চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে টানা ভারী বৃষ্টি ও বন্যায় কৃষিতে নেমে এসেছে বড় ধাক্কা। দুই জেলায় ১৮ হাজার ৮১৬ দশমিক ৬৬ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৮৮ হাজার ৫৩৯ টন ফসল নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১ লাখ ৬৯ হাজার ৭২১টি কৃষক পরিবার। কৃষি খাতে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০৯ কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ক্ষয়ক্ষতির বড় অংশ হয়েছে চট্টগ্রাম জেলায়। এখানে ১৬ হাজার ২৫ দশমিক ৬৬ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে কক্সবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ হাজার ৭৯১ হেক্টর জমির ফসল।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে শাকসবজি ও আউশ ধানের আবাদে। দুই জেলায় ৯ হাজার ২০৮ হেক্টর জমির শাকসবজি নষ্ট হয়ে উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে ৫৬ হাজার ৭৩০ টন। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪০ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এই খাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৭৩ হাজার ৮৭৫টি কৃষক পরিবার।
এ ছাড়া, আউশ ধানের ৩০ হাজার ৭৪১ টন উৎপাদন নষ্ট হয়েছে। এতে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা। আউশ ধানের ক্ষতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৫৮ হাজার ২৫০টি কৃষক পরিবার। এর বাইরে আমন বীজতলা, আদা, হলুদ, পানসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসলেরও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে।
চট্টগ্রামে ক্ষতি সবচেয়ে বেশি
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্রীষ্মকালীন সবজির আবাদ। জেলার ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টর জমির সবজি নষ্ট হয়ে উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে ৪৩ হাজার ৫০ টন। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৮৬ কোটি ১০ লাখ টাকা।
এ ছাড়া, ৯৬০ দশমিক ৬৬ হেক্টর আমন বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ৪ কোটি ৩২ লাখ ৩০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। ৫২০ টন আদা নষ্ট হয়ে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। হলুদের ১১৮ দশমিক ৩৬ টন উৎপাদন নষ্ট হওয়ায় ক্ষতি হয়েছে ৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। ৭৮ হেক্টর পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রায় ৬০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক এলাকায় বন্যার পানি নেমে গেলেও কৃষকদের দুর্ভোগ শেষ হয়নি। কোথাও বীজতলা নষ্ট হয়েছে, কোথাও জমিতে জমে থাকা পানি ও পলি নতুন করে চাষাবাদের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে পরবর্তী মৌসুমের আবাদ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
কক্সবাজারেও ব্যাপক ক্ষতি
কক্সবাজার জেলায় ২ হাজার ৭৯১ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ১৯ হাজার ৩১১ দশমিক ৩০ টন উৎপাদন নষ্ট হয়েছে। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৮৬ কোটি ৬১ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৪৩ হাজার ২১০টি কৃষক পরিবার।
জেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে শাকসবজিতে। ৬৮৪ হেক্টর জমির সবজি নষ্ট হয়ে ১৩ হাজার ৮৮০ টন উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৫৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা।
এ ছাড়া, ১ হাজার ৭৯৭ হেক্টর জমির আউশ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ৫ হাজার ২১১ দশমিক ৩০ টন উৎপাদন নষ্ট হয়েছে। এতে কৃষকদের ক্ষতি হয়েছে ২৩ কোটি ৪৫ লাখ ৯ হাজার টাকা।
জেলার ৪২ হেক্টর পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ৪২০ টন উৎপাদন নষ্ট হয়েছে। এতে ক্ষতি হয়েছে ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ২৬৮ হেক্টর আমন বীজতলার ক্ষতিতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ২ কোটি ১৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা। ফলে নতুন করে বীজতলা তৈরির চাপ পড়েছে কৃষকদের ওপর। এ ছাড়া মরিচ, কলা, পেঁপে, পেঁয়াজ, ভুট্টা ও চিনাবাদামসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসলও বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, টানা বৃষ্টিপাত ও বন্যায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বেশ কয়েকটি উপজেলা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি খাতে প্রায় ৩০৯ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
তিনি জানান, বিভাগের তিন পার্বত্য জেলাসহ অন্যান্য জেলার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও তালিকা করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রণোদনাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হবে। একই সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছেন।


