২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এবারই প্রথম স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১.০১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা বিগত অর্থবছরে ছিল ০.৫৮ শতাংশ। একইসাথে জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের অংশ ৫.৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭.৪ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রথম বাজেটেই স্বাস্থ্য খাতকে বিশেষভাবে অগ্রাধিকার প্রদান করায় সরকারকে ধন্যবাদ।
স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন এবং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে এই খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। দীর্ঘদিন ধরেই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ এবং উন্নয়ন সহযোগীরা এ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসছেন। কারণ স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ শুধু মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করে না; এটি দারিদ্র্য হ্রাস করে, মানবসম্পদ উন্নয়ন করে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও ত্বরান্বিত করে।
তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। এই অর্থ এমন খাতে বিনিয়োগ করতে হবে, যেখানে এর প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। তাই স্বাস্থ্য বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেশের বর্তমান রোগ পরিস্থিতিকেই গুরুত্ব দিতে হবে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের রোগ-ব্যাধির ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। সংক্রামক রোগের তুলনায় অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বেড়েছে ক্রমবর্ধমান হারে। বর্তমানে দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশের জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার ও দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ। অথচ এসব রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করা হয় স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ৪.২ শতাংশ অর্থাৎ, যেখানে প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, সেখানে বিনিয়োগ এখনো অত্যন্ত অপ্রতুল।
অসংক্রামক রোগের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে- ২০২৫’ এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে শীর্ষ ১০টি রোগের তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ। এটি হৃদরোগ, স্ট্রোক ও কিডনি রোগের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে উচ্চ রক্তচাপ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে অসংক্রামক রোগের সামগ্রিক বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
উচ্চ রক্তচাপের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, এটি বেশিরভাগে ক্ষেত্রেই কোনো লক্ষণ ছাড়াই দীর্ঘদিন শরীরে থেকে যায়। ফলে বড় ধরনের কোনো শারীরিক জটিলতা দেখা দেওয়ার আগে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেও টের পান না যে তিনি কতটা ঝুঁকিতে আছেন। একারণে এটাকে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়ে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত প্রায় অর্ধেক মানুষই জানেন না যে তাদের এই রোগ রয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে মাত্র ৩৯ শতাংশ চিকিৎসা নেন এবং মাত্র ১৬ শতাংশ এটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছেন। সাধারণভাবে অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, তামাক ও অ্যালকোহল সেবন, শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা, অতিরিক্ত ওজন ও মানসিক চাপ প্রভৃতি উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে থাকে এবং এগুলো প্রতিরোধযোগ্য। কাজেই চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু সমস্যার ব্যাপকতার তুলনায় এ খাতে বিনিয়োগ এখনো অপর্যাপ্ত। বর্তমানে বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে মাথাপিছু বছরে মাত্র ০.০৮ ডলার ব্যয় করা হয়, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সুপারিশকৃত বরাদ্দ ১.৫ ডলার এর চেয়ে অনেক কম। অন্যদিকে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশই মানুষকে ব্যক্তিগত বা নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয়। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হয় এমন রোগের ক্ষেত্রে এটি অনেক পরিবারের জন্য বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে অনেকেই সময়মতো চিকিৎসা নিতে পারেন না, আবার অনেকের চিকিৎসা মাঝপথেই বন্ধ হয়ে যায়- যা স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে অসংক্রামক রোগে অকালমৃত্যু এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনার এসডিজি লক্ষ্য অর্জনের অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত ও টেকসই বিনিয়োগ। আর সেই বিনিয়োগের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ। উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে টেকসই অর্থায়নের পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা, তামাক নিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকার, স্বাস্থ্যখাত ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। পাশাপাশি দেশব্যাপী তৃণমূল পর্যায়ের সকল স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের নিয়মিত প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ওষুধের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, নিয়মিত ফলো-আপ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে উচ্চ রক্তচাপ শনাক্তের সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করতে হবে। এসব উদ্যোগ শুধু উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেই নয় , অসংক্রামক রোগের সামগ্রিক বোঝা কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষা ও চিকিৎসা জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে ব্যয়-সাশ্রয়ী উদ্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম। অসংক্রামক রোগ মোকাবেলায় উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষা ও ওষুধের পিছনে ১ টাকা ব্যয় করলে সামগ্রিককভাবে ১৮ টাকার সুফল পাওয়া যায়। কারণ এর মাধ্যমে চিকিৎসা ব্যয় কমে, মানুষের কর্মক্ষমতা বাড়ে এবং হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগসহ ব্যয়বহুল জটিলতা প্রতিরোধ করা যায়। ফলে এটি শুধু মানুষের জীবনই রক্ষা করে না, পরিবার ও রাষ্ট্র, উভয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপও কমায়।
কাজেই বাজেটের সুফল শুধু বরাদ্দের পরিমাণ দিয়ে পরিমাপ করলে হবে না, এটি কতটা কার্যকরভাবে মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় করা হয়েছে এবং এতে সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কতটা উন্নতি হয়েছে সেটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ যদি ২০৩০ সালের মধ্যে অসংক্রামক রোগজনিত অকালমৃত্যু কমানোর এসডিজি লক্ষ্য অর্জন করতে চায়, তবে উচ্চ রক্তচাপসহ অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে বিনিয়োগ বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ দেশের রোগ পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ স্বাস্থ্য বিনিয়োগই পারে মানুষের জীবন রক্ষা করতে, চিকিৎসা ব্যয় কমাতে এবং একটি সুস্থ, উৎপাদনশীল ও সমৃদ্ধশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।
লেখক: সামিহা বিনতে কামাল, প্রোগ্রাম অফিসার, প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান); ডা. আবু জামিল ফয়সাল, জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনির্ভাসিটি


