নৌকাবাইচ গ্রামবাংলার মানুষের কাছে শুধু একটি খেলা নয়, এটি ইতিহাস, ঐতিহ্য, আবেগ ও গৌরবের অংশ। পাবনার বিল-নদীবেষ্টিত জনপদেও নৌকাবাইচ ঘিরে রয়েছে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও উৎসবের আমেজ।
সেই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার চান্দাই গ্রামের প্রতিটি পরিবারের স্বেচ্ছা অনুদানে তৈরি হচ্ছে ৮২ হাত দীর্ঘ বিশাল আকৃতির বাইচের নৌকা ‘চান্দাই জনতা এক্সপ্রেস’। নৌকাটি বিভিন্ন নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন নৌকাটির কাজ আগামী এক মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
সরেজমিনে চান্দাই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, খোলা জায়গায় বিশাল কাঠামো নিয়ে এগিয়ে চলছে নৌকা তৈরির কাজ। রোদ-বৃষ্টি থেকে কারিগরদের রক্ষায় টানানো হয়েছে ছাউনি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দক্ষ কারিগরেরা শাল, গর্জন, সেগুন ও চাপালিশ কাঠ কাটা, আগুনের তাপে বাঁকানো, জোড়া লাগানোসহ নৌকার কাঠামো তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
নৌকাটি হবে ৮২ হাত লম্বা। দুই প্রান্তে ১৫ হাত করে গোলা এবং মাঝের অংশ হবে ৬৭ হাত। নৌকার স্থায়িত্ব ও গতি নিশ্চিত করতে কাঠের পাশাপাশি লোহার পেরেক, বোল্ট, বিশেষ আঠা ও জলরোধী প্রলেপ ব্যবহার করা হচ্ছে। নৌকা নির্মাণে ব্যবহৃত কাঠ সংগ্রহ করা হয়েছে গাজীপুর থেকে।
‘নৌকা বানানো শুধু পেশা নয়, শিল্প’
নৌকা নির্মাণে নিয়োজিত প্রধান কারিগর সুকুমার চন্দ্র সূত্রধর বলেন, তার বাবা প্রায় ৮০ বছর এই পেশায় ছিলেন। বাবার কাছ থেকেই তিনি নৌকা তৈরির কাজ শিখেছেন। নিজে প্রায় ৫৫ বছর ধরে এ কাজ করছেন এবং এ পর্যন্ত প্রায় ১৫০টি বাইচের নৌকা তৈরি করেছেন।
সুকুমার চন্দ্র বলেন, ‘চলতি বছর ছয়টি নৌকার কাজ শেষ করে এখন চান্দাই জনতা এক্সপ্রেস তৈরি করছি। প্রতিটি কাঠ অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বসানো হচ্ছে। শ্রমিকদের এক মাসের মজুরি প্রায় আড়াই লাখ টাকা।’
তিনি বলেন, ‘বাইচের নৌকা তৈরির কাজ শুধু পেশা নয়, এটি একটি শিল্প। একটি ভালো নৌকা তৈরিতে অভিজ্ঞতা, ধৈর্য ও নিখুঁত কারিগরি দক্ষতা প্রয়োজন।’
বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার লক্ষ্য
নৌকার প্রধান মাঝি আবু সাঈদ মোল্লা বলেন, ১৯৮০ সাল থেকে তিনি বাইচের নৌকার মাঝি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে তার বয়স ৬০ বছর। দীর্ঘ সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন ও রানারআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।
তিনি বলেন, ‘নতুন চান্দাই জনতা এক্সপ্রেস নিয়েও আমরা বড় বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চাই। আমাদের লক্ষ্য শুধু বিজয় নয়, চান্দাই গ্রামের ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করা এবং আটঘরিয়ার নাম দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া।’
নৌকার বাইচেল রশিদ মুন্সি বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকেই তাঁদের গ্রামে নৌকাবাইচের ঐতিহ্য চলে আসছে। সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতেই গ্রামের মানুষ এবারও একসঙ্গে কাজ করছেন।
তিনি বলেন, ‘নতুন নৌকাটি নির্মাণে গ্রামের প্রতিটি পরিবারের আর্থিক সহযোগিতা রয়েছে। আমরা চাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই ঐতিহ্য ধরে রাখুক।’
‘জনতা’ নামের পেছনে গ্রামের মানুষের ঐক্য
নৌকা পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য আব্দুল মান্নান বলেন, চান্দাই গ্রামের নৌকাবাইচের ইতিহাস অনেক পুরোনো। নতুন নৌকাটি তাদের কাছে শুধু প্রতিযোগিতার বাহন নয়; এটি গ্রামের ঐক্য, সংস্কৃতি ও গৌরবের প্রতীক।
তিনি বলেন, ‘গ্রামের প্রতিটি পরিবারের স্বেচ্ছা অনুদানে চান্দাই জনতা এক্সপ্রেস নির্মাণ করা হচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নৌকাটি সাফল্য অর্জন করবে এবং আটঘরিয়ার সুনাম আরও বাড়াবে।’
কমিটির আরেক সদস্য আসাদুল মেম্বার জানান, নৌকাটি নির্মাণে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একক অর্থায়ন নেই। গ্রামের প্রতিটি পরিবার নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ দিয়েছে। এ কারণেই নৌকার নামের সঙ্গে ‘জনতা’ শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে।
ঐতিহ্য ধরে রাখতে নতুন উদ্যোগ
ক্রীড়াপ্রেমী মহসিন আলী বলেন, চান্দাই গ্রামের নৌকা অতীতেও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নৌকাবাইচে অংশ নিয়ে একাধিকবার চ্যাম্পিয়ন ও রানারআপ হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতেই এবার উন্নত কারিগরি দক্ষতা ও আধুনিক নকশায় নতুন নৌকাটি নির্মাণ করা হচ্ছে।
গ্রামবাসীর মতে, নৌকাবাইচ শুধু বিনোদন নয়, এটি বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে নতুন প্রজন্মকেও নৌকাবাইচের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তরুণদের আগ্রহ ও প্রবীণদের অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে চান্দাই গ্রামের নৌকাবাইচের ঐতিহ্য আরও শক্তিশালী হবে বলে তাদের প্রত্যাশা।
নির্মাণকাজ শেষ হলে পানিতে নামিয়ে নৌকাটির পরীক্ষামূলক বাইচ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে ‘চান্দাই জনতা এক্সপ্রেস’।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, অতীতের সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে নতুন এই নৌকা আবারও বিজয়ের পাল তুলে পাবনার আটঘরিয়ার নাম দেশজুড়ে উজ্জ্বল করবে।


