রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নেতা ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মীদের হামলায় আহত বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেছেন। অন্যদিকে, তাদের ওপর আক্রমণকারীরা এখনো বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আহত এই দুই শিক্ষার্থীকে পুলিশের হাতে তুলে দিলে পুলিশ তাদেরকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়। যদিও তাদের বিরুদ্ধে ঠিক কী অভিযোগ তা স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি।
কারাগারে পাঠানো দুই শিক্ষার্থী হলেন ইতিহাস বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. আনাস এবং সংস্কৃতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান।
রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে একদল কর্মী এই দুজনকে মারধর করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনার সময় আম্মারের হাতে বেলচা ছিল এবং তিনি আনাসকে মাটিতে পুঁতে ফেলার হুমকি দেন।
প্রকাশ্যে এই হামলার ঘটনা ঘটলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
প্রক্টর মাহবুবুর রহমান টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যাদের হামলা চালানোর ঘটনা প্রকাশ্যে দেখা গেছে, তাদের চিহ্নিত করতে কেন তদন্ত কমিটির প্রয়োজন—আর তদন্ত কমিটির রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা না করেই প্রশাসন কেন আহতদের নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে ধরে নিল, সে বিষয়ে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
হামলাকারীদের দাবি, ওই দুই শিক্ষার্থীর ফেসবুক মেসেঞ্জার অ্যাকাউন্টে ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন পোস্ট পাওয়া গেছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগকে বিতাড়িত করার পর গত প্রায় দুই বছর ধরে এই দুই শিক্ষার্থী কোনো অভিযোগ ছাড়াই ক্যাম্পাসে অবস্থান করছিলেন। এতদিন তাদের বিরুদ্ধে এমন কোনো অভিযোগ না উঠলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও এখন তাদের ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবেই গণ্য করছে।
মোবাইল ফোন তল্লাশি করে আনাসের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পর্কিত পোস্ট পাওয়ার পর আম্মার তাকে ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ তোলেন।
এ ঘটনা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। হামলাকারীদের শাস্তির দাবিতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ক্যাম্পাসে মানববন্ধনের আয়োজন করে।
অভিযোগ সম্পর্কে পুলিশ অস্পষ্ট
পুলিশ দুই শিক্ষার্থীকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করার পর আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।
তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেননি।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) গাজীউর রহমান টাইমস’কে জানান, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগে আবুল হাসান ও আনাস আহমেদ নামে দুই শিক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে।
তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ের ঘটনার সূত্র ধরে দায়ের করা একটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তাদের সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে শাহ মখদুম থানা পুলিশ। সেই মামলাতেই তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।’
মামলায় তাদের বিরুদ্ধে ঠিক কী অভিযোগ রয়েছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেননি।
শাহ মখদুম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কবির হোসেনও অভিযোগের বিষয়টি স্পষ্ট করতে ব্যর্থ হন। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার মুখস্থ নেই। আমি নতুন যোগ দিয়েছি, তাই বিস্তারিত বলতে পারছি না।’
ডিউটি অফিসার এই তথ্য দিতে পারবেন কি না—জানতে চাইলে তিনি উত্তর দেন, ‘তিনিও দিতে পারবেন না।’
সহিংসতার সূচনা যেভাবে
ঘটনার সূত্রপাত হয় রোববার রাতে। এক শিক্ষার্থী প্রক্টর অফিসে গিয়ে অভিযোগ করেন, আগ্নেয়াস্ত্রের মুখে ভয় দেখিয়ে অন্য একজনকে প্রেমের সম্পর্কে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়েছে।
অভিযুক্ত শিক্ষার্থী মহসিন আলমের অভিভাবক হিসেবে পরিচয়ে আনাস সেখানে যান। পরদিন প্রক্টর অভিযোগকারী ও অভিযুক্তকে নিয়ে এক বৈঠকে বসেন। আনাস সেই বৈঠকে উপস্থিত হলে আম্মার ও তার সঙ্গীরা তাকে থাপ্পড় মারেন এবং মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আনাসকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও প্রক্টর প্রথমে তাকে চলে যাওয়ার অনুমতি দেন।
পরবর্তীতে আম্মার ও শিবির নেতারা অভিযোগ করেন, আনাস ও তার সহযোগীরা রাকসু কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে এর তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক নাজমুস সাকিবকে আহত করেছেন।
এরপর আনাস ও তার সহযোগীরা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের রিডিং রুমে আশ্রয় নিলে আম্মারের নেতৃত্বে শিবির কর্মীরা সেখানে গিয়ে তাদের আবারও মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, আহত শিক্ষার্থীদের অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময়ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের সামনেই তাদের পুনরায় মারধর করা হয়। পরবর্তীতে আহতদের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
আক্রান্তদের কেন পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হলো আর হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কেন তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলো না—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রক্টর মাহবুবুর রহমান জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
তিনি বলেন, ‘কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে অভিযুক্ত সবার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রশাসন কোন তদন্ত ছাড়াই কীভাবে আনাসকে ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে গণ্য করল, অথচ প্রকাশ্যে হামলার ঘটনায় ব্যবস্থা নিতে তদন্তের প্রয়োজন হলো কেন—জানতে চাইলে প্রক্টর বলেন, ‘তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল। বাকিটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রমাণ করবে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘যদি হামলার ঘটনায় মামলা করতে হয়, তবে তা প্রক্টর অফিস থেকেই করা হবে।’
বিচার চেয়েছে ছাত্রদল
বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতারা আহত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার বিচার দাবি করেন।
বিক্ষোভকারীরা হামলাকারীদের ছাত্রত্ব বাতিল এবং ১০ দিনের মধ্যে তাদের বিচারে মুখোমুখি করার দাবি জানান।
পাশাপাশি তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত রাকসু প্রতিনিধিদের পদ থেকে অব্যাহতি ও তদন্তপূর্বক বহিষ্কার এবং পুরো ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানান।
সংগঠনটির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহি রাজাকার ও আল-বদরের দোসরদের বিরুদ্ধে ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার চেষ্টার অভিযোগ তোলেন।
তিনি বলেন, ‘যারা ১৯৭১ সালে ধর্মীয় বিভাজন তৈরি করেছিল এবং হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টানদের হত্যা করেছিল, তারাই ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে।’
ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি শাকিলুর রহমান সোহাগ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে রাকসুর ভিপি ও শিবির নেতা মুস্তাকুর রহমান জাহিদের মন্তব্যের সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, ‘কারো কোনো সংবাদের প্রতিবেদন পছন্দ না-ই হতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়া, ভয় দেখানো কিংবা তাদের ওপর ব্যক্তিগত আক্রমণ চালানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’


