বাড়ছে স্কুল, কমছে শিক্ষার্থী: আস্থার সংকটে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা

বাড়ছে স্কুল, কমছে শিক্ষার্থী: আস্থার সংকটে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা
ফাইল ছবি
Advertisement
Advertisement

গত এক দশকে বাংলাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২৭ হাজার ২৬১টি এবং শিক্ষকের সংখ্যা ১ লাখ ৫৮ হাজার ৮৬৪ জন বেড়েছে। তবে সেই তুলনায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে সামান্যই। মাত্র ১০ লাখ ৪১ হাজার ৩৭৮ জন।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন, উপবৃত্তি এবং নানা সুযোগ-সুবিধা বাড়লেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী ধরে রাখতে পারছে না। গড়ে প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমেছে ৮৮ জন।

শিক্ষক ও শিক্ষা গবেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে বড় কারণ হলো করোনা মহামারি। দীর্ঘ সময় স্কুল বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী মাদ্রাসা ও কিন্ডারগার্টেনে চলে গেছে এবং এই প্রবণতা এখনো অব্যাহত রয়েছে। ফলে প্রতি বছর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির হার কমছে। এ ছাড়া শিক্ষকদের দায়িত্ববোধের অভাবকেও একটি কারণ হিসেবে মনে করছেন অনেকে।

প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি রিয়াজ পারভেজ জানান, সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মান ও শিক্ষাদান পদ্ধতি অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ভালো। তবে অভিভাবকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ এবং সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারা কিছুটা পিছিয়ে আছেন।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সন্তানকে বেসরকারি স্কুলে পড়ানো অনেক পরিবারের কাছে সামাজিক মর্যাদার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল ৩৮ হাজার ৩০৬টি এবং শিক্ষার্থী ছিল ৯৫ লাখ ৭৮ হাজার ৬৮৮ জন। তখন গড়ে প্রতিটি স্কুলে আড়াইশর বেশি শিক্ষার্থী ছিল।

বর্তমানে স্কুলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫ হাজার ৫৬৭টি এবং শিক্ষার্থী সংখ্যা ১ কোটি ৬ লাখ ২০ হাজার ৬৬ জন। এখন স্কুলপ্রতি গড় শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে ১৬২ জনে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুন

জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির সিনিয়র বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আহসান ইবনে মাসুদ জানান, গত সরকারের আমলে শিক্ষা মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনও শিক্ষার্থী কমার একটি বড় কারণ। দেশের অভিভাবকরা শ্রেণিকক্ষ ভিত্তিক মূল্যায়নের চেয়ে পরীক্ষার ফলাফলের ওপর বেশি আস্থা রাখেন।

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পরীক্ষা তুলে দেওয়া এবং পরবর্তী শ্রেণিগুলোতে লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়নে জোর দেওয়াটা অভিভাবকরা ভালোভাবে নেননি। তবে এখন আবার বার্ষিক ও সাময়িক পরীক্ষা পদ্ধতি ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

অন্যদিকে, অভিভাবকরা শিক্ষকদের জবাবদিহিতার অভাব এবং পাঠদানের ধরনে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, শিক্ষকদের সঙ্গে অভিভাবকদের তেমন কোনো যোগাযোগ হয় না। এমনকি অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকও তাদের নিজেদের সন্তানদের সরকারি স্কুলে ভর্তি করান না, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। ফলে সামর্থ্যবান পরিবারগুলো ভালো যত্নের আশায় বেসরকারি স্কুলের দিকে ঝুঁকছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মাদ্রাসাগুলো বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার চালাচ্ছে এবং ধর্মীয় কারণে অনেকে সেখানে ঝুঁকছেন।

পাশাপাশি কিন্ডারগার্টেনগুলোও নানা প্রচারণার মাধ্যমে অভিভাবকদের আকৃষ্ট করছে। তবে সরকার উপবৃত্তির টাকা বাড়ানো, টিফিনের ব্যবস্থা করা এবং শুধু সরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির সুযোগ রাখার মতো পদক্ষেপ নিয়ে শিক্ষার্থী বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির মহাপরিচালক ফরিদ আহমেদ বলেন, বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার তদারকি আগের চেয়ে জোরদার করা হয়েছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যার ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ, অনেক স্কুলে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি শিক্ষক থাকলেও কোথাও আবার খুবই কম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন পাঠ্যবই এবং পরীক্ষা পদ্ধতি পুনরায় চালু করার ফলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

বিগত কয়েক দশকে অবকাঠামো ও জনশক্তিতে ব্যাপক বিনিয়োগ হলেও শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার এই চিত্র প্রমাণ করে, সম্পদের চেয়ে বড় সংকট এখন আস্থার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাঠদান পদ্ধতি, মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে অভিভাবকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে না পারলে কেবল ভবন নির্মাণ বা শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad