বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা বেসরকারি খাতে দেওয়ার সরকারের যুক্তি এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিই গ্রাহকদের কাছ থেকে বিলের প্রায় পুরো টাকাই আদায় করছে। ফলে বিল আদায় বাড়ানোর জন্য বেসরকারি অপারেটর প্রয়োজন—সরকারের এমন যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সরকারের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা। তাদের আশঙ্কা, এর ফলে পরিচালন ব্যয় বাড়বে, বিদ্যুৎ খাতের ঘাটতি আরও গভীর হবে এবং শেষ পর্যন্ত গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বা শুল্ক অনেকটাই বেড়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিতরণ কোম্পানিগুলোকে বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করলেই যে সেগুলো লাভজনক হয়ে উঠবে, তা নাও হতে পারে। কারণ, তাদের দক্ষতা বাড়ানোর যে সুফল মিলবে, তার চেয়ে পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির পরিমাণ অনেক বেশি হয়ে যেতে পারে।
বুধবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ইকবাল হাসান মাহমুদ এই নীতিগত পরিবর্তনের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি পরিচালনার জন্য বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে ইতিমধ্যে প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছে। বেসরকারি খাত যুক্ত হলে সেবার মান উন্নত হবে, রাজস্ব আদায় বাড়বে এবং সরকারের ওপর আর্থিক চাপ কমবে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে এই ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তাদের বিল আদায়ের দক্ষতা ইতোমধ্যে শতভাগের কাছাকাছি রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে গড়ে ৯৯ দশমিক ০২ শতাংশ বিল আদায় করেছে। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) ক্ষেত্রে এই হার ছিল ১০১ দশমিক ১০ শতাংশ। অন্যদিকে, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী তাদের বিল আদায়ের হার ছিল ১০১ দশমিক ৮২ শতাংশ।
এছাড়া বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) ৯৮ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) ৯৯ দশমিক ৮০ শতাংশ বিল আদায়ের কথা জানিয়েছে। আবার বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী তাদের আদায়ের হার দাঁড়িয়েছে ১০০ দশমিক ০২ শতাংশ।
বিপিডিবির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদন সূত্রে আরও দেখা যায়, তাদের সার্বিক বিল আদায়ের হার ছিল ১০০ দশমিক ০২ শতাংশ। ডিপিডিসির ক্ষেত্রে এই হার ১০০ দশমিক ৩০ শতাংশ, ডেসকো ও ওজোপাডিকো উভয়েরই ১০০ দশমিক ১৭ শতাংশ, বিআরইবির ৯৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং নেসকোর ৯৭ দশমিক ১২ শতাংশ। সর্বসাকুল্যে এই কোম্পানিগুলোর মোট বিল আদায়ের গড় হার দাঁড়িয়েছে ১০০ দশমিক ৫০ শতাংশে।
এসব পরিসংখ্যান দেখে একটি বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—তাহলে কি বিল আদায় বাড়ানোই সেই প্রধান চ্যালেঞ্জ, যার জন্য বেসরকারিকরণ এত জরুরি?
তবে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে মন্ত্রী বলেন, খুচরা ব্যবসা পরিচালনা করা সরকারের কাজ নয়। সরকারের মূল মনোযোগ থাকা উচিত বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং তা পাইকারি দরে বিক্রি করার ওপর। আর গ্রাহকপর্যায়ে বিতরণের বিষয়টি পরিচালনা করা উচিত বেসরকারি খাতের। আঞ্চলিক বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে তিনি দাবি করেন, বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়লে কাজের দক্ষতা আসবে, গ্রাহকসেবা উন্নত হবে এবং সরকারি তহবিলের ওপর চাপ কমবে।
তবে জ্বালানি বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত সমস্যার সমাধান করার চেয়ে নতুন ধরনের খরচের বোঝা তৈরি করতে পারে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিসিস (আইইইএফএ)-এর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান বেসরকাররিকরণ করা হলে তার মূল লক্ষ্যই বদলে যায়। কারণ বেসরকারি পরিচালকরা স্বাভাবিকভাবেই মুনাফাকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেবেন।
তিনি বলেন, ‘সরকারি কোম্পানির তুলনায় বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা ও পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, এই বেসরকারিকরণের ফলে শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচের সৃষ্টি হবে কি না।’
তার মতে, বাংলাদেশের এখন প্রথম কাজ হওয়া উচিত জ্বালানি সংকট ও নবায়নযোগ্য শক্তির ঘাটতি দূর করে বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা। শফিকুল আলম উল্লেখ করেন, বিপিডিবি বর্তমানে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে কম দামে বিক্রি করে। কোনো বিতরণ এলাকা বেসরকারিকরণ করা হলে খরচের এই কাঠামোটি খুব সতর্কতার সাথে পর্যালোচনা করতে হবে।
তিনি জানান, বেসরকারিকরণের ফলে সিস্টেম লস বা বিতরণ অপচয় কমলে ব্যবস্থাপনা কিছুটা উন্নত হতে পারে এবং রাজস্ব কিছুটা বাড়তে পারে। তবে পাশাপাশি এটি খরচও বাড়িয়ে দেবে। তাই বিতরণ অপচয় কমানো, বিল আদায় বাড়ানো এবং পরিচালনাগত দক্ষতা বৃদ্ধি—সবকিছু মিলিয়ে যদি সার্বিক সুফল আসে, তবেই কেবল এটি লাভজনক হতে পারে।
এদিকে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান অবস্থাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) থাকা রোগীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে আর্থিক ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে।
‘এর ফলে ব্যয় বাড়বে এবং ঘাটতি আরও বড় হবে। শেষ পর্যন্ত সরকারকে হয়তো গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সেই ঘাটতি সামাল দিতে হবে,’—বলেন শামসুল আলম।
বেসরকারি খাত এলে বকেয়া বিল আদায় সহজ হবে—এমন যুক্তির কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকারের নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলোই সবচেয়ে বড় বকেয়া ফেলে রাখা বিলখেলাপি।
তার ভাষায়, ‘বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছেই সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়ে আছে। সরকার নিজেই বিদ্যুৎ কিনে সময়মতো বিল পরিশোধ করতে পারছে না। সেখানে বেসরকারিকরণ করলেই বকেয়া আদায় বেড়ে যাবে আর সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—এমনটা বিশ্বাস করার কোনো যুক্তি নেই।’
শামসুল আলম আরও বলেন, বেসরকারিকরণের বাহানা হিসেবে বিল আদায়ের অজুহাত দেওয়া হচ্ছে, অথচ মূল সমস্যাটি হলো সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব।
‘যদি আমাদের দক্ষতা ও সক্ষমতায় দুর্বলতা থেকে থাকে তবে তা সরকারের নিজস্ব ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে। নিজেদের দক্ষতা ও সক্ষমতার ঘাটতির অজুহাতে জনগণের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এভাবে হস্তান্তর করা কি কোনো যৌক্তিক পদক্ষেপ হতে পারে?’—প্রশ্ন তোলেন তিনি।


