দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘দুর্নীতির চ্যাম্পিয়ন’ শব্দটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, যা বক্তৃতা, সমাবেশ এবং নির্বাচনী প্রচারণায় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। জাতীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী চর্চিত বিষয়ের একটি হয়ে ওঠে যে, বিএনপি সরকার বাংলাদেশকে পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত জাতিতে পরিণত করেছে।
কিন্তু ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) থেকে পাওয়া দুই দশকের তথ্য ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে, যা নীরবে কিন্তু নিশ্চিতভাবে সেইসব রাজনৈতিক বক্তব্যকে অসাড় প্রমাণ করে।
২০০১ সালে যখন বাংলাদেশ প্রথম করাপশন পারসেপশনস ইনডেক্সে (সিপিআই) স্থান পায়, তখন বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল, যেখানে ১০-পয়েন্ট স্কেলে স্কোর ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৪। এই ফলাফল জাতিকে হতবাক করেছিল এবং বহু বছর ধরে এটি রাজনৈতিক আলোচনাকে রূপ দিয়েছিল।
মজার বিষয় হলো, সূচকটির পদ্ধতি নিয়ে খুব কম লোকই মাথা ঘামিয়েছিল। সিপিআই পূর্ববর্তী বছরের জরিপ থেকে পাওয়া ধারণাকে প্রতিফলিত করে। আসলে, ২০০১ সালের সূচকটি মূলত ২০০০ সালের অর্থাৎ আওয়ামী লীগের ১৯৯৬-২০০১ প্রশাসনের শেষ বছরের দুর্নীতির অবস্থাকে তুলে ধরেছিল।
তথ্যটি ২০০১ সালের অক্টোবরে ক্ষমতায় আসা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করেনি বরং এটি তার পূর্বসূরিদের রেখে যাওয়া শাসন ব্যবস্থার পরিবেশকে প্রতিফলিত করেছিল।
এই পার্থক্যটি, যদিও গুরুত্বপূর্ণ, রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক ছিল না। ‘দুর্নীতির চ্যাম্পিয়ন’ তকমাটি দলীয় দোষারোপের জন্য একটি সুবিধাজনক স্লোগান হয়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, এটি একটি রাজনৈতিক মিথ বা কল্পকাহিনিতে পরিণত হয়। এটি এত ঘন ঘন পুনরাবৃত্তি করা হয়েছিল যে এটি একটি গৃহীত ইতিহাসে পরিণত হয়। তবুও, সংখ্যাগুলো ভিন্ন কথা বলে।
২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে, বাংলাদেশের সিপিআই স্কোর স্থিরভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২০০২ সালে ১ দশমিক ২ থেকে ২০০৬ সালে দুইয়ে উন্নীত হয়, যা আওয়ামী লীগের শেষ বছরের পরিসংখ্যানের তুলনায় চার গুণেরও বেশি উন্নতি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল নিজেই এই অগ্রগতিকে ‘স্বল্প হলেও পরিমাপযোগ্য’ বলে বর্ণনা করে, যা ইঙ্গিত দেয় শাসনের ধারণা ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছিল।
এই উন্নতি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের একটি সময়ের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল। ২০০৪ সালে বিএনপি সরকার-নিয়ন্ত্রিত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর পরিবর্তে একটি স্বাধীন সংবিধিবদ্ধ সংস্থা ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)’ প্রতিষ্ঠা করে।
এই প্রথমবার বাংলাদেশের এমন একটি আইনি কাঠামো তৈরি হয়েছিল, যা কমিশনকে স্বাধীনভাবে দুর্নীতি তদন্ত ও বিচার করার ক্ষমতা দিয়েছিল। একটি রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন প্রতিষ্ঠানটির নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সংগ্রাম করতে হয়েছিল, কিন্তু এর সৃষ্টি জনগণের জবাবদিহি শক্তিশালী করার একটি দৃঢ় পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়।
বিএনপির মেয়াদের শেষ নাগাদ দুর্নীতির ধারণা কিছুটা শিথিল হয়েছিল। ২০০৭ সালে যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নেয়, তখন তারা দুর্নীতিবিরোধী অভিযান তীব্র করে। ফলে কয়েক ডজন হাই-প্রোফাইল রাজনীতিবিদ ও আমলা গ্রেপ্তার হন।
সেই দুই বছরের অভিযান সিপিআই স্কোরকে সামান্য বাড়িয়ে ২.১-এ নিয়ে যায়, যা পুরোনো স্কেলে বাংলাদেশের অর্জন করা সর্বোত্তম ফলাফল ছিল।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফিরে আসা একটি নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা করেছিল, তবে তা পরিচ্ছন্ন ছিল না। সরকার স্বচ্ছতা, ডিজিটাল শাসন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। তবুও, ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, মূল তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ক্ষয় হতে শুরু করে।
২০১১ সালের মধ্যে, সিপিআই স্কোর ছিল ২ দশমিক ৭, যা আগের চেয়ে বেশি হলেও স্থবিরতার লক্ষণ দেখাচ্ছিল। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের মন্তব্য ইঙ্গিত দেয়, ‘কোনো বড় প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতি নেই,’ এবং সতর্ক করে যে সংস্কারের প্রাথমিক অর্জনগুলো নতুন করে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
২০১২ সালে সিপিআই একটি নতুন বৈশ্বিক পদ্ধতি গ্রহণ করে এবং শূন্য থেকে ১০০ স্কেলে পরিবর্তিত হয়। বাংলাদেশ ২৬ স্কোর নিয়ে নতুন সিস্টেমে প্রবেশ করে, যা প্রায় তার আগের অবস্থানের সমতুল্য ছিল।
তবে, পরবর্তী দশকে স্কোরটি প্রায় স্থির ছিল, ২৪ থেকে ২৮-এর মধ্যে ঘোরাফেরা করছিল। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল শক্তিশালী, এবং অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়েছিল, কিন্তু দুর্নীতির ধারণা অপরিবর্তিত ছিল। সুশাসনের প্রতিশ্রুতিগুলো এক সময় এটিকে মূর্ত করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণের পথ তৈরি করে দেয়।
২০২৪ সালের মধ্যে সিপিআই স্কোর ২৩-এ নেমে আসে, যা গত ১৩ বছরে বাংলাদেশের সর্বনিম্ন এবং ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫১তম স্থানে রাখে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এই পতনের কারণ হিসেবে তদারকি সংস্থাগুলোর ওপর গভীর রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি দমন আইনের দুর্বল প্রয়োগ, এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বায়ত্তশাসনের হ্রাস-কে দায়ী করেছে। যে প্রতিষ্ঠানটিকে একসময় সংস্কারের প্রতীক হিসেবে প্রশংসা করা হয়েছিল, ততদিনে তা রাজনৈতিক তদারকি ও আমলাতান্ত্রিক নিষ্ক্রিয়তার দ্বারা সীমিত হয়ে মূলত একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল।
দীর্ঘমেয়াদী প্রবণতাটি স্পষ্ট। বাংলাদেশের সবচেয়ে খারাপ দুর্নীতির রেকর্ড এসেছিল আওয়ামী লীগের প্রথম মেয়াদের শেষ বছরগুলোতে, যখন এর একমাত্র স্থায়ী উন্নতি ঘটেছিল বিএনপি সরকার এবং এর পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফিরে আসার পর থেকে, পরিচ্ছন্ন শাসনের বারবার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও, সূচকটি স্থবির হয়েছে ও কমে গেছে।
এসব তথ্য একটি বৈপরীত্য প্রকাশ করে। আসলে বাংলাদেশে দুর্নীতি দলীয় নামের সঙ্গে নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার স্তরের সঙ্গে ওঠানামা করেছে।
এটি কোনো সরকারকেই দায়মুক্ত করে না। বাংলাদেশে দুর্নীতি একটি পদ্ধতিগত অবস্থা এবং এটি দলীয় সীমানা ছাড়িয়ে যায়। এটি ক্ষমতা কুক্ষিগত করার ফলে জবাবদিহিতার যে ক্ষয় হয় তারই প্রতিফলন।
প্রত্যেক ক্ষমতাসীন দলই তার নিজস্ব ক্ষমতা সীমিত করার জন্য তৈরি করা নিয়ন্ত্রণগুলোকে দুর্বল করতে অবদান রেখেছে। পার্থক্যটা ফলাফলে-যখন তদারকি সংস্থাগুলোকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছিল, তখন ধারণা উন্নত হয়েছিল, যখন সেগুলোকে দখল করা হয়েছিল ও তখন পতন ঘটেছিল।
গত ২৩ বছর জুড়ে বিস্তৃত সিপিআই স্কোর দলীয় দোষারোপের অসারতা উন্মোচন করে। এটি প্রকাশ করে যে কীভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজনে উভয় পক্ষই দুর্নীতিকে একটি আখ্যানমূলক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, একই সঙ্গে সেগুলোর মোকাবিলা করতে সক্ষম প্রতিষ্ঠানগুলোকেই ক্ষয় করেছে।
বিএনপি বাংলাদেশকে ‘দুর্নীতির চ্যাম্পিয়ন’ বানিয়েছিল-এই মিথটি টিকে আছে। কারণ, এটি রাজনৈতিক সুবিধার কাজ করে, ঐতিহাসিক সত্যের নয়।
দুই দশক পরেও, এই মিথের প্রতি একটি নীরব প্রতিবাদ হিসেবে সংখ্যাগুলো দাঁড়িয়ে আছে। তারা দেখায় যে বাংলাদেশের দুর্নীতির সমস্যা কখনো দলীয় ছিল না। এটি ছিল ও রয়ে গেছে কাঠামোগতভাবে।
যখন প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের পরিবর্তে ক্ষমতার সেবা করে, তখন দুর্নীতির ধারণা কেবল গভীরতর হয়। যতক্ষণ না সেই ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করা হয়, সিপিআই দেশটির অগ্রগতি নয়, বরং এর গণতান্ত্রিক অবক্ষয় পরিমাপ করতে থাকবে।


