সরকারবিরোধী বিক্ষোভের জেরে ইরানে ইন্টারনেট ও আন্তর্জাতিক টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার রাতে এ পদক্ষেপ নেয় সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরকার।
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, ইরানের নির্বাসিত ক্রাউন প্রিন্স শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ডাকে বৃহস্পতিবার রাতে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে তাৎক্ষণিকভাবে ইন্টারনেট ও টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ক্লাউডফ্লেয়ার এবং অধিকারকর্মী সংগঠন নেটব্লকস ইন্টারনেট বিভ্রাটের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, এর পেছনে ইরান সরকারের হস্তক্ষেপ রয়েছে। দুবাই থেকে ইরানে ল্যান্ডলাইন ও মোবাইল ফোনে কল দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
রাজধানী তেহরানের মতো বড় বড় শহরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ মুহূর্তেই গ্রামীণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, বন্ধ হয়ে যায় দোকান-পাট, বাজার।
শুক্রবার ভোর পর্যন্ত চলা এই বিক্ষোভকে মূলত নির্বাসিত ক্রাউন প্রিন্সের আহ্বানে ইরানি জনগণ সাড়া দেয় কিনা-তার প্রথম বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। নির্বাসিত পাহলভি বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত ৮টায় এ বিক্ষোভের ডাক দেন। এ সময় তেহরানের বিভিন্ন এলাকা সরকারবিরোধী স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে।
‘স্বৈরাচারের মৃত্যু হোক!’, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মৃত্যু হোক!’, ‘এটাই শেষ লড়াই! পাহলভি ফিরে আসবেন!’ স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজপথ।
বিক্ষোভকারীদের কঠোর হাতে দমনে ও তাদের শনাক্ত করতে ড্রোন ব্যবহার করছে নিরাপত্তা বাহিনী।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি জানায়, এ পর্যন্ত বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতায় অন্তত ৪২ জন নিহত হয়েছেন এবং দুই হাজার ২৭০ জনের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ সামগ্রিক বিক্ষোভের পরিসর স্বীকার না করলেও, বিচার বিভাগের সংবাদ সংস্থা মিজানের খবরে বলা হয়, তেহরানের উপকণ্ঠে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টায় নিয়োজিত এক পুলিশ কর্মকর্তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে।
আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স জানায়, চাহারমাহাল ও বখতিয়ারি প্রদেশের লোরদেগান শহরে বন্দুকধারীদের হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর দুই সদস্য নিহত এবং ৩০ জন আহত হয়েছেন।
তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে ৮৫ মিলিয়নের বেশি মানুষকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া এই ইন্টারনেট বন্ধের কথা উল্লেখ করেনি। বরং শুক্রবার সকাল ৭টার সম্প্রচারে তারা খাদ্য ভর্তুকির খবর প্রচার করেছে। তাদের দাবি, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী নেতৃত্বহীন অবস্থায় ছোট ছোট বিক্ষোভ করছে।

অন্যদিকে, পাহলভি বলেন, ‘আজ রাতে ইরানিরা তাদের স্বাধীনতা দাবি করেছে। এর জবাবে ইরান সরকার সব যোগাযোগ লাইন কেটে দিয়েছে। তারা ইন্টারনেট বন্ধ করেছে, ল্যান্ডলাইন কেটে দিয়েছে। এমনকি স্যাটেলাইট সংকেত জ্যাম করার চেষ্টাও করতে পারে।’
বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে জবাবদিহির আওতায় আনতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একত্রে প্রভাব ফেলতে তিনি ইউরোপীয় নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান।
পাহলভি বলেন, ‘ইরানি জনগণকে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনে সব প্রযুক্তিগত, আর্থিক ও কূটনৈতিক সম্পদ ব্যবহার করার জন্য আমি আহ্বান জানাই। তাদের কণ্ঠস্বর ও ইচ্ছা দমন করা যাবে না। আমার সাহসী স্বদেশবাসীদের কণ্ঠস্বর যেন নীরব করা না হয়।’
এ সময় পাহলভি জানান, তার ডাকে ইরানিরা কেমন সাড়া দেয় তার ওপর ভিত্তি করে তিনি পরবর্তী পরিকল্পনা দেবেন। কারণ অতীতে ইসরায়েলের প্রতি পাহলভির সমর্থন এবং পাল্টা সমর্থন ও সুসম্পর্ক দেশের কট্টর ইসলাম্পন্থিদের মধ্যে কঠোরভাবে সমালোচিত হয়েছে।
ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলাভির বাবা মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী তেহরানে জন্মগ্রহণকারী ইরানের শেষ রাজা ছিলেন। ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইসলামি বিপ্লবের ফলে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।
মারাত্মকভাবে অসুস্থ অবস্থায় তিনি পরিবারসহ ইরান থেকে বিতাড়িত হন। এরপর থেকে ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলাভির পক্ষপাতিত্ব ইরানে করাও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এমনকি পাহলাভির পক্ষে কেউ প্রকাশ্যে স্লোগান দিলে তাকে মৃত্যুদণ্ডের হুঁশিয়ারি দেয় ইসলামিক বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানের ক্ষমতা নেওয়া সরকার।


