ডাকসুর এবি জুবায়েরের থাবা ক্যাম্পাসের বাইরেও

ডাকসুর এবি জুবায়েরের থাবা ক্যাম্পাসের বাইরেও
কার্টুন: টাইমস
Advertisement
Advertisement

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরেও নানা ঘটনায় জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি ক্যাম্পাস থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরের পরীবাগ এলাকায় গভীর রাতে গিয়ে এক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন তিনি। তবে টাইমস অব বাংলাদেশের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ক্যাম্পাসের বাইরে গিয়ে হুমকি-ধমকি ও মারধরের অভিযোগ এর আগেও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকার এক ব্যবসায়ী টাইমসকে অভিযোগ করেন, জুবায়ের তাকে হুমকি দিয়ে গ্রামে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন এবং বলেন, শাহবাগ, নিউ মার্কেট ও আজিমপুর তার এলাকা।

ডাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সমাজসেবা সম্পাদকের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন সমাজসেবামূলক ও কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা। এসব দায়িত্ব মূলত মানবিক, সম্প্রীতিমূলক ও সহানুভূতিশীল কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তবে গত নয় মাসে মানবিক কর্মকাণ্ডের চেয়ে মারধর, শিক্ষক হেনস্তা, ট্রান্সজেন্ডারদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকবিরোধী অভিযানের মতো এখতিয়ারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে বেশি আলোচনায় এসেছে জুবায়েরের নাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মো. ইসরাফিল প্রাং টাইমসকে বলেন, ‘আমরা যে পদে থাকি না কেন, সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রদর্শনের চেষ্টা করা ঠিক নয়। সেটা যে দলের হোক বা যে ব্যক্তির হোক, তা অন্যায়।’

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় কোনো ধরনের অভিযান পরিচালনা ডাকসুর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এসব প্রশাসন ও পুলিশের দায়িত্ব। আর বাইরের কোনো ঘটনায় ক্যাম্পাসে বিরূপ প্রভাব পড়লে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়।’

অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অভিযানের পক্ষে যুক্তি দিয়ে জুবায়ের টাইমসকে বলেন, ‘উদ্যানটি আমাদের ক্যাম্পাসসংলগ্ন। সেখানে কোনো অপরাধ ঘটলে সেটি ক্যাম্পাসের পরিবেশেও প্রভাব ফেলে। শারিক ও হাশাম হত্যাকাণ্ড তার প্রমাণ। তাই উদ্যানের পরিবেশ শান্ত রাখাকে নৈতিক দায়িত্ব মনে করি।’

তিনি আরও দাবি করেন, প্রশাসন সেখানে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করত। ‘তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, প্রক্টর টিম ও পরে ডাকসুর সঙ্গে সমন্বয় করত। আমি সেখানে সমন্বয়কারী হিসেবে সহায়তা করেছি।’

ব্যবসায়ীকে মারধর করে ঢাকা ছাড়ার পরামর্শ

ঘটনাটি চলতি বছরের জানুয়ারির মাঝামাঝি। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সায়েন্স ল্যাব এলাকার কম্পিউটার সিটি মার্কেটে ৪০ বছরের ঊর্ধ্ব এক ব্যক্তিকে থাপ্পড় মারছেন জুবায়ের।

ওই ব্যক্তির নাম সাইফুল ইসলাম। তিনি সিটি সুপার মার্কেটের একজন কম্পিউটার ব্যবসায়ী।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সাইফুল টাইমসকে জানান, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) সামনে হাঁটার সময় এক নারীকে তার সাবেক স্ত্রীর মতো মনে হওয়ায় তিনি রিকশা থামিয়ে কথা বলতে চান। এতে ওই নারী ভয় পেয়ে দৌড়ে সায়েন্স ল্যাবের ফটকে গিয়ে পরিচিতদের ডাকেন।

পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী তার মোবাইল ফোন পরীক্ষা করেন। তাদের একজন বলেন, ‘আপনি যদি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর লোক হন, তাহলে আপনাকে ধরা হবে, আর না হলে ছেড়ে দেওয়া হবে।’ পরীক্ষা শেষে তারা তাকে ছেড়ে দেন।

ওই নারী ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদে (জকসু) ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেল থেকে নির্বাচিত আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক নওশীন নাওয়ার জয়া। তিনি ডাকসুর জুবায়েরকে ঘটনাস্থলে ডাকেন।

আরও পড়ুন

সাইফুলের ভাষ্য, জুবায়ের ও তার সঙ্গীরা কোনো কথা না বলে তাকে মারধর শুরু করেন। পরে পুলিশ এসে তাকে আটক করে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠায়। ম্যাজিস্ট্রেট তার বক্তব্য শোনার পর সেদিন ছেড়ে দেন।

তার দাবি, জুবায়ের তাকে বলেন, ‘শাহবাগ থেকে নিউমার্কেট ও আজিমপুর এলাকা আমার। তোরে যেন না দেখি। তুই গ্রামে চলে যা।’

অন্যদিকে জকসু নেত্রী জয়ার ভাষ্য, ওই ব্যক্তি হঠাৎ এসে তার সঙ্গে একই রিকশায় ওঠার আবদার করেন। নিরাপত্তাহীনতায় তিনি রিকশা থেকে নেমে সায়েন্স ল্যাবের দিকে দৌড়ে যান।

তার ভাষ্য, সাইফুল সেখানে গিয়েও তাকে ‘সাবিহা’ বলে ডাকতে থাকেন এবং পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার জন্য বারবার মাস্ক খুলতে বলেন। এরপর তিনি জুবায়েরসহ অন্যদের খবর দেন।

জয়া স্বীকার করেন, জুবায়ের ওই ব্যক্তিকে মারধর করেছিলেন।

তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিটি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না দিয়ে কথা ঘোরাতে থাকলে জুবায়ের উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং এই পরিস্থিতিতে তাকে চড় মারেন।’

ব্যবসায়ীকে থাপ্পড় দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন জুবায়েরও। তবে তার দাবি, ওই ব্যক্তি জকসু নেত্রীর হিজাব টেনে খুলে দিয়েছিলেন এবং জিজ্ঞাসাবাদের সময় অসংলগ্ন কথা বলছিলেন।

তিনি বলেন, ‘একপর্যায়ে তাকে থানায় নিতে গিয়ে আমি একটি থাপ্পড় মারি। পরে তাকে থানায় হস্তান্তর করা হয়।’

শিক্ষক হেনস্তা

গত বছরের অক্টোবরে ক্যাম্পাসে হকার, ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা, মাদকসেবী ও ভবঘুরে উচ্ছেদের নামে জুবায়েরের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে এক শিক্ষকের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, যা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর। সেদিন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক একেএম জামাল উদ্দিনকে একটি অনুষদ ভবনের ভেতরে ধাওয়া করে সিঁড়িতে জাপটে ধরেন জুবায়ের।

অধ্যাপক জামাল নিজেকে ছাড়িয়ে গাড়িতে উঠে পড়লে জুবায়ের তাকে টেনে নামানোর চেষ্টা করেন। পরে ফেসবুকে ওই ভিডিও শেয়ার করে তিনি লেখেন, একজন ‘ফ্যাসিবাদী শিক্ষককে’ আটকে রাখার চেষ্টা করেছিলেন।

অধ্যাপক জামাল উদ্দিন এর প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের মধ্যে আদর্শিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু আমি তার শিক্ষক। তিনি আমার সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারেন না।’

৭ মার্চের কর্মসূচিতে হামলার অভিযোগ

চলতি বছরের ৭ মার্চ একটি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শাহবাগ এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচারের উদ্যোগ নেন ডাকসু নির্বাচনে পরাজিত সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী শেখ তাসনিম আফরোজ এমি।

অভিযোগ রয়েছে, জুবায়ের এবং ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদের নেতৃত্বে এমি ও তার সঙ্গীদের ওপর হামলা চালানো হয়। ‘ছাত্রলীগ কর্মী’ আখ্যা দিয়ে তাদের মারধর করা হয়।

গভীর রাতে পরীবাগে গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতি

গত মঙ্গলবার গভীর রাতে শাহবাগ মোড়সংলগ্ন পরীবাগ ফুটওভার ব্রিজে এবি জুবায়ের এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মো. সিফাতুল্লাহ তাসনিমের সঙ্গে ট্রান্সজেন্ডারদের হাতাহাতি ও বাকবিতণ্ডার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ভিডিওগুলোতে দাবি করা হয়, জুবায়ের ও তার সঙ্গী যৌনকর্মের পর টাকা না দিয়ে চলে যেতে চাইছিলেন।

তবে জুবায়েরের দাবি, তার ওই বন্ধু একজন সংবাদকর্মী এবং ট্রান্সজেন্ডারদের নিয়ে লেখালেখি করেন। বন্ধুর নিরাপত্তার জন্য তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু হিজড়ারা তার ভিডিও ধারণ করে অপপ্রচার চালিয়েছে।

তিনি আরও দাবি করেন, শাহবাগ থানাকে জানিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন। একই সঙ্গে এ ঘটনায় তার চরিত্রহননের অপচেষ্টা চলছে উল্লেখ করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।

এ বিষয়ে শাহবাগ থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘জুবায়ের তাদের ফোন করে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠাতে বলেছিলেন।’

বিপাকে পড়েও আক্রমণাত্মক মনোভাব

পরীবাগের ঘটনার পরও জুবায়েরের আক্রমণাত্মক অবস্থান থামেনি। বৃহস্পতিবার তিনি ফেসবুকে লেখেন, ‘ক্যাম্পাসে কিছুক্ষণ আগে এক সমকামী যুবককে আটক করা হয়েছে। বিচার কার্যক্রম চলমান। এ সময় ট্রান্স এলজিবিটিদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান সব সময় থাকবে।’

এরপর কয়েকজন মিলে ওই যুবককে মারধর করেন বলে ভিডিও সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে ওই ভিডিওগুলোতে জুবায়েরকে দেখা যায়নি।

শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান টাইমসকে বলেন, ‘সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে যে কেউ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে পারেন। তবে ইচ্ছা করলেই যে কেউ যেকোনো জায়গায় উচ্ছেদ অভিযান চালাতে পারেন না। এটি আইনসম্মত নয়।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad