কানাডায় নাভানার সুমনের ১৩ বিলাসবহুল সম্পত্তি

কানাডায় নাভানার সুমনের ১৩ বিলাসবহুল সম্পত্তি
ছবি: গুগল ম্যাপ
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও বনেদি শিল্প পরিবার নাভানা গ্রুপ বিদেশে যে বিপুল অর্থ পাচার করেছে এর একাংশের সন্ধান মিলেছে কানাডায়। এই শিল্পগোষ্ঠীর সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম সুমনের নামে শুধু দেশটির বৃহত্তম নগরী টরন্টোতে পাওয়া গেছে ১৩টি বিলাসবহুল বাড়ি ও ফ্ল্যাট। এর মধ্যে ১২টি সম্পত্তির বর্তমান বাজারমূল্য নির্ধারণ করা গেছে, যেগুলোর দাম প্রায় ১৩১ কোটি টাকা।

এ ছাড়া টরন্টোসহ দেশটির একাধিক শহরে সুমন এবং তার পরিবারের অন্য সদস্যদের আরও বিপুল সম্পদ থাকার প্রাথমিক তথ্য মিলেছে। এসবের বাইরে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর ও এন্টিগুয়া এন্ড বারবুডাসহ একাধিক দেশে নাভানা পরিবারের সম্পত্তি ছড়িয়ে আছে।

টাইমস অব বাংলাদেশের অনুসন্ধান ও বিভিন্ন দেশের সরকারি নথিপত্র বিশ্লেষণে এসব বিদেশি সম্পদের তথ্য উঠে এসেছে।

ছবি: গুগল ম্যাপ

নথি বলছে, বছরের পর বছর ধরে অর্থ পাচারের মাধ্যমে বিদেশে এই বিশাল অবৈধ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন নাভানা পরিবারের সদস্যরা। তারা বিদেশে যখন সম্পদ গড়ছিল তখন দেশে তাদের ব্যাংকঋণগুলো খেলাপি হয়ে পড়ছিল। বর্তমানে শিল্পগোষ্ঠীটির কাছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাওনা রয়েছে প্রায় ৮ হাজার কোট টাকা।

নাভানা গ্রুপের শেকড় ১৯৬৪ সালে জহুরুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত ইসলাম গ্রুপে। জহুরুল ইসলামের মৃত্যুর পর তার ভাই শফিউল ইসলাম কামাল নাভানা গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন ইসলাম গ্রুপ থেকে বের হয়ে গিয়ে। শিল্পগোষ্ঠীটির চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন কামাল। আর তার বড় ছেলে সাইফুল ইসলাম সুমন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান, মেজো ছেলে সাজেদুল ইসলাম শুভ্র ভাইস চেয়ারম্যান এবং স্ত্রী খালেদা ইসলাম, ছোট ছেলে শাহেদুল ইসলাম ও কন্যা ফারহানা ইসলাম পরিচালক পদে রয়েছেন।

আরও পড়ুন: নাভানা দেশে ব্যাংক খালি করে বিদেশে গড়েছে গোপন সাম্রাজ্য

২০১৮ সালে কামাল অসুস্থ হয়ে পড়ার পর থেকে সুমন ও শুভ্র মিলে নাভানার সব ব্যবসা দেখাশোনা করছেন। বড় ছেলে সুমন ও ছোট ছেলে শাহেদুল দীর্ঘদিন ধরে কানাডায় অবস্থান করছেন।

সরকারি ভূমি রেকর্ড অনুযায়ী, সাইফুল ইসলাম সুমনের শনাক্ত হওয়া সম্পত্তিগুলো টরন্টো শহরের স্কারবরো, নর্থ ইয়র্ক ও মূল টরন্টো এবং গ্রেটার টরন্টো এরিয়ার (জিটিএ) মিসিসাগা ও ব্র্যাম্পটনে অবস্থিত। তার পোর্টফোলিওতে রয়েছে বিলাসবহুল ম্যানশন, আবাসিক বাড়ি, টাউনহাউস, কন্ডোমিনিয়াম এবং একটি আবাসিক-বাণিজ্যিক ইউনিট।

ছবি: গুগল ম্যাপ

এসব সম্পত্তির মূল্য হিসাব করা হয়েছে এগুলোর সর্বশেষ ক্রয়-বিক্রয়ের নথি এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার একই ধরনের সম্পত্তির সাম্প্রতিক বাজারদর বিশ্লেষণের ভিত্তিতে।

সাইফুল ইসলাম সুমনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পত্তিটি টরন্টোর স্কারবরোর ১২৫ ইউক্লিড অ্যাভিনিউতে। ছয় হাজার বর্গফুটের বেশি আয়তনের কাস্টম-বিল্ট বা ক্রেতার পছন্দে নির্মিত বাড়িটির সর্বশেষ বাজারমূল্য প্রায় ২৯ লাখ কানাডিয়ান ডলার, যা বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ২৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

আরও পড়ুন

এ ছাড়া মিসিসাগার অভিজাত লর্ন পার্ক এলাকায় অবস্থিত ১২৭০ বার্চভিউ ড্রাইভের বাড়িটির বাজারমূল্য ১৮ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২৩ কোটি টাকার মধ্যে। টরন্টোর কাসা লোমা এলাকার ৩৯০ ওয়ালমার রোডের বাড়িটির বর্তমান মূল্য প্রায় ১৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ডাউনটাউন টরন্টোর বিলাসবহুল বহুতল ‘মিলান কন্ডোস’-এ তার নামে একটি আবাসিক ইউনিট রয়েছে যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৭ কোটি টাকা।

টরন্টোর ১৪২ ক্লিনসাইড রোডে সুমনের তিনতলা একটি টাউনহাউস রয়েছে, যার বাজারমূল্য ৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা। স্কারবরোর ৩৩০ ম্যাককাওয়ান রোডে তার একটি কনডোমিনিয়াম অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

টরন্টোর ৭ ভিভিয়ান রোডে সুমনের একটি কনডোমিনিয়াম টাউনহাউস রয়েছে। এর মূল্য ৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা। নর্থ ইয়র্কের ১৪৪৫ উইলসন অ্যাভিনিউয়ে তার আরেকটি কনডোমিনিয়াম অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে, যেটির মূল্য প্রায় ৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা।

ছবি: গুগল ম্যাপ

স্কারবরোর ৩৭ ম্যাকডোনাল্ড অ্যাভিনিউয়ে প্রায় ১০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা মূল্যের একটি ডিটাচড বাড়ি রয়েছে সুমনের। একই এলাকার ২১ রকউড ড্রাইভে রয়েছে প্রায় প্রায় ৬ কোটি ৫১ লাখ টাকা মূল্যের একটি কনডোমিনিয়াম টাউনহাউস।

নর্থ ইয়র্কের ১৩৪৪ লরেন্স অ্যাভিনিউ ওয়েস্টে সুমনের একটি ফ্রিহোল্ড সেমি-ডিটাচড বাড়ি রয়েছে। এর মূল্য প্রায় ৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা।

এ ছাড়া ব্র্যাম্পটনের ১০৬ বার ক্রিসেন্টে তার একটি ডিটাচড ফ্রিহোল্ড বাড়ি রয়েছে, যেটির মূল্য প্রায় ১০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দাদের ধারনা, কানাডায় সুমনের স্ত্রী তাজিনা এইচ ইসলাম ও ছোট ভাই শাহেদুল ইসলামের নামে সম্পদ রয়েছে। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের আল সাতওয়ায় অবস্থিত জুমেরাহ গার্ডেন সিটিসহ একাধিক অভিজাত এলাকায় নাভানা পরিবারের সম্পদ রয়েছে।

এই পরিবারের বিদেশে থাকা সম্পদের পূর্ণ বিবরণ পেতে বিভিন্ন দেশে চিঠি পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।

ছবি: গুগল ম্যাপ

নাভানা পরিবারের বিদেশি আর্থিক সাম্রাজ্য প্রকাশ্যে আসে টাইমস অব বাংলাদেশের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে। এই সংবাদের প্রেক্ষিতে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করে বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বিএফআইইউ।

এই সংবাদপত্রটির কাছে থাকা নথিপত্রে দেখা গেছে, ২০০৭ সালের আগে থেকেই সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে বিপুল অর্থ জমিয়েছে নাভানা পরিবার। এমনকি তারা সিঙ্গাপুরের একাউন্ট থেকে আন্তর্জাতিক হেজ ফান্ডেও বিনিয়োগ করেছেন। এর বাইরে সাইফুল ইসলাম ও সাজেদুল ইসলাম বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগের বিনিময়ে এন্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডার নাগরকিত্ব গ্রহণ করেছেন।

টাইমসের ওই অনুসন্ধানে তাদের অনুমোদনহীন একাধিক আন্তর্জাতিক লেনদেনের চিত্র উঠে এসেছে। অথচ বিদেশে তাদের এমন কোনো আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন নেই বলে নিশ্চিত করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক।

ছবি: গুগল ম্যাপ

অর্থ পাচার ও কানাডায় ব্যবসা সম্প্রসারণের অভিযোগে ২০২০ সালে সুমনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে কয়েক মাসের মধ্যেই সেই অনুসন্ধান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায়। উল্টো খেলাপি ঋণে বিপর্যস্ত নাভানা গ্রুপকে নতুন করে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণ দিতে ২০২০ সালের আগস্টে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয় এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় আয়োজনে ৫০০ কোটি টাকার নতুন ঋণ দেওয়া হয়েছিল।

কানাডায় থাকা সম্পত্তির বিষয়ে সাইফুল ইসলাম সুমনের মন্তব্য জানার চেষ্টা করে টাইমস। তবে এই প্রতিবেদকের ফোন নম্বর তিনি ব্লক করে রাখায় মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad