সাভারে একাধিক অপহরণকারী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব চক্র বিভিন্ন কৌশলে শিশু-কিশোর, শিক্ষার্থী ও সহজ-সরল মানুষকে অপহরণ করে ভয়ভীতি দেখিয়ে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করছে। মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসা কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এ ধরনের তথ্য জানা গেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার পৌর এলাকার ডগরমোড়ার বাসা থেকে কোচিংয়ে যাচ্ছিল সাভারের জাতীয় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সংস্থা শপিং কমপ্লেক্স মার্কেটের ব্যবসায়ী মুকুল আলীর ছেলে মাহাদির আল মুবিন। সে সাভারের বিপিএটিসি স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
সাভার ভ্যাট অফিসের কাছে কোচিং সেন্টারে যাওয়ার পথে আরএস টাওয়ারের সামনে পাঁচ থেকে ছয়জন যুবক তাকে নানা ভয়ভীতি দেখায়। তারা মুবিনকে বলে, ‘ভিডিও দেখে তোমাকে শনাক্ত করেছি। তুমি আমাদের ছেলেদের মেরেছ। চল, তোমাকে ভিডিও দেখাব।’
এ কথা বলে জোরপূর্বক তাকে একটি অপেক্ষমাণ অটোরিকশায় তুলে নেয় তারা। পরে প্রায় ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের রাজাঘাট এলাকায় ধলেশ্বরী নদীর তীরে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে মুবিনের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে তার বাবা মুকুল আলীকে ফোন দেয় চক্রটি। তারা জানায়, তার ছেলে তাদের গাড়ি ভাঙচুর করেছে। তাকে ছেড়ে দিতে ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। দ্রুত টাকা না দিলে ছেলের যেকোনো ক্ষতি হতে পারে বলেও হুমকি দেওয়া হয়।
ছেলের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে মুকুল আলী প্রথমে ১০ হাজার টাকা চক্রটির দেওয়া বিকাশ নম্বরে পাঠিয়ে দেন। বাকি টাকা সংগ্রহের জন্য সময় চান তিনি। পরে বিষয়টি আঁচ করতে পেরে সাভার মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। একপর্যায়ে সন্ধ্যার দিকে মুবিনকে ছেড়ে দেয় অপহরণকারীরা।
অটোরিকশাচালককেও অপহরণের অভিযোগ
প্রায় একই এলাকায় গত বুধবার পৌর এলাকার শাহী বাগের অটোরিকশাচালক কবিরুলকে ভাড়া দেওয়ার কথা বলে তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের হরিণধরা এলাকায় নিয়ে যায় চার থেকে পাঁচ যুবক।
পরে তাকে অটোরিকশাচোর অপবাদ দিয়ে ভয়ভীতি দেখানো হয়। একপর্যায়ে তাঁর পরিবারের কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে ৫ হাজার টাকা নেওয়ার পর কবিরুলকে ছেড়ে দেয় চক্রটি।
কবিরুলের ভাই মনিরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, টাকা আদায়ের জন্য তাঁর ভাইকে বেদম মারধর করা হয়েছে।
প্রাইভেটকারে তুলে দুই লাখ টাকা আদায়
অন্য একটি ঘটনায় ব্যাংক কলোনির বি-ব্লকের বাসিন্দা ও একটি পোশাক কারখানার কর্মকর্তা আরিফুর রহমানকে প্রাইভেটকারে তুলে অপহরণের অভিযোগ উঠেছে চারজনের বিরুদ্ধে।
গত সোমবার ঢাকায় যাওয়ার জন্য পাকিজা এলাকায় বাসের অপেক্ষায় ছিলেন আরিফুর রহমান। এ সময় একটি প্রাইভেটকার তার সামনে এসে থামে। গাড়ির চালক ও পাশে বসা ব্যক্তি তাকে ২০০ টাকা ভাড়ায় মতিঝিল পর্যন্ত যাওয়ার প্রস্তাব দেন।
সরল বিশ্বাসে গাড়িতে ওঠার পর আরও দুইজন এসে তার দুই পাশে বসেন। আরিফুর রহমানের ভাষ্য, চালক দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে তাকে মিরপুরের টোলারবাগের দিকে নিয়ে যান। পথে আগ্নেয়াস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাকে নড়াচড়া না করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
টোলারবাগে একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে নিয়ে তার কাছ থেকে ৪৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়। পরে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে আরও প্রায় দুই লাখ টাকা আদায় করে চক্রটি। রাত ১১টার দিকে তাকে চোখ বাঁধা অবস্থায় সাভারের বলিয়ারপুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের একটি নির্জন স্থানে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় তারা।
অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন
ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনার মধ্যে শুধু স্কুলছাত্র মুবিনের বাবা মুকুল আলী সাভার মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। তবে তার অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ তদন্ত না করে অভিযোগ প্রত্যাহারের জন্য সাদা কাগজে লিখিত নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
অভিযোগ প্রত্যাহারের বিষয়ে ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর নাজিম উদ্দীন বলেন, যেহেতু মামলার জন্য অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল, তাই পুলিশ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারত। এভাবে অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেওয়া হলে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হতে পারে।
ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস পুলিশের
এ বিষয়ে সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, ঘটনাগুলো তার জানা নেই। তবে অপরাধের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের ব্যস্ততম সময়েও নানা কৌশলে মানুষকে ফাঁদে ফেলছে এসব চক্র। অপহরণের পর দ্রুত বিকাশের মাধ্যমে টাকা আদায় করে ভুক্তভোগীদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে অনেক পরিবার হয়রানি ও নিরাপত্তার আশঙ্কায় থানায় অভিযোগ করতেও অনাগ্রহী।
তাদের দাবি, এ ধরনের ঘটনা বন্ধে শুধু অভিযোগ নেওয়া নয়, প্রতিটি ঘটনার দ্রুত তদন্ত, অপহরণকারী চক্র শনাক্ত এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।


