বেসরকারি চাকরি বিধিমালা: অধিকারের সুরক্ষা নাকি সুবিধার কোপ?

বেসরকারি চাকরি বিধিমালা: অধিকারের সুরক্ষা নাকি সুবিধার কোপ?
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী দেলোয়ার হোসেন প্রতি ঈদে দুটি উৎসব ভাতা বা বোনাস পান, যা যোগ করলে তার এক মাসের মূল বেতনের চেয়েও বেশি হয়। এ ছাড়া পহেলা বৈশাখে পান নববর্ষের ভাতা।

তবে বেসরকারি কর্মচারীদের সুরক্ষায় সরকার যে নতুন খসড়া ‘মডেল সার্ভিস রেগুলেশনস’ বা  খসড়া ‘প্রমিত চাকরি বিধিমালা’ তৈরি করছে, তা বলবৎ হলে ভবিষ্যতে এসব বাড়তি সুবিধা কমে যেতে পারে।

প্রস্তাবিত খসড়ায় বলা হয়েছে, কর্মীরা বছরে সর্বোচ্চ দুটি বোনাস পাবেন। বোনাস দুটির মোট পরিমাণ কোনোভাবে এক মাসের মূল বেতনের বেশি হতে পারবে না।

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১৪২ শতাংশ বাড়ানোর পর বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য সুরক্ষার আশ্বাস দিয়েছিল সরকার। এমনকি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও বেসরকারি কর্মচারীদের জন্য নির্দিষ্ট চাকরি বিধিমালার প্রতিশ্রুতি ছিল।

নতুন এই বিধিমালার মূল উদ্দেশ্য হলো সকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য, এনজিও, ফার্ম, আইটি কোম্পানি, লজিস্টিকস, ট্রাভেল এজেন্সি, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও সমবায় সমিতিসহ সব ধরনের বেসরকারি সংস্থায় একটি অভিন্ন নিয়ম চালু করা।

তবে শ্রম অধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, কর্মচারীদের সুরক্ষা দেওয়ার বদলে কিছু নিয়ম তাদের বর্তমান সুবিধা আরও কমিয়ে দিতে পারে।

বিএনপির ইশতেহার প্রণয়নে যুক্ত সুশীল সমাজের এক সদস্য টাইমসকে বলেন, ‘বেসরকারি কর্মীদের জন্য এই সুবিধার প্রস্তাবটি আমিই দিয়েছিলাম। কিন্তু খসড়া দেখে আমি সত্যি হতাশ।’

বাংলাদেশে গার্মেন্টসসহ কয়েকটি নির্দিষ্ট খাত ছাড়া বেশিরভাগ বেসরকারি চাকরির জন্য কোনো নির্দিষ্ট জাতীয় বেতন কাঠামো বা স্কেল নেই।

দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘সরকার যদি সত্যিই আমাদের ভালো চায়, তবে সরকারি চাকুরিজীবীদের মতো একটা বেতন কাঠামো ঠিক করে দিক। তা না হলে কোনো লাভ হবে না।’

খসড়ায় বেতনের বিষয়টি মালিকদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে বলা হয়েছে, তাদের খাতের সর্বনিম্ন মজুরিকে ভিত্তি হিসেবে ধরতে হবে।

নতুন নিয়মে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৬০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করানোর সুযোগ রাখা হয়েছে, এর জন্য আলাদা ওভারটাইম ভাতাও দিতে হবে না।

আরও পড়ুন

সাধারণ কর্মঘণ্টা সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টাই থাকবে। তবে মালিক চাইলে তা ১২ ঘণ্টা বাড়াতে পারবেন। তবে, গড়ে বছরে সপ্তাহে ৫৬ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না এবং বছরে সর্বোচ্চ ২৬ সপ্তাহ এভাবে বাড়তি কাজ করানো যাবে।

এই বিষয়টি বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুসরণ করে করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ সুবাইল বিন আলম টাইমসকে বলেন, ‘বিভিন্ন আইনের কঠিন নিয়মগুলো এক জায়গায় জড়ো করা হয়েছে। এতে কর্মীদের কষ্ট আরও বাড়বে।’

তিনি জানান, এমনিতেই অনেক মালিক ‘আইনে লেখা নেই’ অজুহাত দেখিয়ে কর্মীদের প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত করেন।

তিনি আরও বলেন, ‘আমি একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কান্ট্রি ডিরেক্টর ছিলাম। ওভারটাইমের কথা বললে মালিকপক্ষ জানাত, আইনে এটার কথা স্পষ্ট করে বলা নেই।’

এক বড় শিল্প গোষ্ঠীর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এই বাড়তি কর্মঘণ্টা কর্মীদের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করবে।

তিনি বলেন, ‘আমার বাসা মোহাম্মদপুরে আর অফিস গুলশানে। আসা-যাওয়ায় ৩ ঘণ্টা রাস্তায় যায়। এরপর ১০ ঘণ্টা কাজ করলে দিনের ১৩ ঘণ্টা চলে যাবে অফিসে। মানুষ এভাবে টিকবে কীভাবে?’

খসড়ায় কর্মীদের ছুটির বিষয়ে বলা হয়েছে, তারা সপ্তাহে অন্তত ১ দিন সাপ্তাহিক ছুটি, বছরে ১৩ দিন উৎসব ছুটি, ১০ দিন নৈমিত্তিক (ক্যাজুয়াল) ছুটি এবং কমপক্ষে ১৪ দিন অসুস্থতাজনিত ছুটি পাবেন। ১ বছর চাকরির পর প্রতি ১৮ দিন কাজের বিনিময়ে ১ দিন করে অর্জিত ছুটি মিলবে। উৎসবের ছুটির দিনে কাজ করলে বিকল্প একদিন ছুটি এবং ২ দিনের মূল বেতন দেওয়া হবে। জমানো অর্জিত ছুটি অফিসের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৬০ দিন এবং কারখানার ক্ষেত্রে ৪০ দিন পর্যন্ত শেষে টাকায় রূপান্তর করা যাবে। নারী কর্মীরা গর্ভধারণের পর ৪ সপ্তাহের ছুটি এবং ৬ মাস চাকরি পূর্ণ হলে ১২০ দিনের মাতৃত্বকালীন ছুটি পাবেন। এ ছাড়া ৪০ জন বা তার বেশি নারী কর্মী থাকলে ৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ডে-কেয়ার বা শিশু যত্ন কেন্দ্র রাখতে হবে।

এ ছাড়া ১০০ জনের বেশি স্থায়ী কর্মী থাকা প্রতিষ্ঠানে প্রভিডেন্ট ফান্ড (ভবিষ্যৎ তহবিল) থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে সুবাইল বিন আলম মনে করেন, অনেক মালিক কর্মী সংখ্যা ১০০-এর নিচে দেখিয়ে এই নিয়ম এড়ানোর চেষ্টা করবেন।

পেনশনের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ কর্মী লিখিত আবেদন করলে প্রতিষ্ঠান সরকারি ‘প্রগতি’ পেনশন স্কিম চালু করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে প্রভিডেন্ট ফান্ড না রাখলেও চলবে। তবে মালিকের চাপের মুখে কর্মীরা স্বাধীনভাবে আবেদন করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

চাকরি ছেড়ে দেওয়া বা অবসরের ক্ষেত্রে টানা ৩ বছর চাকরির পর পদত্যাগ করলে প্রতি বছরের জন্য ৭ দিনের মূল বেতন পাবেন। ৩ থেকে ১০ বছর কাজ করলে প্রতি বছরের জন্য ১৫ দিনের মূল বেতন এবং ১০ বছরের বেশি হলে প্রতি বছরের জন্য ৩০ দিনের মূল বেতন অথবা গ্র্যাচুইটি, যেটি বেশি হয়, তা মিলবে। অন্যদিকে স্থায়ী কর্মীদের ১২০ দিন এবং অস্থায়ী কর্মীদের ৬০ দিন আগে নোটিশ দিয়ে চাকরিচ্যুত করা যাবে, নোটিশ না দিলে ওই মেয়াদের বেতন দিতে হবে। কোনো কর্মী অক্ষম হয়ে পড়লে বা ছাঁটাই হলে প্রতি বছরের জন্য ৩০ দিনের মূল বেতন বা গ্র্যাচুইটি পাবেন। অবসরের বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ বছর এবং অবসরেও সমান ক্ষতিপূরণ মিলবে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, শ্রম অধিদপ্তর, বিআইএম এবং ঢাকা চেম্বারের সহায়তায় এই নিয়ম তৈরি করছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মোস্তফা জামান টাইমসকে বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য কর্মচারীদের অধিকার রক্ষা করা।’

উদ্বেগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটি এখনো খসড়া পর্যায়ে আছে, চূড়ান্ত হয়নি। মালিকপক্ষ নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় চেষ্টা করবেই, তবে আমরা কর্মীদের অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করব।’

তবে সুবাইল বিন আলমের মতে, খসড়াটি একপেশে ও মালিকদের সুবিধার্থে তৈরি করা হয়েছে। এতে শ্রমিক প্রতিনিধি, এইচআর বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতামত নেওয়া উচিত।

খসড়ায় অন্যান্য নিয়মের মধ্যে রয়েছে–নিয়োগের সময় লিখিত নিয়োগপত্র দিতে হবে, শিক্ষানবিশকাল হবে ৬ মাস, চাকরি ছাড়ার পর কাউকে কালো তালিকাভুক্ত করা যাবে না এবং মাসের বেতন প্রথম ৭ কর্মদিবসের মধ্যে দিতে হবে। এ ছাড়া ১ বছর পরপর বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দিতে হবে এবং লিঙ্গ, ধর্ম বা প্রতিবন্ধীতার ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য করা যাবে না।

বিনা নোটিশে ১০ দিন অনুপস্থিত থাকাকে বড় অপরাধ বা অসদাচরণ হিসেবে ধরা হবে, যার জন্য চাকরি যেতে পারে। তদন্তের প্রয়োজনে অভিযুক্ত কর্মীকে সর্বোচ্চ ৬০ দিন বরখাস্ত রাখা যাবে। তবে পাওনা আদায়ের জন্য কোনো ক্ষয়ক্ষতি না করে আইনি আন্দোলন করলে তাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে না।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর