প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও সীমা লঙ্ঘন: দ্বিমুখী তদন্তের মুখে ডাকসু

প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও সীমা লঙ্ঘন: দ্বিমুখী তদন্তের মুখে ডাকসু
ফাইল ফটো
Advertisement
Advertisement

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ৩৯ দফার লোভনীয় ইশতেহার দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভোট টেনেছিল ইসলামী ছাত্রশিবির। তবে নির্বাচিত হয়ে মেয়াদের শেষ দিকে এসে প্রতিশ্রুতি না রাখা এবং ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগে এখন তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে তারা। একই সঙ্গে ডাকসুর গঠনতন্ত্র না মানার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

প্রশাসনের তোয়াক্কা না করে মনগড়া স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান, হকারদের মারধর, বিতর্কিত ব্যক্তিদের ছবি টাঙানো, অনুমতি ছাড়া শিক্ষকদের মূল্যায়নের ওয়েবসাইট খোলা এবং পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকা সত্ত্বেও হল ও মসজিদে এসি বসানোর মতো একের পর এক নিয়মবহির্ভূত কাজ করেছে শিবির পরিচালিত এই ডাকসু।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, ক্যাম্পাসে কোনো ‘সমান্তরাল প্রশাসন’ বা মনগড়া শাসন মেনে নেওয়া হবে না। নিয়ম ভাঙলে কঠিন শাস্তি পেতে হবে।

এ বিষয়ে টাইমসকে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর বলেন, ‘ভোটের আগে ডাকসু নেতারা ক্ষমতার বাইরে গিয়ে নানান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আর জেতার পর এমন সব কাজ করেছেন যা তাদের এক্তিয়ারেই পড়ে না। ছাত্র সংসদ যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন-কানুন ও মূল ধারা থেকেই বিচ্যুত হয়ে গেছে।’

শুধু তা-ই নয়, ডাকসুর খরচাপাতি নিয়েও উঠেছে নানান প্রশ্ন। নেতারা দাবি করছেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া বরাদ্দের চেয়ে ১০০ গুণেরও বেশি টাকা তারা খরচ করেছেন। কিন্তু এই বিশাল অঙ্কের টাকার কোনো সঠিক হিসাব বা নিয়মকানুন মানা হয়নি।

অবাক করার বিষয় হলো, ডাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এই বাইরের ফান্ড ও খরচের ব্যাপারে কিছুই জানেন না।

অথচ ডাকসুর নিয়ম অনুযায়ী, অর্থ দেখাশোনা, খরচ অনুমোদন এবং অডিটের মূল দায়িত্ব কোষাধ্যক্ষের। অধ্যাপক জাহাঙ্গীর চৌধুরী টাইমসকে নিশ্চিত করেছেন, কোনো অনুদান বা প্রকল্পের বিষয়ে ডাকসু থেকে তাকে আগেভাগে কিছুই জানানো হয়নি।

ডাকসুর আসলে কাজ কী

ডাকসুর গঠনতন্ত্রে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সুরক্ষায় ৯টি প্রধান কাজের কথা বলা আছে। যেমন—কমনরুম ও ইনডোর গেমসের দেখভাল করা, প্রতিদিনের পত্রিকা জোগানো, বার্ষিক ম্যাগাজিন প্রকাশ করা এবং সভাপতি ও কমিটির সম্মতিতে অন্যান্য বইপত্র ছাপানো।

এ ছাড়া বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বক্তৃতা ও সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্বও ডাকসুর।

প্রতিবছর বক্তৃতা, আবৃত্তি, রচনা ও খেলার প্রতিযোগিতার আয়োজন করাও তাদের কাজ, যা প্রয়োজনে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও বাড়ানো যায়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিনিধি পাঠানো বা বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা এবং উপাচার্যের অনুমতি নিয়ে সমাজসেবামূলক কাজ করাও ডাকসুর মূল দায়িত্বের অংশ।

কিন্তু কাজের কাজ না করায় চরম ক্ষুব্ধ সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফ হোসেন টাইমসকে বলেন, ‘ডাকসু তাদের মূল কাজ না করে দলীয় রাজনীতি আর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে মেতে ছিল। ঘন ঘন রাজনৈতিক সংবাদ সম্মেলন করা বা কোনো নির্দিষ্ট আদর্শের পেছনে ছোটা ডাকসুর কাজ হতে পারে না।’

একই সুর পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার কবিরের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা বা সঠিক নেতৃত্ব তৈরির ব্যাপারে ডাকসুর কোনো আগ্রহই ছিল না।’

আরও পড়ুন

বিতর্কিত যত কাজ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ধরে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে ‘জুলাই মেমোরিয়াল’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু ডাকসু তা মানেনি। তারা প্রশাসনিক অনুমতি ছাড়াই কলা ভবনের সামনে ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে আলাদা একটি স্মৃতিস্তম্ভ বানিয়ে ফেলে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, ডাকসুর যেকোনো সিদ্ধান্ত উপাচার্যের মতামত মেনে হতে হয়।

এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ সাফাই গেয়ে বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন মিটিংয়ে বিষয়টি তুলেছিলাম, উপাচার্য তো মানা করেননি। বিশেষ কোনো নিয়ম থাকলে প্রশাসন আগে আমাদের জানায়নি কেন?’

বিতর্ক আরও বাড়ে যখন ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি টাঙানো হয়। এই ইসরামী ছাত্র সংঘই স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে ইসলামী ছাত্র শিবির নামে পুনরায় আত্মপ্রকাশ করে।

অধ্যাপক তারিক মনজুর একে নিয়মের স্পষ্ট লঙ্ঘন উল্লেখ করে বলেন, ‘ডাকসুর নিয়মেই আছে সব কাজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের আলোকে হতে হবে। এখানে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের কোনো সুযোগ নেই।’

মেয়াদের শেষের দিকে শিক্ষকমূল্যায়নের জন্য একটি অননুমোদিত ওয়েবসাইট চালু করে নতুন বিতর্ক তৈরি করে ডাকসু।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই ওয়েবসাইটকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। তারা জানিয়েছে, শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম আছে এবং অনুমতি ছাড়া কারও তথ্য প্রকাশ করা অপরাধ। ডাকসুর জিএস ফরহাদ অবশ্য দাবি করেন, প্রশাসনিক বিলম্বের কারণেই তারা এই উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রশাসন চাইলে এটি চালু রাখতে পারে, না হয় তারা বন্ধ করে দেবেন।

একইভাবে, কেন্দ্রীয় মসজিদ ও হলের রিডিং রুমে অনেকগুলো এসি কেনা হলেও মূল বিদ্যুৎ লাইনের সক্ষমতা না থাকায় সেগুলো চালানোই যায়নি, ফেলে রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া কার্জন হলের ঐতিহাসিক মুসা খাঁ মসজিদ সংস্কারে প্রায় ৩ কোটি টাকা খরচের দাবিও করেছে ডাকসু।

অন্যদিকে, ডাকসুর শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত আচরণ নিয়েও বিতর্ক থামেনি। ভিপি সাদিক কায়েম জাতীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে লড়াইয়ের ঘোষণা দেন। শিবিরের প্যানেল থেকে জেতা সদস্য সর্বমিত্র চাকমা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের হকারদের মারধর এবং খেলার মাঠে বহিরাগতদের শারীরিক শাস্তি দিয়ে ক্ষোভের জন্ম দেন।

সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জোবায়েরের বিরুদ্ধে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক এ কে এম জামাল উদ্দিনকে হেনস্তা এবং ক্যাম্পাসের বাইরে অননুমোদিত ‘অভিযান’ চালানোর ভিডিও প্রকাশ্যে আসে।

আর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ একটি তামাক কোম্পানির স্পন্সরে ক্যাম্পাসে কনসার্ট আয়োজন করে সমালোচিত হন।

এসব অনিয়মের বিষয়ে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আল মুজাদ্দেদ আলফেছানী টাইমসকে বলেন, ‘এখতিয়ার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো তদন্তে আমার নেতৃত্বে একটি কমিটি কাজ করছে।’

তিনি আরও জানান, ‘শিক্ষাক্রম ও শিক্ষক-সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তে উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালামের নেতৃত্বে আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।’

খরচের হিসাবে অস্পষ্টতা

গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বরাদ্দ ছিল মাত্র ৩৫ লাখ টাকা। কিন্তু তারা ৩৫ থেকে ৪০ কোটি টাকার কাজ করেছেন। বাকি টাকা নাকি এসেছে নানা অনুদান থেকে।

কায়েমের দাবি, শহীদ ড. মোর্তজা মেডিকেল সেন্টার আধুনিকীকরণে ৩ কোটি, কেন্দ্রীয় মসজিদে সাড়ে ৩ কোটি এবং ছাত্রী জিমনেশিয়ামে ৬৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা ও মশা নিধনে খরচ হয় ৩২ লাখ টাকা।

এ ছাড়া জরাজীর্ণ হল সংস্কারে ৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা তোলা হয় এবং খেলার মাঠের কাজের জন্য ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) দেওয়া ২ কোটি টাকার চেক প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হয়।

কোষাধ্যক্ষকে কেন এসব আর্থিক হিসেব থেকে দূরে রাখা হলো—জানতে চাইলে ডাকসু সদস্য মো. শাহিনুর রহমান মূল প্রশ্ন এড়িয়ে বলেন, ‘স্পন্সররা সরাসরি বিক্রেতাদের টাকা দিয়েছে।’

তিনি দাবি করেন, ‘আমরা শুধু মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছি। টাকা আমাদের হাত হয়ে যায়নি।’ তবে অফিশিয়াল ৩৫ লাখ টাকার অডিট শেষ হয়েছে এবং কয়েক দিনের মধ্যে বাইরের অডিট রিপোর্টও দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad