ঢাকায় বছরের পর বছর ধরে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে মিরপুরের বিহারি ক্যাম্পের ২ ও ৩ নম্বর ভবন। ফাটল ধরা দেয়াল, স্যাঁতসেঁতে মেঝে এবং নড়বড়ে কাঠামোর এই ভবনগুলোই আজও অসংখ্য পরিবারের একমাত্র আশ্রয়। প্রতিদিনই এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেই জীবন কাটছে বাসিন্দাদের। তাদের আশঙ্কা– ভবন দুটি দ্রুত মেরামত না করলে অথবা বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে না নিলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
অতিরিক্ত জনাকীর্ণ এসব ভবনে একটি মাত্র কক্ষে অনেক সময় ছয় থেকে ১০ জনকে একসঙ্গে থাকতে হয়। সেই একই ঘরে রান্না হয়, ঘুমানো হয়, আবার সেখানেই শিশুরা বই খুলে পড়তে বসে। অল্প জায়গায় এত মানুষের বসবাস এখানকার বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনকেই কঠিন করে তোলেনি; কেড়ে নিয়েছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও স্বস্তির সামান্য পরিসরটুকুও। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জীবন হয়ে উঠেছে আরও অনিরাপদ। পড়াশোনার জন্য আলাদা জায়গা না থাকায় শিশুদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হচ্ছে, আর নারীদের প্রতিটা দিন কাটাতে হচ্ছে গোপনীয়তার সংকটে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভবনগুলোর স্যাঁতসেঁতে ঘর, অপর্যাপ্ত পানি সরবরাহ, আশপাশের নালা-নর্দমা এবং দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থা। বৃষ্টির সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। জমে থাকা পয়ঃবর্জ্য ও আবর্জনা ছড়িয়ে পড়ে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুকিঁ তৈরি করে। এখানে বসবাসকারী পরিবারগুলোর জন্য প্রতিটি দিনই যেন প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতা করে বেঁচে থাকার লড়াই।
যে ভবনগুলোর ঘরের দেয়াল বেয়ে আর্দ্রতা নামে, সেখানেই শিশুরা ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে পড়াশোনা করে। যে ঘরে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা প্রায় বিলাসিতার মতো, সেখানেই নারীরা সংসার ও জীবনের প্রতিটি দায়িত্ব সামলে চলেন। আর বছরের পর বছর অবহেলায় ক্ষয়ে যাওয়া মেঝে ও কাঁপতে থাকা সিঁড়ি পেরিয়েই বয়স্কদের চলাচল করতে হয়।

এই বাস্তবতায় এখানকার বাসিন্দারা দুই ভবনের জরুরি প্রকৌশলগত মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন। সেই মূল্যায়নে ভবন দুটিকে অনিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত করা হলে কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে সেগুলো মেরামত করতে হবে। না হয় বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর বা দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে।
কারণ ফাটল ধরা এসব দেয়ালের আড়ালে শুধু পুরোনো ইট-পাথর আর ক্ষয়ে যাওয়া কাঠামো নেই। সেখানে রয়েছে অসংখ্য মানুষের জীবন—শিশুদের শৈশব, নারীদের নিরাপত্তা, বয়স্কদের শেষ বয়সের আশ্রয় এবং প্রতিটি পরিবারের বেঁচে থাকার গল্প।

দীর্ঘদিন ধরেই বিহারি ক্যাম্প অবহেলা ও বঞ্চনার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের প্রত্যাশায় এখানকার মানুষ দশকের পর দশক অপেক্ষা করে আসছেন। ২ ও ৩ নম্বর ভবনও যেন সেই দীর্ঘ অপেক্ষারই এক নির্মম বাস্তবতা।
যে পরিবারগুলো বছরের পর বছর ধরে এই ভবনগুলোকে নিজেদের ঘর বলে আঁকড়ে আছে, তাদের মনে এখন ভবনগুলো ধসে পড়বে কিনা সেই প্রশ্নই কেবল উঁকি দিচ্ছে না। তারা বরং এটাই ভাবছেন এগুলো ধসে পড়বে কখন?!

কারণ কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে, তাদের এই সম্ভাব্য বিপর্যয়ের ছায়াতেই বসবাস করে যেতে হবে। তাই দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে, দুর্ঘটনার আগেই মানুষকে নিরাপদ করা জরুরি। আর এখনই সেই পদক্ষেপ নেওয়ার সময়।


