ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের সভা-সমাবেশে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে মুসলিম ও বাংলাদেশ বিরোধী বক্তৃতা। ঐতিহাসিকভাবে অসাম্প্রদায়িক হিসেবে পরিচিত রাজ্যটিতে এবার আগ্রাসী কায়দায় মুসলমান ও বাংলাদেশ নিয়ে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা চালাচ্ছে বিজেপি। আগামী ২৩ ও ২৯ এপ্রিল এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ।
বিজেপি নেতাদের বক্তব্যে মুসলিম এবং কথিত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুটি এখন প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা বিভিন্ন জনসভায় নির্বাচনের পর নথিপত্রহীনদের বের করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন।
পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করে বলছেন, এ ধরণের বক্তৃতা ভারতের অন্যতম ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যময় রাজ্যটিতে সাম্প্রদায়িক বিভেদকে আরও গভীর করার ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশলের লক্ষ্য হলো হিন্দু ভোটকে একীভূত করা। তবে তারা সতর্ক করে বলছেন, এটি সামাজিক সংহতির বিনিময়ে করা হচ্ছে। এই ধরনের বক্তৃতা কেবল ভারতীয় নাগরিকদের একটি অংশকে কলঙ্কিত করে না বরং ভয় ও বর্জনের পরিবেশ তৈরি করে।
সংখ্যালঘু অংশগ্রহণ নিয়ে উদ্বেগ
ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগে নির্বাচনী পরিবেশ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সিস্টেমেটিক ইন্টিগ্রেশন অ্যান্ড রিভিউ বা এসআইআর প্রক্রিয়া মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোতে অসমভাবে প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে মুসলিম ভোটারদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এর পাশাপাশি প্রস্তাবিত জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি নিয়ে চলমান বিতর্ক বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। জনসংখ্যার একটি অংশকে বারবার অবৈধ অভিবাসনের সাথে যুক্ত করে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়া এবং নাগরিকত্ব হারানোর ভয়ে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের ঘটনা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘুদের অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে টার্গেট করে নজরদারি চালানোর ধারণা এবং উস্কানিমূলক প্রচারণার ভাষা এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে যেখানে ভোটাররা নিজেদের প্রান্তিক বলে মনে করছেন।
সামাজিক কাঠামোর ওপর প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা ভারতের সামাজিক কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। রাজনৈতিক পক্ষগুলো ধর্মীয় এবং জাতিগত ভিত্তিতে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা সাজাচ্ছে। এতে দেশের গণতন্ত্রের ঐতিহ্যগত অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
সমালোচকরা মনে করেন, ঘৃণামূলক বক্তব্য কেবল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বরং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতাকেও দুর্বল করে। পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে বিবেচিত একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া জনমনে অনাস্থা তৈরি করতে পারে এবং সামাজিক বিভাজনকে আরও গভীর করতে পারে।
বেলিংক্যাট নামের একটি সংস্থার গবেষণা অনুসারে বিজেপি আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের মতো বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাজ্যে মুসলিম ও বাংলাদেশ বিরোধী ভিডিও প্রচারণা চালিয়েছে। রাজ্যগুলোর বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে গত বছরের ডিসেম্বরে এসব ভিডিও প্রচার করা হয়।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন
নির্বাচনী প্রচারণায় বাংলাদেশ বিরোধী বক্তব্যের প্রভাব দেশের অভ্যন্তরীণ সীমানা ছাড়িয়ে ঢাকাতেও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজনৈতিক বক্তৃতায় ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ’ এর বারবার উল্লেখ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর চাপ সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি করছে। ঢাকা থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো না হলেও বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, এমন নেতিবাচক প্রচার অব্যাহত থাকলে তা কূটনৈতিক অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে।
আপাতদৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন এমন বিষয় কতটা বৃহত্তর দ্বিপাক্ষিক উদ্বেগের কারণ হতে পারে তা অতীতের বেশ কিছু ঘটনায় দেখা গেছে। আইপিএলে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানের অংশগ্রহণ নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক উভয় দেশের জনমনে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল।
এছাড়া সীমান্তে ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা এই ধরনের প্রচারণার কারণে জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক কৌশল
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনী প্রচারণার ধরন দেখে মনে হচ্ছে তারা ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়ভিত্তিক মেরুকরণের মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদী নির্বাচনী ফায়দা হাসিল করতে চাইছে। তবে সমালোচকরা সতর্ক করে বলেন, এই কৌশলের অভ্যন্তরীণ এবং আঞ্চলিক উভয় ক্ষেত্রেই অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফল হতে পারে। এই কৌশলটি হয়তো নির্দিষ্ট ভোটার শ্রেণিকে একীভূত করতে সাহায্য করবে। তবে এটি সংখ্যালঘুদের বিচ্ছিন্ন করার এবং গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ঝুঁকি রাখে। একইসাথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পর্ককেও চাপের মুখে ফেলতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের এই ঘটনাবলি কেবল রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না বরং এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির ওপর স্থায়ী ছাপ রেখে যেতে পারে।


