সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ ব্যবহারে মারাত্মক মানসিক ও সামাজিক ঝুঁকিতে পড়ছে দেশের শিশু-কিশোররা। হিংসাত্মক কনটেন্ট, আসক্তি ও সাইবার অপরাধের পাশাপাশি টিকটকসহ নানা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গ্যাং কালচার ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে তারা।
রাজধানীর পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের বাসিন্দা সুশান্ত রায় সম্প্রতি তার ১১ বছরের ছেলের ফোনে মেসেঞ্জার গ্রুপে বন্ধুদের শেয়ার করা প্রাপ্তবয়স্ক ও স্পর্শকাতর ভিডিও দেখে স্তম্ভিত হয়ে যান। বাধ্য হয়ে তিনি ছেলের ফোন থেকে সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মুছে দেন।
অন্যদিকে কুমিল্লায় ১৩ বছরের কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম টিকটকের মাধ্যমে কিশোর অপরাধীদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। এ ধরনের একের পর এক অপ্রীতিকর ঘটনা বাংলাদেশে শিশুদের সামাজিকমাধ্যম ব্যবহার এবং অভিভাবকদের নজরদারির অভাবের চিত্র সামনে আনছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশুদের সামাজিকমাধ্যম ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও বাংলাদেশে এখনো এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট বয়সসীমা বা আইনি সুরক্ষা বলয় গড়ে ওঠেনি। প্রচলিত শিশু আইন, ২০১৩ কিংবা সাইবার সুরক্ষা আইনেও শিশুদের বয়সভিত্তিক নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থা নেই।
২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৬ কোটি সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী রয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ। এর একটি বড় অংশই তরুণ ও কিশোর-কিশোরী। সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে থাকা সহিংস, আক্রমণাত্মক ও যৌন উত্তেজনামূলক কনটেন্ট শিশুদের মানসিক বিকাশ ব্যাহত করছে, যার ফলে তাদের মাঝে সহিংসতা, পড়াশোনায় অমনোযোগিতা এবং অকাল যৌন আসক্তি বাড়ছে।
গত আগস্টে ঢাকার হাজারীবাগের ১৩ বছরের এক কিশোরী টিকটকের মাধ্যমে পরিচয়ের পর বিয়ে, শারীরিক নির্যাতন ও অকালে সন্তান ধারণের পর শ্বশুর বাড়ির লোকজন সেই সন্তানকে কেড়ে নেওয়ার ঘটনার শিকার হয়।
ইউনিসেফের ২০২৫ সালের যুব জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ২৯ হাজার উত্তরদাতার মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই সামাজিকমাধ্যমে অপতথ্য ও ভুয়া তথ্যকে মানসিক চাপের প্রধান কারণ বলে চিহ্নিত করেছেন। ইউনিসেফ বাংলাদেশ চাইল্ড প্রোটেকশনের প্রধান ন্যাটালি ম্যাককলি জানান, শিশুদের স্ক্রিন টাইম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুপযুক্ত কনটেন্ট ও অনলাইন অপরাধীদের ঝুঁকিও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
অপরাধের মাধ্যম হিসেবেও এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহৃত হচ্ছে। পুলিশের এলিট ফোর্স এসআরবির তথ্যানুযায়ী, গত ৬ বছরে গ্রেপ্তার হওয়া ১ হাজার ১২৬ জন কিশোর অপরাধীর মোবাইল বিশ্লেষণ করে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টিকটক ও অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সংঘটিত বিভিন্ন গ্যাং কার্যক্রম ও যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ‘টিকটক পার্টি’র নামে জুয়া, মাদক ও নারী সংক্রান্ত অপরাধেও শিশুরা জড়িয়ে পড়ছে।
চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা এ পরিস্থিতিকে মারাত্মক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকট হিসেবে দেখছেন। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সালাহউদ্দিন কাউসার বিপ্লব টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ইন্টারনেট আসক্তি মস্তিষ্কে ডোপামিনের ক্ষরণ বাড়ায়। ফলে আসক্ত শিশুরা বাস্তব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং পরিবারের কাছ থেকেও দূরে সরে যায়।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বিষয়টিকে মাদকাসক্তির সঙ্গে তুলনা করে জানান, নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অভাবে তরুণদের চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা নষ্ট হচ্ছে।
এদিকে কেবল কনটেন্ট দেখা নয়, শিশুরা নিজেরাও কনটেন্ট তৈরি করে উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মে দিচ্ছে। শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সাংবাদিক শাহনাজ শারমিন টাইমসকে বলেন, ‘সহজ সমাধান হিসেবে শুধু ক্ষতিকর সাইট বা লিংক ব্লক করে আধুনিক যুগে শিশুদের সুরক্ষিত রাখা অসম্ভব। শিশুদের তৈরি করা এসব ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট দীর্ঘমেয়াদে তাদের স্থায়ী ক্ষতির কারণ হচ্ছে।’
পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কঠোর আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে নির্দিষ্ট ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইন ভঙ্গ করলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে ৫৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় ২০২৬ সাল থেকে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
গ্রিস, পর্তুগাল, ফ্রান্স, চীন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলার বয়সসীমা নির্ধারণ ও অভিভাবকের সম্মতিতে তা খোলার কঠোর নিয়ম রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রস্তাব করা হয়েছে ‘ইইউ কিডস অ্যাক্ট’। এতে ১৩ বছরের কম বয়সীদের সামাজিকমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ, ১৩-১৪ বছর বয়সীদের অভিভাবক-নিয়ন্ত্রিত সীমিত অ্যাকাউন্ট এবং ১৫ বছর থেকে নিজস্ব অ্যাকাউন্টের কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাংলাদেশেও সম্প্রতি ১৬ বছর পর্যন্ত শিশুদের সামাজিকমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে সরকারকে আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তবে বয়স যাচাইকরণ বা বিদেশি প্ল্যাটফর্মগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার কোনো কার্যকর কাঠামো এখনো নেই।
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সসীমা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাংলাদেশেও এ বিষয়ে দ্রুত আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন।’
আন্তর্জাতিক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের চাইল্ড প্রটেকশন অ্যান্ড চাইল্ড রাইটস গভর্নেন্সের প্রধান আবদুল্লাহ আল মামুন টাইমসকে বলেন, ‘রাষ্ট্রের চেয়েও ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব যেন শক্তিশালী। আমাদের দেশের আইনে যেটা নিষিদ্ধ, প্ল্যাটফর্মে সেটার ভিডিও বা ছবি দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু ফেসবুক সেখানে ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’
শিশুদেরকে সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত রাখতে হবে বলে মত দেয় তিনি বলেন, ‘নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তার বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পেয়েছে, সেটা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। নীতি নির্ধারকরা আসলে জানেন কি না, শিশুরা কত ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে এবং সেগুলো বিশ্বব্যাপী কীভাবে দেখা হচ্ছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।’
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির টাইমসকে বলেন, ‘শুধুমাত্র নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলেই হবে না। শিশু ও অভিভাবকদের সচেতন করার পাশাপাশি তাদের শারীরিক খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের সুযোগ বাড়াতে হবে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ বা সাইট ব্লক করে নয়; বরং অবিলম্বে জাতীয় নীতি প্রণয়ন, অভিভাবকীয় সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশুদের জন্য সুস্থ বিনোদন ও খেলাধুলার সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি।


