এর আগে কখনো এমন কোনো বিশ্বকাপ দেখা যায়নি। দলের সংখ্যা ৪৮টি কিংবা তিনটি আয়োজক দেশ অথবা ১০৪টি ম্যাচের কারণে এটি বলা হচ্ছে না। বরং এই বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া ফুটবলারদের মুখের বলিরেখায় যে বয়সের ছাপ লুকিয়ে আছে, তার কারণে এটি অনন্য।
আগামী ১১ জুন যখন উত্তর আমেরিকায় ২০২৬ সালের আসরের পর্দা উঠবে, তখন এটি বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি প্রবীণদের বিশ্বকাপ হিসেবে যাত্রা শুরু করবে। এর আগের কোনো আসরই খেলোয়াড়দের বয়সের দিক থেকে এই আসরের কাছাকাছিও আসতে পারেনি।
কেবল মূল পরিসংখ্যানটির দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে ৪০ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সী আটজন খেলোয়াড় অংশ নেবেন। বিশ্বকাপের একটি একক আসরে এত বেশি সংখ্যক প্রবীণ ফুটবলারের খেলার নজির আর নেই। এই সংখ্যাটিকে যা সবচেয়ে বেশি চমকপ্রদ করে তুলেছে তা হলো এর পেছনের প্রেক্ষাপট। এর আগের ২২টি বিশ্বকাপ আসর মিলিয়ে সর্বমোট মাত্র আটজন খেলোয়াড় ছিলেন যাদের বয়স ছিল কমপক্ষে ৪০ বছর। অথচ এবারের এই একটি মাত্র আসরই পূর্বের সেই সবকটি আসরের সম্মিলিত রেকর্ডকে ছুঁয়ে ফেলছে।
এই অসাধারণ দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্কটল্যান্ডের ক্রেইগ গর্ডন। টুর্নামেন্ট চলাকালীন এই গোলরক্ষকের বয়স হবে ৪৩ বছর, যা তাকে এই আসরের সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে। তিনি যদি কোনো ম্যাচে মাঠে নামেন, তবে তিনি হবেন বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বয়সী খেলোয়াড়। তার সামনে থাকবেন কেবল মিশরের এসাম আল হাদারি, যিনি ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে ৪৫ বছর বয়সে খেলেছিলেন। গর্ডনের এই গল্পটির একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তিনি ২০০৪ সাল থেকে স্কটল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তিনি এমন এক দীর্ঘ সময় পার করেছেন যখন বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করা স্কটল্যান্ডের জন্য একটি অসম্ভব স্বপ্ন ছিল। অবশেষে ফুটবলাররা সাধারণত যে বয়সে অবসরে যাওয়ার পর প্রায় এক দশক পার করে দেন, সেই বয়সে এসে তিনি ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে দাঁড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন।
বয়সের দিক থেকে তার ঠিক পেছনে রয়েছে এমন কিছু নাম, যা দেখলে মনে হবে এটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ক্যারিয়ারের ফুটবলারদের বিদায়ী সফর। ৪১ বছর বয়সী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এই টুর্নামেন্টে গোলরক্ষক ছাড়া মাঠের অন্য পজিশনের সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড়। তিনি ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার অনন্য কীর্তি গড়তে যাচ্ছেন।
মেক্সিকোর গুইলারমো ওচোয়ার বয়স এখন ৪০ বছর। তিনিও তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে রোনালদোর সবচেয়ে বেশি আসরে খেলার রেকর্ডে ভাগ বসাচ্ছেন। লুকা মদ্রিচের বয়সও ৪০ বছর। তিনি ক্রোয়েশিয়ার মাঝমাঠ এমনভাবে সামলাবেন যেন বয়স তাকে স্পর্শই করতে পারেনি। ম্যানুয়েল নয়্যার ৪০ বছর বয়সে জার্মানি দলে ফিরে এসেছেন, অথচ এক সময় মনে হয়েছিল তিনি জাতীয় দলকে চিরতরে বিদায় জানিয়েছেন। এডিন জেকো ৪০ বছর বয়সেও বসনিয়া-হার্জেগোভিনার আক্রমণভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কেপ ভার্দের ভোজিনহাও ঠিক ৪০ বছর বয়সে এই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন।
বিশ্বকাপের পাঁচটি দলে একই সঙ্গে একজন ৪০ বছরের বেশি বয়সী খেলোয়াড় এবং একজন কিশোর ফুটবলার স্থান পেয়েছেন। মেক্সিকোর পাশাপাশি জার্মানি, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, ক্রোয়েশিয়া এবং স্কটল্যান্ড দলে এই চিত্র দেখা গেছে। ক্রীড়া জগতের সর্বোচ্চ স্তরে একই দলের ভেতর খেলোয়াড়দের বয়সের এত বড় ব্যবধান সত্যিই কল্পনাতীত।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপের খেলোয়াড়দের সম্ভাব্য গড় বয়স ধরা হয়েছে ২৭ দশমিক ১২ বছর। এটি আগের আসরগুলোর তুলনায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন। ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের ৩২ দলের বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের গড় বয়স ছিল ২৬ দশমিক ৯ থেকে ২৭ দশমিক ১ বছরের কাছাকাছি।
সংখ্যার দিক থেকে এই পরিবর্তন খুব বড় মনে না হলেও, এই সংখ্যার পেছনের গঠন পুরোপুরি আলাদা। আগের টুর্নামেন্টগুলোতে ৪০ বছর বয়সী একজন খেলোয়াড়ের উপস্থিতিই বিস্ময়কর বলে মনে করা হতো। আর এবার এখানে একসঙ্গে আটজন রয়েছেন। বয়সের গ্রাফটি কেবল সামান্যই বদলায়নি, বরং এর সর্বোচ্চ সীমা অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে।
কিন্তু কেন এমনটি ঘটছে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে গত এক দশকে আধুনিক ফুটবলের আমূল বদলে যাওয়ার কয়েকটি কারণের মধ্যে। আধুনিক ক্রীড়া বিজ্ঞান খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ারের সেরা সময়কে এতটাই দীর্ঘায়িত করেছে যা এক প্রজন্ম আগেও অসম্ভব বলে মনে হতো। জিপিএস ট্র্যাকিং, শারীরিক চাপের সঠিক ব্যবস্থাপনা, ক্রায়োথেরাপি এবং অত্যন্ত পরিকল্পিত পুষ্টি তালিকার কারণে বর্তমান যুগের একজন ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষকের শারীরিক সক্ষমতা বিশ বছর আগের একজন ৩৫ বছর বয়সী খেলোয়াড়ের কাছাকাছি থাকে। মাঠের অন্যান্য পজিশনের তুলনায় গোলরক্ষকের পজিশনটি বয়সের ছাপ কাটিয়ে ওঠার জন্য কিছুটা সহজ। একজন খেলোয়াড়ের গতি বা পেশীর ক্ষিপ্রতা যেভাবে কমে যায়, সে তুলনায় চোখের পলকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বা মাঠের অবস্থান বোঝার বুদ্ধি ততটা লোপ পায় না। আর এই কারণেই এই আসরের চল্লিশোর্ধ্ব আটজন খেলোয়াড়ের মধ্যে পাঁচজনই গোলরক্ষক।
এর পেছনে একটি মানসিক দিকও রয়েছে যা কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে পুরোপুরি বোঝানো সম্ভব নয়। যে খেলোয়াড়রা ৩০-এর কোঠার শেষের দিকেও শীর্ষ স্তরে খেলে যাচ্ছেন, তারা সাধারণত কঠোর নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলার মাধ্যমেই তা অর্জন করেছেন। তারা ঠিকমতো ঘুমান, মেপে খাবার খান, বুদ্ধিদীপ্ত উপায়ে অনুশীলন করেন এবং নিজেদের শরীরকে ক্ষণস্থায়ী উপায়ের বদলে দীর্ঘমেয়াদী সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেন।
রোনালদোর ফুটবল নিয়ে তীব্র মগ্নতা ও পেশাদারিত্বের কথা সবারই জানা। অন্যদিকে গর্ডন মারাত্মক চোট, দুই বছর ক্লাবহীন থাকা এবং দীর্ঘ সময় জাতীয় দলের বাইরে থাকার ধকল কাটিয়ে ৪৩ বছর বয়সে এই বিশ্বকাপে এসেছেন। এগুলো কেবল বংশগত কারণে ঘটেনি, বরং কয়েক দশক ধরে প্রতিদিনের সঠিক সিদ্ধান্তের ফল এটি।
এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে প্রবীণ এবং নবীন খেলোয়াড়ের বয়সের ব্যবধান বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ৪৩ বছর ১৬২ দিন বয়সী ক্রেইগ গর্ডন এবং মেক্সিকোর ১৭ বছর ২৪০ দিন বয়সী গিলবার্তো মোরার বয়সের ব্যবধান ২৫ বছরেরও বেশি। ২০০৮ সালে জন্ম নেওয়া কিশোর মোরা মাত্র ১৫ বছর বয়সে মেক্সিকান লিগে বয়সের রেকর্ড ভেঙেছিলেন। ভোট দেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই মেক্সিকোর মূল জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
পেলে এবং স্যামুয়েল ইতোর মতো তারকাদের তালিকায় নাম লিখিয়ে মোরা বিশ্বকাপের ইতিহাসে মাত্র পঞ্চম ১৭ বছর বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামবেন। ২৫ বছর ২৮৭ দিনের ব্যবধান থাকা দুজন খেলোয়াড় একই টুর্নামেন্ট, একই মাঠ, এমনকি সম্ভবত একই ম্যাচে একে অপরের মুখোমুখি হতে পারেন–এটিই এই প্রতিযোগিতার অন্যতম একটি নীরব অথচ অসাধারণ বাস্তব ঘটনা।
ইতিহাসের পাতায় প্রবীণ খেলোয়াড়দের উপস্থিতির দিক থেকে এর সবচেয়ে কাছাকাছি তুলনা হতে পারে ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ। সেবার কলম্বিয়ার মন্ড্রাগন ৪৩ বছর ৩ দিন বয়সে মাঠে নেমে সাময়িকভাবে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড় হয়েছিলেন। তবে সেই গৌরব অর্জনে তিনি একাই ছিলেন। ২০২৬ সালে গর্ডন হয়তো তার সেই অনন্য উচ্চতায় যোগ দেবেন, কিন্তু এবার তিনি একা নন, একই টুর্নামেন্টে তার কাছাকাছি বয়সের আরও বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় মাঠ মাতাবেন।


