দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে চার দিনের রিমান্ড দিয়েছে আদালত। এ মামলায় তার প্রথম স্ত্রী মোছা. মাকসুদাকে একদিনের রিমান্ড দেওয়া হয়েছে।
সোমবার দুপুরে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এহসানুল ইসলাম এ আদেশ দেন।
এদিন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী আদালতে রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। আসামিপক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মাহবুবুর রহমান।
এর আগে শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামসুদ্দোহা সরকার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রীর সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়,বেলা ৩টা ১১ মিনিটে পুলিশ গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামকে আদালতে হাজির করে। পরে তাদের পক্ষের আইনজীবীরা ওকালতনামায় সই করেন। সোয়া ৩টার দিকে বিচারক এজলাসে ওঠেন এবং আদালতের পরিস্থিতি শান্ত রাখার নির্দেশ দেন। ৩টা ১৬ মিনিটে শুনানি শুরু হয়। শুরুতেই বিচারক তদন্ত কর্মকর্তাকে মামলার অভিযোগ সম্পর্কে বলতে বলেন।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে ওবায়দুর রহমানকে প্রলোভন দেখিয়ে মরিয়মকে বিয়েতে বাধ্য করা হয়েছিল। পরে তাকে বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে এবং এ নিয়ে মামলাও হয়।
পিপি বলেন, গাজী নজরুল ন্যাম ভবনের বাসায় মরিয়মকে নিয়ে থাকতেন। একই বাসায় তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামও থাকতেন। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হাতে লেখা চিঠিতে মরিয়ম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কথা উল্লেখ করেছেন। আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা হলেও এর পেছনে হত্যার কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না, সেটি তদন্তসাপেক্ষ বিষয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। প্রকৃত সত্য উদঘাটনে আসামিদের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানান পিপি।
একপর্যায়ে পিপি গাজী নজরুলের রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রসঙ্গ তুলে ‘সৎ লোকের শাসন চাই’ বলে বক্তব্য দিতে গেলে বিচারক তাকে মামলার বাইরের কথা বলতে নিষেধ করেন। পরে মামলার বিষয়েই বক্তব্য দেওয়ার নির্দেশ দেন বিচারক।

অন্যদিকে গাজী নজরুল ইসলাম ও মাকসুদা ইসলামের পক্ষে আইনজীবী মো. মাহবুবুর রহমানসহ অন্যরা রিমান্ড বাতিল করে জামিনের আবেদন করেন। তারা আদালতে বলেন, রিমান্ডের কোনো যৌক্তিকতা নেই। গাজী নজরুল একজন মুক্তিযোদ্ধা ও চারবারের সংসদ সদস্য। মামলায় তাদের বিরুদ্ধে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মতো কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ উপস্থাপন করা হয়নি। দুজনই বয়স্ক এবং তারা তদন্তে সহযোগিতা করবেন। তাই রিমান্ড বাতিল করে জামিন দেওয়া হোক।
রিমান্ড আবেদনে পুলিশ পাঁচটি কারণ উল্লেখ করে। এতে বলা হয়, মরিয়ম গলায় ফাঁস দেওয়ার সময় আসামিরা বাসায় উপস্থিত ছিলেন। তার আত্মহত্যার পেছনে আসামিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্ররোচনা ছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এ ছাড়া মরিয়মকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা, উসকানি, মানসিক চাপ, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা অন্য কোনো উপায়ে আত্মহত্যায় সহায়তার ক্ষেত্রে আসামিদের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা উদঘাটন করা প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
মামলার পলাতক আসামি গাড়িচালক ওবায়দুল ইসলামের ভূমিকা সম্পর্কে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ, তার অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং ঘটনার সঙ্গে অন্য কোনো অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি বা আসামি জড়িত কি না, তা শনাক্ত করার কথাও বলা হয়। পাশাপাশি ঘটনার নেপথ্যে থাকা প্রকৃত সত্য ও মূল রহস্য উদঘাটনের জন্য তাদের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে পুলিশ।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, রোববার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে গাজী নজরুল ইসলাম ফোন করে মরিয়মের বাবাকে দ্রুত ন্যাম ভবনের বাসায় যেতে বলেন। পরে তিনি মরিয়মের খালা সুফিয়াকে সঙ্গে নিয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউসংলগ্ন ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটে যান। সেখানে গিয়ে তারা লোকজনের ভিড় দেখতে পান। মরিয়ম যে কক্ষে ছিলেন, সেটির দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। জানালা দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় মরিয়মকে ঝুলতে দেখা যায়।
পরে পুলিশ দরজা ভেঙে কক্ষে প্রবেশ করে। মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়।
রোববার রাতে নিহত মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে ওই মামলা করেন। এতে এমপি গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ও গাড়িচালক ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। মামলার পর গাজী নজরুল ও মাকসুদাকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। এ ঘটনায় ওবায়দুর রহমান পলাতক আছেন।
আরও পড়ুন>>>
দ্বিতীয় স্ত্রীর আত্মহত্যা: এমপি নজরুল ও প্রথম স্ত্রী গ্রেপ্তার
এমপি গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, তরুণীকে দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি


