আগামী সেপ্টেম্বরে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। নয়া দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় এ শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণের বিষয়টি ভেবে দেখছে বাংলাদেশ।
এই সফরে যাবেন কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভারত সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সুযোগ নিশ্চিত হতে চান তারেক রহমান।
ভারতের পাঠানো এই আমন্ত্রণটি ঢাকার জন্য দুই দেশের টানাপোড়েনের সম্পর্ক সতর্কতার সঙ্গে পুনর্গঠন করার একটি সুযোগ এনে দিয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দেশের ভেতরের রাজনৈতিক সমীকরণ এবং বড় কোনো ফলপ্রসূ দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হবে কি না—সে অনিশ্চয়তা বড় ভূমিকা রাখছে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ভারত এই আমন্ত্রণটি দুটি দেশের সম্পর্কের কারণে পাঠায়নি। পাঠিয়েছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনৈতিক সহযোগিতাবিষয়ক জোট বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে।
ঢাকার কূটনীতিকরা মনে করছেন, ভারতের মূল উদ্দেশ্য অমীমাংসিত দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলো এড়িয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বলা।
প্রধানমন্ত্রী এই সফরে যাবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বুধবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মো. খলিলুর রহমান এ কথা জানিয়ে বলেন, ‘সিদ্ধান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানিয়ে দেওয়া হবে।’
একই দিনে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে ভারতের নতুন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী আশা প্রকাশ করেন, এই সফর দ্রুতই হবে।
ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। আশা করি অদূর ভবিষ্যতেই তা হবে। আমরা এ নিয়ে খুবই আশাবাদী।’
কূটনৈতিক ভারসাম্যের নীতিতে ঢাকা
কর্মকর্তাদের মতে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক—উভয় ধরনের গুরুত্ব রয়েছে। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুটি দেশের সম্পর্কের অবনতি হয়। তাই রাজনৈতিক কারণে এখন ভারত সফর একটি সংবেদনশীল বিষয়।
আবার আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিমসটেক জোটের প্রতি বাংলাদেশের অনীহা প্রকাশ পেতে পারে। উল্লেখ্য, এই জোটের প্রধান কার্যালয় ঢাকায় অবস্থিত এবং বাংলাদেশ বর্তমানে এর সভাপতির দায়িত্বে রয়েছে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সম্মেলনে গেলে প্রধানমন্ত্রী বেশ কয়েকজন আঞ্চলিক নেতার সঙ্গে কুশল বিনিময়ের সুযোগ পাবেন। তবে সম্মেলনে অনেক দেশের প্রধান অংশ নেবেন। তাই সেখানে বাংলাদেশ আলাদা করে বেশি নজর পাবে না। আবার টানা সূচির কারণে ভারতের সঙ্গে আলাদা করে বিস্তারিত আলোচনার সময়ও থাকবে না।
সম্মেলন শুরু হতে বাকি মাত্র পাঁচ সপ্তাহ। এত কম সময়ে বড় কোনো দ্বিপক্ষীয় সফরের প্রস্তুতি নেওয়া বেশ কঠিন।
সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা
সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন থাকলেও, বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশই নিজ নিজ স্বার্থে ধীরে ধীরে সম্পর্ক ভালো করার চেষ্টা করছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানান, বাংলাদেশ ও ভারত সমান মর্যাদা, পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে নতুন করে সম্পর্ক গড়তে কাজ করছে। তিনি বলেন, এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার প্রধান দর্শন ‘বাংলাদেশ প্রথম’।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেন, দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে কিছু অমীমাংসিত সমস্যা আছে। তবে সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নিতে হলে এই সমস্যাগুলোর সমাধান প্রয়োজন–সেটি উভয় পক্ষই বুঝতে পারছে।
তিনি নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ের নাম না বললেও কূটনীতিকরা বলছেন, দুই দেশই এখন প্রকাশ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি এড়িয়ে দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করছে।
গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সীমিত সুযোগ
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. সুফিউর রহমান বলেন, এই সম্মেলনে বড় কোনো দ্বিপক্ষীয় সাফল্যের আশা না করাই ভালো।
তিনি বলেন, ‘সম্মেলনের ফাঁকে সংক্ষিপ্ত বৈঠকে বড় কোনো সমস্যা সমাধানের সুযোগ থাকে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে একটি আঞ্চলিক জোটের প্রধান হিসেবে আমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছে। তাই আলোচনার মূল বিষয় থাকবে আঞ্চলিক সহযোগিতা, দ্বিপক্ষীয় সমস্যা নয়।’
তার মতে, প্রধানমন্ত্রী সম্মেলনে গেলে অমীমাংসিত ইস্যুতে কোনো বড় সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা কম। আবার না গেলেও জোটের প্রতি আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানামুখী ভুল বার্তা বা অহেতুক জল্পনা-কল্পনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সুফিউর রহমানের মতে, অমীমাংসিত সব সমস্যা সমাধানের জন্য শেষ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ সফরের পরিবেশ তৈরি করতে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন খাতভিত্তিক পর্যাপ্ত আলোচনার প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় সফর জরুরি। অন্য একটি বড় সম্মেলনের ফাঁকে সংক্ষিপ্ত বৈঠকে জটিল সমস্যা নিয়ে কোনো আলোচনার আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।’
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ঢাকার সম্ভাব্য কূটনৈতিক লাভ, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ এবং আঞ্চলিক প্রভাব সতর্কতার সঙ্গে মেপে দেখা উচিত।


