গুমঘরে ডিজিএফআই, এমইএস মসজিদ ও হাজি মহসিন মসজিদ, কচুক্ষেত অফিসার্স কোয়ার্টার মসজিদ এবং কচুক্ষেত বাজার মসজিদ থেকে দৈনিক পাঁচ বেলা আজানের শব্দ শুনতে পেতেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মো. হাসিনুর রহমান। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর ভাষায় পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের এনসিই বলা হতো। আমি এনসিই বলে ডাক দিলে তারা সাড়া দিত।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার বা জেআইসিতে কাটানো নিজের বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি। জেআইসিতে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাকে বলা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আপনাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। যেভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়, সেভাবে কাজ করবেন। কথা না শুনলে আপনাকে গায়েব করে দেওয়া হবে। এখানে আপনার মতো অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিও আটক আছে। পাশ থেকে একজন বলছিলেন, আপনি এখন আয়নাঘরে আছেন।’
রোববার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ জেআইসিতে সংঘটিত গুমের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার শুনানি গ্রহণ করে। আদালতের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বর্তমান ও সাবেক ১২ জন সেনা কর্মকর্তা এ মামলায় আসামি। এর আগে ১৮ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয়।
সাক্ষী বলেন, আমি ১৯৯০ সালে ঢাকা আর্মি এমপি ইউনিটের অপারেশন অফিসার হিসেবে দায়িত্বরত ছিলাম। সেনানিবাসের সকল এলাকা আমার পরিচিত। আমার বাসা ছিল আয়নাঘর থেকে ১৫০ গজ দূরত্বে। আমি প্রায়ই অফিসার মেস-বি তে আসতাম। সেখানে রাত ১০টার পরে আমরা মেইন গেট ব্যবহার না করে পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে হতাম। পেছনের দরজার সঙ্গেই আয়নাঘর অবস্থিত। আয়নাঘরের পাশে একটি মসজিদ আছে। সেখানে আমি অনেকদিন নামাজ পড়েছি। সেজন্য এলাকাটি চিনতে আমার অসুবিধা হয়নি। আয়নাঘরে থাকা অবস্থায় সব সময় পুরাতন বিমান বন্দরে অবস্থিত এভিয়েশন স্কুলের বিমান ওঠা-নামার শব্দ পেতাম, যা আমাকে এলাকাটি চিনতে সহায়তা করেছে। সকাল বেলা রেল গাড়ির শব্দ শুনা যেত। আমি বুঝতাম এটা বনানী রেল ক্রসিং।
গুমজীবনে খাবারের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের যে খাবার দেওয়া হতো তা ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। আমাদের বিছানার চাদর ও পরিধেয় পোশাক ব্যবহার অযোগ্য ছিল। তোশক, বালিশ ছারপোকায় ভরা ছিল। প্রহরীরা আমাদের সবসময় আতঙ্কের মধ্যে রাখতো এই বলে যে, কথাবার্তা ঠিকমতো শুনেন, নয়তো ক্রসফায়ারে যাবেন। প্রায়ই পার্শ্ববর্তী রুম খালি হয়ে যেত। বন্দীদের সরিয়ে ফেলা হতো। সেখানে নতুন বন্দী আনা হতো। প্রহরীরা আমাদের বলত, যাদের নিয়ে যাওয়া হতো তাদের ক্রস ফায়ারের জন্য নিয়ে যাওয়া হতো। আমাকে যে কমপ্লেক্সে রাখা হয়েছিল, তাকে বলা হতো রিমান্ড সেল। অপ্রয়োজনীয় বন্দীদের এই সেলে রাখা হতো। যখন প্রয়োজন হতো, এখান থেকে নিয়ে ক্রসফায়ার করা হতো।
জেআইসিতে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের বর্ণনা দেন সাবেক সেনা কর্মকর্ত। তিনি বলেন, আমাকে যে রুমে রাখা হয়, সেটি ছিল ৮-১০ ফিট এবং স্যাঁতসেঁতে। হাইভোল্টেজ বাল্ব জ্বলছিল। রুমটি ছিল নোংরা এবং ভয়াবহ। দেয়ালে রক্ত দিয়ে মোবাইল নম্বর লেখা ছিল। প্রচণ্ড গরমে আমি অস্থির হয়ে যাচ্ছিলাম। রুমে একটি চৌকি ছিল, তাতে নোংরা রক্তাক্ত চাদর বিছানো ছিল। পরে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে, চোখ বেঁধে, জমটুপি পরিয়ে তার ওপর কাপড় পেঁচিয়ে দেওয়া হয়। আমাকে চড়, থাপ্পড়, কিল ঘুষি মারতে মারতে অন্য একটি রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। এই রুমটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ছিল। সেখানে আমাকে একটি চেয়ারে বসিয়ে চেয়ারের সাথে আমার হাত পা বেঁধে ফেলা হয়। এক ব্যক্তি আমাকে জিজ্ঞাসা করে, কেন সেনাপ্রধান আজিজের বিরুদ্ধে লেখালিখি করি? আমাকে ভয়ভীতি ও মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয় এবং আমার লাশ গুম করে ফেলারও হুমকি দেওয়া হয়।
হাসিনুর রহমান আরও বলেন, ১০ জনের জন্য বাথরুমে ব্যবহারের জন্য দেড় ফুট লম্বা একটি গামছা ছিল। যে কাপড় দিয়ে আমাদের চোখ বেঁধে রাখা হতো তা ছিল অত্যন্ত নোংরা।
সাক্ষী জানান, তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি এখন কোথায় আছেন। জবাবে তিনি বলেন, আমি ডিজিএফআই সদরদপ্তর অথবা ঢাকা ডিটাচমেন্ট পোস্ট অফিস এলাকায় আছি। পাশ থেকে একজন বলছিলেন, আপনি এখন আয়নাঘরে আছেন।
নির্যাতন, নিপীড়নে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন, উল্লেখ করে তিনি বলেন, কয়েকদিন অস্বাভাবিক আচরণ করি। আমাকে আটক রাখার কারণ জানতে চাই। উত্তর না পেয়ে অনশন শুরু করি, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিই। অনশনের সপ্তম দিনে আমার অবস্থার অবনতি হলে আমাকে হাত, পা ও চোখ বেঁধে অফিসারের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি জানান, আমার বিরুদ্ধে তার ব্যক্তিগত কোনো অভিযোগ নেই, তবে নির্বাচনের আগে আমাকে ছাড়া হবে না। ফেসবুকে আমার অনেক ফলোয়ার, অনেক অফিসারও আমার অনুগত। সেজন্য আমি সরকারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
এরপর সাক্ষী বলেন, আমি সেনাবাহিনীর একজন উর্দ্ধতন কর্মকর্তা। আমার কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে বীর প্রতীক, বাংলাদেশ রাইফেল পদক ও বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল পাই। আমার সঙ্গে সাধারণ সৈনিকের অমানবিক ও লজ্জাজনক আচরণ আমি মেনে নিতে পারিনি। মানসিক চাপ ও শারিরীক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এক পর্যায়ে আমার হার্ট অ্যাটাক হয়। এ ছাড়া আমার স্ত্রী ক্যানসার আক্রান্ত, আমার তিনটি কন্যা সন্তান; সবার কথা চিন্তা করে আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। আমার হার্ট এ্যাটাক হওয়ার পর ওখানেই ডাক্তার আনা হয় এবং আমার ইসিজি করা হয়। সেখানেই আমাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসাকালীন সময়ও আমার চোখ বাঁধা এবং হ্যান্ডকাফ লাগানো থাকত।
মো. হাসিনুর রহমান বলেন, পরে আমাকে অন্য একটি রুমে নিয়ে যাওয়া হয়, যা আগের রুম থেকেও খারাপ ছিল। সেখানে বড় বড় দুটি একজস্ট ফ্যান লাগানো ছিল। এই ফ্যানগুলো লাগানোর উদ্দেশ্য ছিল যাতে ভেতরের কোন আওয়াজ, কান্নার শব্দ, চিৎকার বাইরে না যায়। ওখানে ১০টি রুম ছিল। প্রত্যেক রুম থেকেই চিৎকার ও কান্নার আওয়াজ পাওয়া যেতো। প্রহরীদের পায়ের আওয়াজ শুনলে বন্দীরা আতঙ্কিত হয়ে যেতেন, এই ভেবে যে, কখন কাকে নির্যাতন করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কাউকে কাউকে হত্যা করার জন্য র্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হতো। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একদিন সকালে আমি ব্রিগ্রেডিয়ার আজমিকে দেখে ফেলি। তাকে রাখা হয় পাশের কমপ্লেক্সে।


