ভারী বৃষ্টিতে পানিবন্দী বিভিন্ন জনপদ

ভারী বৃষ্টিতে পানিবন্দী বিভিন্ন জনপদ
ফেনীর বিভিন্ন স্থানের নদীর বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

ভারী বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে ফেনীর বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে গেছে। এতে ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলার ৩০টিরও বেশি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। অন্যদিকে, লঘু চাপের প্রভাবে নোয়াখালীতে সোমবার রাত থেকে শুরু হওয়া মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার কারণে জেলার হাতিয়া ছাড়া বাকি আটটি উপজেলা ও পৌর এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।

এ ছাড়া উপকূলীয় জনপদ পটুয়াখালী, বরগুনা, বরিশাল,সাতক্ষীরাসহ কয়েকটি জেলায় ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে কক্সবাজার জেলার টেকনাফের কিছু অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন হাজারো মানুষ।

ফেনী: টাইমস অব বাংলাদেশের ফেনী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলার পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলার অনেক বাস-বাড়ি ও ব‍্যবসা প্রতিষ্ঠানের বৈদ্যুতিক মিটার এবং সাব-স্টেশন পানিতে তলিয়ে গেছে।

জেলার বিদ‍্যুত বিতরণ বিভাগ ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ‍্য মতে, দুর্ঘটনা এড়াতে অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। অবস্থার অবনতি হলে এর পরিধি আরও বাড়তে পারে। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকবে।

ফেনীর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ‍্য মতে, পরশুরামের মুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা ১২ দশমিক ৫৫ মিটার। মঙ্গলবার রাত ১০টায় সবশেষ ১৩ দশমিক ৯২ মিটার উচ্চতায় পানির প্রবাহ রেকর্ড করা হয়। মঙ্গলবার সকাল ৭টায় নদীটির পানি প্রবাহ ছিল ৭ মিটার উচ্চতায়। রাত ১০টা পর্যন্ত গত ১৫ ঘণ্টায় মুহুরী নদীর পানি বেড়েছে ৬ দশমিক ৯২ মিটার।

আবহাওয়া অফিসের তথ্য মতে, সোমবার রাত ১২টা থেকে মঙ্গলবার রাত ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে সর্বোচ্চ ফেনীতে ৪৪১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়, যা চলতি বর্ষা মৌসুমের সর্ব্বোচ রেকর্ড।

পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মুহুরী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পরশুরাম উপজেলার জঙ্গলঘোনায় দুটি স্থানে ভাঙন দেখা গেছে। এ ছাড়া অলকায় তিনটি, শালধর এলাকায় একটি, ফুলগাজী উপজেলার উত্তর শ্রীপুর এলাকায় একটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সিলোনিয়া নদীর পরশুরামের গদানগর এলাকায় একটি ও ফুলগাজীর দেড়পড়া এলাকার দুটি স্থানে বাঁধ ভেঙে গেছে।

এ ছাড়া কহুয়া নদীর পরশুরাম উপজেলার সাতকুচিয়ায় দুটি, বেড়াবাড়িয়ায় একটি ও ফুলগাজী উপজেলার দৌলতপুর এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের একটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন হাজারো পরিবার ।

পরশুরামের চিথলিয়া এলাকার বাসিন্দা জাকিয়া আক্তার বলেন, ‘রাত ৮টার দিকে পানি ঘরে ঢুকতে শুরু করে। একপর্যায়ে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে অন্য জায়গায় আশ্রয় নিয়েছি। ২০২৪ সালের বন্যায়ও সব হারিয়েছি। ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই আবারও স্বপ্ন ডুবেছে পানিতে।’

মির্জানগর ইউনিয়নের পূর্ব রাঙামাটিয়া এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পাউবোর কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে বল্লামুখা বাঁধের প্রবেশ মুখটি বন্ধ করা যায়নি। সময়মতো বাঁধের এ স্থানটি বন্ধ করা হলে পানি ঢোকার সুযোগ ছিল না। প্রতিবছরই কিছু মানুষের দায়সারা কাজের কারণে বড় একটি জনগোষ্ঠীর ভোগান্তি পোহাতে হয়।’

পরশুরামের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুর রহমান বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে থেকে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। মানুষজন এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে আসছেন না। বিভিন্ন পয়েন্টে ভাঙনের ফলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।’

আরও পড়ুন

নোয়াখালী: বন্যার পানিতে ভেসে গেছে জেরার মাছের ঘের ও ফসলি জমি। ক্ষতির শঙ্কায় আমনের বীজতলা ও বিভিন্ন শাকসবজির ক্ষেত। বিভিন্ন সড়ক পানির নিচে চলে যাওয়ায়, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জলাবদ্ধতা ও কিছু শ্রেণি কক্ষে পানি ডুকে যাওয়ায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো ইতোমধ্যে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক খন্দকার ইশতিয়াক আহমেদ।

বুধবার সকালে জেলার মাইজদী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত সবশেষ ২৪ ঘন্টায় মাইজদীতে ১৯১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

সোমবার থেকে শুরু হওয়া ভারী বৃষ্টিপাত মঙ্গলবার রাতে কিছুটা কমেছিল। কিন্তু বুধবার ভোর থেকে আবারও একটানা ভারী বর্ষণ শুরু হয়। যার ফলে জেলা বেশির ভাগ এলাকার সড়ক, অলিগলি, পাড়া মহল্লা পানির নিচে। পানি ডুকে পড়েছে মানুষের বাড়িতেও। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন জেলার কয়েক হাজার মানুষ।

জেলা শহর মাইজদীতে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, ডিবি অফিস, রেকর্ড রুম, জজ কোর্ট, বিদ্যুৎ অফিসসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিসের সামনে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকটি অফিসের নিচতলায় পানি ডুকে পড়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবাপ্রত্যাশীরা।

টানা বর্ষণে শহরের প্রেসক্লাব সড়ক, রেড ক্রিসেন্ট, টাউন হল মোড়, ইসলামিয়া সড়ক, ডিসি সড়ক, মহিলা কলেজ সড়ক, জেল খানা সড়ক, নোয়াখালী সরকারি কলেজ সড়ক, মাইজদী বাজার সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।

পৌরবাসী বলছে, পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাব ও পানি নিষ্কাশনে খালা, নালা ও জলাশয়গুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় শহরবাসীর এ দুর্ভোগ। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকে দায়ী করছেন অনেকে।

এ ছাড়া জেলার কবিরহাট, কোম্পানীগঞ্জ, সুবর্ণচর, সেনবাগ, বেগমগঞ্জ, সোনাইমুড়ী ও চাটখিল উপজেলার নিচু এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে সকাল থেকে ওইসব এলাকায় চলাচলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয়রা।

একটানা ভারী বর্ষণ ও জোয়ারে পানি বন্দী হয়ে পড়েছে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মুছাপুর ও চরএলাহী ইউনিয়নের বেশিরভাগ ওয়ার্ডের লোকজন। এলাকার বেশিরভাগ বাড়িঘর পানিতে নিমজ্জিত।

এ ছাড়া উপকূলীয় জনপদ পটুয়াখালী, বরগুনা, বরিশাল,সাতক্ষীরাসহ কয়েকটি জেলায় ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। কক্সবাজারের টেকনাফের কিছু অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে।

সাতক্ষীরা: আমাদের  সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, আবহাওয়া অফিস বলেছে, দুপুর ১২টা পর্যন্ত সাতক্ষীরায় মোট ২৭২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হয়েছে ১০২ মিলিমিটার। অতিবৃষ্টির কারণে পৌরসভার অধিকাংশ ওয়ার্ডে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।

জেলার কামালনগর, ইটাগাছা, পলাশপোলের মধুমোল্লারডাঙি, মেহেদীবাগ, রসুলপুর, বদ্দিপুর কলোনি, রইচপুর, মধ্য কাটিয়া, রথখোলা, রাজারবাগান, গদাইবিল, মাঠপাড়া, পার-মাছখোলা ও পুরাতন সাতক্ষীরার মতো নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা পৌরসভার ৭ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের। ভেসে গেছে মাছের ঘের।

বরিশাল: টাইমস অব বাংলাদেশের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, আবহাওয়া অফিস বলেছে,মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘন্টায় রেকর্ড ১৬০ মিমি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এটি মৌসুমি বায়ুর কারণে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হলেও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ধরা পড়েছে।

চার দিন ধরে বরিশাল ও আশেপাশে চালু রয়েছে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ এবং বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া লঘুচাপের প্রভাবে। এর ফলেই শহরের নবগ্রাম রোড, বগুড়া রোড, অক্সফোর্ড মিশন রোডসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও অলিগলিতে ব্যাপক জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে বরিশাল নগরীর বিভিন্ন এলাকা।

বুধবার সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। বিশেষ করে নগরীর প্রাণকেন্দ্র বটতলা থেকে চৌমাথা সড়ক, বগুড়া রোডের একাংশ, রাজাবাহাদুর সড়কসহ অলিগলিতে জলাবদ্ধতা দেখা গেছে।

কক্সবাজার: আমাদের জেলা প্রতিনিধি জানান, জেলার টেকনাফ উপজেলায় কয়েকদিনের টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে ডুবে গেছে কয়েকশ’ ঘরবাড়ি। দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

জেলায় ধসের শঙ্কায় পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করেছে উপজেলা প্রশাসন। পানিবন্দি পরিবারগুলোকে শুকনো খাবার দেওয়া হয়েছে।

টেকনাফ উপজেলায় টানা কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে সেন্টমাটিন, হ্নীলা, হোয়াইক্যং, বাহারছড়া, সাবরাং ও সদর ইউনিয়নের অন্তত ৭০টি গ্রামের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad