নিউইয়র্কে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের ওপর হামলার সঙ্গে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তার জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছেন দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
তিনি অভিযোগ করেন, ‘বিভিন্ন সময় এনসিপি কর্মীদের ওপর আওয়ামী লীগ হামলা, ষড়যন্ত্র এবং অপতৎপরতা চালালেও সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’
মঙ্গলবার দুপুরে জাতীয় নাগরিক পার্টির অস্থায়ী কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন তিনি।
নাহিদ বলেন, ‘যখন উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ওপর হামলা হয়েছিল, তখনও আমরা বলেছিলাম গণঅভ্যুত্থানের নেতাদের টার্গেট করা হচ্ছে। এই হামলার সঙ্গে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা অসম্পূর্ণ ছিল। সরকার এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভেতর থেকেই আমাদের সফর সংক্রান্ত তথ্য ফাঁস (লিক) করা হয়। তাই গতকালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।’
এনসিপির প্রবাসী কর্মীদের কাছে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রবাসী সমর্থকদের ভুল পথে পরিচালিত করা হয়েছে। তাদের অন্য একটি গেট দিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও পরে তাদের গমন পথ পরিবর্তন করা হয়।’ প্রোটোকল ও নিরাপত্তা দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের অবহেলার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন নাহিদ।
‘সরকার ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আমরা জবাবদিহি চাই। তারা মুহাম্মদ ইউনূসের সফরসঙ্গী হিসেবে আমাদের নেতাদেরকে সুরক্ষিত রাখতে ব্যর্থ হয়েছে’, যোগ করে এই এনসিপি নেতা বলেন, ‘সরকার বারবার বিচারের কথা বললেও বাস্তবে সেখানে দুর্বলতা দেখা যায়, তাই আওয়ামী লীগ এত তৎপর হতে পারছে।’
নিউইয়র্কে এনসিপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় দাবি করে নাহিদ বলেন, ‘আওয়ামী লীগ দেশের অভ্যন্তর ও বিদেশে বিভিন্ন তৎপরতা চালিয়ে দেশের অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। গণঅভ্যুত্থানের নেতা, শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহতদের ওপর সাইবার মাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা ও প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে, যা এই হামলার ধারাবাহিক অংশ।’
নাহিদ জানান, জাতীয় নাগরিক পার্টি দীর্ঘদিন ধরেই ‘জুলাই গণহত্যার’ সুষ্ঠু বিচার দাবি করে আসছে। তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক হামলাগুলোই স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে- কেন জাতীয় নাগরিক পার্টি আওয়ামী লীগকে একটি “সন্ত্রাসী দল” হিসেবে বিবেচনা করে তাদের বিচার দাবি করে।’
এর আগে গত জুলাইয়ে দেশব্যাপী এনসিপি’র পদযাত্রা কর্মসূচিতে গোপালগঞ্জে দলটির নেতাকর্মীদের ওপর হামলাও পরিকল্পিত ছিল বলে দাবি করেন এনসিপি আহ্বায়ক।

সোমবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে যান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। তার সফরসঙ্গী হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ তিনটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন ও সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারার ওপর হামলা করে রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মীরা।
আখতার হোসেনের দিকে ডিম ছুড়ে মারার ঘটনায় যুবলীগ কর্মী মিজানুর রহমানকে আটক করে নিউইয়র্ক পুলিশ। তার বিরুদ্ধে বিএনপির কর্মীকে ছুরি দিয়ে মারার অভিযোগও রয়েছে।
এ ঘটনায় জড়িতদের সবাইকে দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের পাশপাশি সরকারের কাছে বেশকিছু দাবি জানান নাহিদ ইসলাম। সংবাদ সম্মেলনে নিউইয়র্কের কনস্যুলেট জেনারেলকে অবিলম্বে পদত্যাগ এবং নিরাপত্তা ব্যর্থতার জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের শাস্তি চান তিনি।
এছাড়া, উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ওপর হামলার ঘটনায় পাঁচ আসামির তালিকা চেয়ে ফ্যাসিবাদ শাসনামলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত বিভিন্ন পদে ‘আওয়ামী লীগের দোসরদের’ পদচ্যুতির দাবি জানান নাহিদ।
পাশপাশি জুলাইয়ের গণহত্যার বিচারে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং আওয়ামী লীগকে ‘সন্ত্রাসী দল’ হিসেবে দ্রুত ট্রাইব্যুনালের বিচার শুরুর দাবি জানিয়ে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, ‘পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে বসে বিদেশে আমাদের নেতাদের নিরাপত্তা ব্যর্থতার কারণ খতিয়ে দেখব। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিতর্কিত নিয়োগ সম্পর্কেও জবাবদিহি চাইব। পাশাপাশি, আওয়ামী লীগের বিদেশি কার্যক্রম বন্ধে প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকার বাস্তবায়ন চাইব।’
আওয়ামী লীগকে ফের ক্ষমতায় আনার রাজনীতির আর সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট করে বলছি- আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা যারা করবে, জনগণ তাদের প্রতিরোধ করবে এবং তাদের রাজনীতি দেশের রাজপথ থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে।’
এসময় বিএনপি’র প্রতি আহ্বান জানিয়ে নাহিদ বলেন, ‘আমরা বিএনপিকে গণঅভ্যুত্থানের অংশীদার এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের সহযোগী হিসেবে দেখি। তাদের প্রতি আহ্বান জানাই, দেশের পুনর্গঠন ও বিচার প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে।’


