স্থানীয় সরকারের ‘প্রশাসক’ পদটিকে লাভজনক পদ হিসেবে চিহ্নিত করার উদ্যোগ নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বর্তমানে দায়িত্বরত প্রশাসকরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। ফলে এতে বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতার মেয়র হওয়ার স্বপ্নে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
কমিশনের এই প্রস্তাব গৃহীত হলে, প্রশাসকদের নির্বাচনে লড়ার আগে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, দায়িত্বরত প্রশাসকরা পদে বহাল থেকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করে নির্বাচন নিজেদের পক্ষে নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন–এমন উদ্বেগ থেকে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত আইন সংশোধনের লক্ষ্যে আয়োজিত ইসির এক বৈঠকে প্রস্তাবটি প্রাথমিক নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে। তবে আইনি ক্ষেত্রে যেকোনো চূড়ান্ত পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই নির্ভর করবে।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রশাসক পদে বহাল থেকে কেউ নির্বাচনে অংশ নিক, সেটা কমিশন সমীচীন মনে করে না। তাই প্রশাসকের পদটিকে ‘লাভজনক পদ’ হিসেবে ঘোষণা করা যায় কি না, আমরা তা বিবেচনা করছি।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও পৌরসভাগুলো ভেঙে দিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জায়গায় প্রশাসক নিয়োগ দেয়।
পরবর্তীতে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সিটি কর্পোরেশনগুলোতে দল সমর্থিত ব্যক্তিদের প্রশাসক পদে নিয়োগ দেয়। তাদের অনেকেই এখন আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এ ছাড়া বিএনপি সরকার দেশের প্রায় সব জেলা পরিষদেই দলীয়ভাবে সমর্থিত প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। বর্তমানে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে ১২টিতে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকরা সরাসরি বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, আর বাকি একটি সিটি কর্পোরেশনে ইতিমধ্যে বিএনপির একজন নেতা মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ক্ষমতায় থেকে প্রশাসকদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিষয়টিকে নির্বাচন কমিশন ইতিবাচকভাবে দেখছে না বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার।
তিনি বলেন, ‘সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সিটি কর্পোরেশনের মেয়রদের ক্ষেত্রে নিয়মগুলো অনেক শিথিল। একজন সিটি মেয়র মন্ত্রীর পদমর্যাদা ভোগ করলেও মেয়রের ক্ষেত্রে নিয়ম সম্পূর্ণ আলাদা। তাই আমরা মনে করি এই আইনের সংশোধন প্রয়োজন।’
আনোয়ারুল ইসলাম সরকার আরও বলেন, যে আইনি কাঠামোর অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক না কেন, কমিশন এই বিষয়টি যাতে সংশোধন বা আইনি প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে।
ইতিমধ্যেই প্রশাসকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছে একাধিক রাজনৈতিক দল।
সংসদে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী প্রশাসক এবং উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করতে সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের কাছে চিঠি দিয়েছে।
কমিশনে পাঠানো চিঠিতে জামায়াত উল্লেখ করে, ‘একটি বিধান যোগ করতে হবে যাতে বলা থাকবে—স্থানীয় সরকার সংস্থায় নিযুক্ত যেকোনো প্রশাসক বা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষভুক্ত সংস্থায় কর্মরত যেকোনো ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।’
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও একই ধরনের দাবি জানিয়েছে। দলটির মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান টাইমস’কে বলেন, ‘একজন প্রশাসককে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেওয়ার অর্থ হলো তাদের আগেই বিজয়ী ঘোষণা করা। তারা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে নির্বাচনে অংশ নেবেন, যা অনিবার্যভাবেই নির্বাচনকে বিতর্কিত করবে। অনেকেই ইতিমধ্যে প্রশাসকের দায়িত্বে থেকেই আগাম প্রচার-প্রচারণা শুরু করে দিয়েছেন।’
দলটি আরও কঠোর বিধিনিষেধের পক্ষে জোর দাবি তুলে ধরে প্রশাসকদের পদত্যাগের পর পরবর্তী তিন বছর পর্যন্ত নির্বাচনে লড়ার সুযোগ বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘আমরা চাই, যিনি প্রশাসকের পদ থেকে পদত্যাগ করবেন, তিনি যেন পরবর্তী তিন বছরের জন্য যেকোনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অযোগ্য থাকেন।’
তবে এই প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছেন বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তার মতে, এটি কার্যকর হলে তা শুধু বিএনপিকেই আঘাত করবে।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘বর্তমানে অনেক বিএনপি নেতা ও কর্মী প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই আইন পাস হলে তা সরাসরি বিএনপিকে লক্ষ্য করেই করা হবে। বর্তমানে এই ধরণের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই, তাই এখন হুট করে এমন নিয়ম আনা হলে তা হবে পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত।’


