ফিট হওয়ার স্বপ্নের আড়ালে বড় বিপদ

 ফিট হওয়ার স্বপ্নের আড়ালে বড় বিপদ
ইলাস্ট্রেশন: টাইমস
Advertisement
Advertisement

সুঠাম ও শক্তিশালী শরীরের আশায় প্রতিবছর দেশের পাড়া-মহল্লার জিমে ভর্তি হন হাজার হাজার তরুণ। তবে অনেকের ফিট হওয়ার সেই স্বপ্ন জিমে নয়, শেষ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। ভুল পদ্ধতিতে ব্যায়াম করার কারণে অনেকেই চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন।

দেশে ব্যায়ামাগারের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও সেগুলোর ওপর সরকারের কোনো কার্যকর নজরদারি নেই। অদক্ষ ট্রেইনারদের ভুল পরামর্শ, সক্ষমতার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত ওজন তোলার প্রতিযোগিতা এবং কোনো ধরনের জাতীয় সনদপত্রের বাধ্যবাধকতা না থাকায় তরুণরা নিজেদের অজান্তেই পঙ্গুত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।

এমনই একজন ভুক্তভোগী নাজমুল আলম। ফেসবুক ও ইউটিউবে শরীরচর্চার ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি জিমে ভর্তি হয়েছিলেন। শুরুর দিকে সবকিছু ঠিকঠাক চললেও একদিন লেগ প্রেস ব্যায়াম করার সময় হঠাৎ মেরুদণ্ডে মারাত্মক আঘাত পান। এতে তার মেরুদণ্ডের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।

জিমের কিছু নিয়মিত ব্যায়ামকারী তরুণ দ্রুত শরীর গড়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাকে অতিরিক্ত ওজন তুলতে উৎসাহিত করেছিলেন। তাদের কথায় প্ররোচিত হয়ে নিজের শক্তির অতিরিক্ত ওজন তুলতে গিয়েই ঘটে এই বিপত্তি।

ওই এক দুর্ঘটনাতেই তার জিম জীবন থমকে যায়। আজ তিনি সাধারণ কোনো কেনাকাটার ব্যাগও বহন করতে পারেন না। চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী, তার আর কখনোই জিম করা বা ভারী ওজন তোলার সুযোগ নেই। কারণ সামান্য ভুলের কারণে পঙ্গুত্ব পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

নাজমুলের মতো একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন এনামুল হক হৃদয় নামের আরেক তরুণ। জিমে গিয়ে সক্ষমতা প্রমাণের জেরে তিনি কাঁধে মারাত্মক চোট পান। ফিটনেস বিশেষজ্ঞদের ভাষায় একে বলা হয় ‘ইগো লিফটিং’ বা অহংকারবশত ক্ষমতার চেয়ে বেশি ওজন তোলার প্রবণতা। জিমের পরিবেশের প্রভাবে পড়ে ক্ষমতার বাইরে ‘ল্যাটারাল রেইজ’ ব্যায়াম করতে গিয়ে তার কাঁধের হাড় স্থানচ্যুত হয়। এর ফলে টানা সাত মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর বর্তমানে তিনি কিছুটা সামলে উঠেছেন।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ফিটনেস ট্রেইনার ইফতেখারুল ইসলামের মতে, এ ধরনের মারাত্মক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ কারিগরি জ্ঞানের ঘাটতি। ব্যায়ামকারীদের পাশাপাশি ট্রেইনারদের মধ্যেও এই জ্ঞানের ব্যাপক অভাব রয়েছে। সঠিক ট্রেইনার শুরুতেই নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করবেন এবং ওজন সামলাতে না পারলে কীভাবে বারবেল বা ডাম্বেল নিরাপদে ফেলে দিতে হয় তা শেখাবেন। পাশাপাশি ব্যায়ামের সময় শরীরের ভঙ্গি ঠিক থাকছে কি না সেদিকেও নজর রাখবেন। না বুঝে অন্যকে অন্ধভাবে অনুকরণ করার প্রবণতা মারাত্মক ঝুঁকি ডেকে আনে।

তিনি আরও জানান, ভুল টেকনিকের কারণে মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়ে অনেক সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারও চিরতরে ধ্বংস হয়ে গেছে।

অন্যদিকে, ফিটনেস বিশেষজ্ঞ ও জিম ব্যবসায়ী রুসলান হোসেন জানান, দেশে দক্ষ ও প্রাতিষ্ঠানিক সনদপ্রাপ্ত ট্রেইনারের তীব্র সংকট রয়েছে। অধিকাংশ মানুষ কোনো ক্লায়েন্টকে ব্যায়াম দেওয়ার আগে তার পূর্বের শারীরিক সমস্যা পরীক্ষা করেন না। কেবল ভালো শারীরিক গঠন থাকলেই কেউ ভালো ট্রেইনার হতে পারেন না, এর জন্য প্রয়োজন স্পোর্টস সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা।

বাংলাদেশে জিমনেসিয়ামগুলোকে সাধারণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারি লাইসেন্স দেওয়া হলেও এগুলো তদারকির জন্য কোনো নির্দিষ্ট সরকারি বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা নেই। ফলে দেশে বর্তমানে ঠিক কতগুলো জিম চালু রয়েছে, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশ বডি বিল্ডিং ফেডারেশনের (বিবিএফ) সাধারণ সম্পাদক মো. কামরুজ্জামান জানান, ট্রেইনারদের জন্য দেশে এখনও বিশেষায়িত কোনো প্রশিক্ষণ একাডেমি গড়ে ওঠেনি। সরকার যদি এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়, তবে তারা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা পরিচালনায় প্রস্তুত।

নিজের সুস্থ জীবন হারানোর পর নাজমুল এখন সবাইকে সতর্ক হওয়ার আকুল আহ্বান জানাচ্ছেন। অনুমোদিত ও সার্টিফাইড ট্রেইনার ছাড়া কেবল জিমের সিনিয়রদের পরামর্শে ব্যায়াম না করার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।

বিশেষজ্ঞ ও ভুক্তভোগীদের স্পষ্ট বার্তা–যথাযথ সতর্কতা, অভিজ্ঞ ট্রেইনারের সঠিক দিকনির্দেশনা এবং সরকারি নজরদারি নিশ্চিত করা না গেলে, ফিট হওয়ার এই অন্ধ দৌড়ে বহু তরুণকে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad