটাও কি বদলাচ্ছে? আমরা রাস্তা বানাই, সেতু বানাই, বিদ্যুৎকেন্দ্র বানাই, ইন্টারনেটের গতি বাড়াই—কারণ এগুলো উন্নয়নের অবকাঠামো। কিন্তু আগামী দিনের বাংলাদেশকে শুধু এসব অবকাঠামো দিয়ে বিচার করা যাবে না। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে, সে তার মানুষের চিন্তার পরিবেশ কতটা সমৃদ্ধ করতে পেরেছে, নিজের ভাষায় জ্ঞান ও সৃজনশীলতা তৈরির সুযোগ কতটা বাড়িয়েছে, আর নতুন প্রজন্মকে শুধু তথ্যের ভোক্তা নয়, নতুন ধারণার নির্মাতা হিসেবে গড়ে তুলতে কতটা বিনিয়োগ করেছে। হয়তো ভবিষ্যতে বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে যখন আমরা আবার কথা বলব, তখন মাথাপিছু আয়, রপ্তানি কিংবা অবকাঠামোর পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও করতে হবে—আমাদের সম্মিলিত মনোযোগের মান কেমন? কারণ একটি জাতির সম্মিলিত মনোযোগই শেষ পর্যন্ত তার কল্পনাশক্তিকে তৈরি করে। আর একটি জাতির কল্পনাশক্তিই নির্ধারণ করে তার ভবিষ্যৎ।
লেখক: চলচ্চিত্র নির্মাতা


