বিদেশে বাংলাদেশি রাজনীতি: হুমকির মুখে ভাবমূর্তি

বিদেশে বাংলাদেশি রাজনীতি: হুমকির মুখে ভাবমূর্তি
Advertisement
Advertisement

প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুসের নিউইয়র্ক সফরে আওয়ামী লীগের প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিদেশের মাটিতে দেশের রাজনীতি নিয়ে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে দেশের ভাবমূর্তি।

উল্লেখ্য, জাতিসংঘের ৮০তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধান উপদেষ্টা ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী এমিরেটস-এর একটি ফ্লাইট গত ২২ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় দুপুরে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তায় মুহাম্মদ ইউনূস নিজে তার হোটেলে নিরাপদে পৌঁছান। তার সফরসঙ্গী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, এনসিপি নেতা আখতার হোসেন, ডা. তাসনিম জারা ও জামায়াত নেতা আব্দুল্লাহ মো. তাহের বিক্ষোভকারীদের তোপের মুখে পড়েন। ঢাল হিসেবে এসব নেতাদের নিয়ে গেলেও মুহাম্মদ ইউনূস তাদের ফেলে রেখে একা নিরাপদে চলে যাওয়ার ঘটনা নানা সমালোচনার জন্ম দেয়। বিমানবন্দরের বাইরে আখতারের উদ্দেশে ডিম ছুড়ে মারার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশে বিদেশে শুরু হয় তোলপাড়। এর জবাবে আখতার তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, ‘আমরা সেই প্রজন্ম যারা হাসিনার গুলির সামনে দাঁড়াতে ভয় পাইনি, ভাঙা ডিমে কি-ই বা যায় আসে। বরং এ ঘটনায় এটাই প্রমাণিত হয়েছে আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসী সংগঠন।’

এদিকে, আখতারসহ অন্যদের ওপর হামলার এ ঘটনাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গাফিলতি বলে মন্তব্য করেছেন এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দেবেন মুহম্মদ ইউনূস। এ অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ তাদের কর্মীদের জাতিসংঘ সদর দপ্তর এলাকায় জড়ো হওয়ার আহ্বান করেছে। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি সমর্থকরা তাদের সমর্থকদের নিয়ে পাল্টা সমাবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বিদেশের মাটিতে শোডাউনের এ রাজনীতি নিয়ে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘এটা একদিনের বিষয় না। এটা অনেক পুরোনো ট্র্যাডিশন। তবে আমাদের দলের কোনো শাখা-প্রশাখা বিদেশের মাটিতে নেই। কিন্তু সে দেশের নিয়ম অনুযায়ী অনেকে দলের অঙ্গসংগঠন চালায়।’

আমেরিকা প্রবাসী সাংবাদিক কর্মী মানিক রহমান গত ২৭ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘যারা সত্যিকার অর্থে দেশকে ভালোবাসেন, বন্যা-দুর্যোগে দেশের মানুষের জন্য ত্রাণ পাঠান তাদের কেউ আমেরিকায় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। এক শ্রেণির সুযোগসন্ধানী টাউট শ্রেণির প্রবাসী এসব হাঙ্গামার সঙ্গে যুক্ত। এদের অপতৎপরতা আন্তর্জাতিক কমিউনিটিতে সরকার ও প্রবাসীদের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। যদিও বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল দুনিয়ার দেশে দেশে তাদের কর্মকাণ্ড বাড়িয়ে চলেছেন। ইস্যুভিত্তিক রাজনীতি না করে বিদেশেও এমন ধরনের হিংসাত্মক রাজনীতি পৃথিবীর আর কেউ করে না। ভারতীয়দের ক্ষেত্রেও এমনটি দেখা যায় না।’

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার কারণে তারা বিদেশে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছেন। নিরাপদ পরিবেশ পেয়ে বিদেশের মাটিতে বসে তারা মিছিল-মিটিং করছেন, লবিং করছেন। দেশের কারাগারে আটক থাকা নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবি জানাচ্ছেন। তারা রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ করার হুমকিও দিচ্ছেন।

অর্থনৈতিক কারণে তারা দেশত্যাগ করলে তাদের মগজে থাকে দেশের রাজনীতি। ফলে বিদেশে গিয়েও তারা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশের ভিকটিম দেখিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনার সুযোগ নিচ্ছেন।

আরও পড়ুন

আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীর সর্বোচ্চ নেতৃবৃন্দ এসব কমিটি অনুমোদন করেন আর এসব মনোনীত নেতারাই হয়ে উঠেন অফিশিয়াল নেতা। এসব দলের গঠনতন্ত্রে অবশ্য এ ধরনের বৈদেশিক শাখার কথা উল্লেখ নেই।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিদেশে পাড়ি জমানো বাংলাদেশিরা গণহারে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার কারণ কী? বিদেশে অবস্থানরত রাজনৈতিক নেতারা বলেছেন, তারা হৃদয়ে লালন করেন বাংলাদেশকে। দেশের মঙ্গলের জন্য তারা নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত। তারা শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হননি।

বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী, দেশের কোনো রাজনৈতিক শাখা বিদেশে থাকতে পারবে না। যদিও শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় নিজেই প্রবাসের কমিটিগুলোর আয়োজনে প্রধান অতিথি হয়ে কমিটি অনুমোদন দিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী একজন সাংবাদিক জানান, যুক্তরাষ্ট্রের আইন অুনযায়ী কোনো রাজনৈতিক দলের অফিস করতে হলে নিবন্ধন করতে হয়, যা কারও নেই। অলাভজনক সামাজিক সংগঠন হিসেবে তারা নিবন্ধন নেন আর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন, যা অনৈতিক। বিদেশে দুই ধরনের মানুষ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। আদর্শগত কারণে আর ব্যক্তিস্বার্থ আদায়ের কারণে। দেশে একজন মন্ত্রী-এমপির সান্নিধ্য পাওয়া যতটা কঠিন এখানে ততটাই সহজ। এজন্য ক্ষমতাসীনদের কোনো সফরে ফুলের মালা হাতে দাঁড়িয়ে থাকার লোকের অভাব হয় না। ব্যক্তিস্বার্থ আদায় করতেই তারা এসব করেন। গত সরকারের সময় পদে থাকা অনেকেই প্লট পেয়েছেন। পেয়েছেন নানা সুযোগ-সুবিধা। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করাসহ বিরোধীদলের ওপর অত্যাচার নিপীড়ন নিয়ে প্রতিবাদের কোনো সুযোগ পায়নি। দেশে বাকস্বাধীনতা নেই। কথা বলার সুযোগ নেই। গণতন্ত্র নেই। এ কারণে বিদেশের মাটিতে সুযোগ পেয়ে প্রতিবাদ জানাতে চান তারা।’

প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে কেউ সময় কাটানোর জন্য কেউ আবার পরিচয় সংকট কাটাতে রাজনীতিতে সক্রিয়। জীবন ধারণের জন্য বিদেশের মাটিতে যে ধরনের কাজ করতে হয় তা তারা গোপন করতে চান। কেউ কেউ মন্ত্রী এমপিদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তদবির বাণিজ্য করেন। ইউরোপ বা আমেরিকায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি বা অন্য দলের কমিটি থাকায় বাংলাদেশিদের মধ্যে বিভেদ বেড়েছে। নষ্ট হয়েছে নিজেদের আন্তরিকতা বা সৌহার্দ্য। আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপিও একই কাজ করেছে।

অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বিএনপি নেতা ও জিয়া পরিষদের আহ্বায়ক জাকির আলম লেনিন জানান, প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে যারা রাজনীতি করতে চান তাদের সংশ্লিষ্ট দেশের মূলধারায় রাজনীতি করা উচিত। তাহলেই তারা দেশের মানুষের জন্য সত্যিকার অর্থে ভূমিকা রাখতে পারবেন।

যখনই হাসিনা জাতিসংঘের সম্মেলন বা অন্য কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা অন্য কোনো দেশে গিয়েছেন তখনই বিএনপি বা বিরোধীদলের সমর্থকরা বিক্ষোভ করেছেন। বিএনপির আমলে একই কাজ করেছে আওয়ামী লীগ। একই দলের একাধিক কমিটি গঠন নিয়ে প্রায়ই নিজেদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। ফলে বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে আমাদের দেশ সম্পর্কে খারাপ ধারণা জন্ম নিয়েছে।

বাংলাদেশের মাটিতে আমাদের একটাই পরিচয় থাকবে। আর সেটা হলো আমরা সবাই বাংলাদেশি পলিটিক্যাল পার্টি রেজিস্ট্রেশন রুলস-২০০৮ অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের বিদেশে কোনো শাখা থাকলে সে দল নিবন্ধনের জন্য যোগ্য নয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ পৃথিবীর বড় দেশগুলোতে প্রতিটা রাজনৈতিক দলের শাখা আছে, দল আছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত আইন সে দেশের ভেতরে অন্য কোনো দেশের রাজনীতি করার প্রথাকে কোনোভাবেই গ্রাহ্য করে না। সামাজিক সংগঠন চালাতে হলেও লাগে সরকারের অনুমোদন। নির্ধারিত ফি দিয়ে তারপরই মেলে সেই অনুমোদন। আর সে সুযোগ নিয়েই আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। তবে যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রে জামায়াতে ইসলামী নামে কোনো সংগঠন কাজ করে না। মুসলিম উম্মাহ ইন আমেরিকা ও ইসলামিক সার্কেল অব নর্থ আমেরিকা নামেই চলে তাদের কার্যক্রম। দাওয়াতুল ইসলাম নামে তারা যুক্তরাজ্যে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর বিদেশি শাখা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত প্রবাসী বাংলাদেশিরা নিজেদের পছন্দের দলের জন্য বিভিন্ন নির্বাচনে মোটা অঙ্কের আর্থিক অনুদানও দিয়ে থাকেন। তাদের কেউ এমপি মন্ত্রী হতে চান, কেউ চান প্রতিষ্ঠা। তবে দলের ত্যাগী নেতারা উপেক্ষিতই থেকে যান। গত কয়েক বছর ধরে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে ডিম ছোড়া, গালিগালাজ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন নৈমিত্তিক ব্যাপার। কেউ কেউ বলেছেন, বাংলাদেশের রাজনীতির চাইতে মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় হলে তারা বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবেন। তবে ভিন্নমত পোষণ করে কেউ কেউ বলেছেন, বাংলাদেশে যেহেতু আসল ঠিকানা ও জন্মভূমি তাই অনেকেই দেশের জন্য অবদান রাখতে চান। আশঙ্কার কথা হলো দেশের মতো বিদেশেও রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছে। বাংলাদেশের সংবিধানে সব নাগরিকের ভোটাধিকারের বিষয় উল্লেখ থাকলেও দেড় কোটি প্রবাসী বাংলাদেশির ভোটাধিকার এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন দেশে শাখা রয়েছে। দেশে এসব দলের মধ্যে যে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায় তা প্রবাসী শাখাগুলোতেও একইভাবে প্রতিফলিত হয়ে থাকে। এসব কর্মকাণ্ড বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। তিনি বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদানকে আরও কৌশলগতভাবে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের জন্য একটি সুসংহত এবং ইতিবাচক ইমেজ তৈরিতে আমাদের মনোযোগ দিতে হবে। একজন ভারতীয় যখন অন্য কোনো দেশ সফর করেন তখন প্রবাসীরা তাদের নেতাদের লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে কোনো বিক্ষোভ করেন না। আমাদের ক্ষেত্রে এটি বিপরীত এবং এটি অনেকদিন ধরেই চলে আসছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে দেশের যেকোনো রাজনৈতিক ইস্যুতে মিছিল, পাল্টা মিছিল, হুমকির ঘটনা নিয়মিত। এসব রাজনৈতিক সহিংসতা কেবল বিদেশের মাটিতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করবে না, দেশেও উসকে দেবে আরো সহিংসতা।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad