জাতীয় মাছ ইলিশ এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। দিন দিন কমছে আহরণ। ছোট হচ্ছে আকার। বাড়ছে দাম।
নব্বইয়ের দশক থেকে ইলিশ নিয়ে বাংলাদেশে যে উন্মাদনা ছিল, তাও ম্লান হচ্ছে। ভরা মৌসুমেও দাম এত বেশি যে অনেক ক্রেতার ইলিশ কেনার সামর্থ্য নেই।
খুচরা বিক্রেতা, আড়তদার ও বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী দিনে ইলিশ আরও দুর্লভ হয়ে উঠতে পারে।
কারওয়ান বাজারের আড়তে মাছের দাম আশপাশের খুচরা বাজারের তুলনায় কম। ভরা মৌসুমে সেখানে এক কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৩ হাজার টাকায়।
৭০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম ২ হাজার টাকা। ছোট আকারের ইলিশ কিনতে কেজিতে গুনতে হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ টাকা।
আড়তদার জমির কুদ্দুস বলেন, ঘাট থেকেই বেশি দামে মাছ কিনতে হচ্ছে। তাই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে তাদেরও।
তিনি জানান, এবার ইলিশের সরবরাহ খুবই কম। এ সময়ে এত কম মাছ আগে দেখেননি তিনি। দাম কমার সম্ভাবনাও দেখছেন না।
ইলিশের রাজধানীখ্যাত চাঁদপুরের আড়তদার মো. মানিক চাঁদ বলেন, ‘এবার সরবরাহ গতবারের তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। জেলেদের জালেই মাছ উঠছে না।’
তিনি জানান, নদীতে এবার ইলিশের আকাল চলছে। চাঁদপুরে এক কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২ হাজার ৮০০ টাকায়।
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, ইলিশ আহরণ কমার ঘটনা হঠাৎ ঘটেনি। কয়েক বছর ধরে উৎপাদন নিম্নমুখী।
২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ আহরণ হয়েছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার টন। পরের অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও কমে হয় ৫ লাখ টন।
সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের হিসাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি। নতুন অর্থবছরের মাসভিত্তিক তথ্যও পাওয়া যায়নি।
অথচ ২০২২ সালের আগে দেশে ইলিশ আহরণের গ্রাফ ছিল ঊর্ধ্বমুখী।
ইলিশ রক্ষায় ২০২০ সালের জুলাইয়ে সরকার ২২৯ কোটি টাকার ছয় বছর মেয়াদি ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্প নেয়। লক্ষ্য ছিল উৎপাদন ৫৩ হাজার টন বাড়ানো এবং মাছের আকার বড় করা।
তবে প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও ফল নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। উৎপাদনের পাশাপাশি কমেছে ইলিশের আকারও।
ছয় বছর আগে একটি ইলিশের গড় ওজন ছিল ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ গ্রাম। এখন তা নেমে এসেছে ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রামে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশের আকার ছোট হয়ে যাওয়াই সংকটের বড় কারণ।
ইলিশের পেটে প্রথমবার ডিম আসে ৮ থেকে ৯ মাস বয়সে। তখন এর ওজন থাকে ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম। পূর্ণাঙ্গ ইলিশ হয়ে ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় দুই বছর।
অতিরিক্ত আহরণের চাপে প্রথম বছরের প্রজননকালেই অনেক ইলিশ জালে ধরা পড়ছে। বড় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে বাজারে ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বেশি দেখা গেলেও বড় ইলিশ এখন দুর্লভ।
আড়তদার জমির কুদ্দুসের মতে, তিন ধাপে ইলিশ নিধন হচ্ছে।
প্রথমে সূক্ষ্ম জালে ধরা পড়ে ছোট ইলিশের পোনা। স্থানীয়ভাবে এটি ‘চাপিলা’ নামে বিক্রি হয়।
বেঁচে যাওয়া মাছ পরে বড় ফাঁসের কারেন্ট জালে ধরা পড়ে। এরপরও যেসব জাটকা সাগরের দিকে যেতে পারে, সেগুলোর জন্য অপেক্ষা করে বড় ট্রলার ও নিষিদ্ধ বেহুন্দি জাল।
কুদ্দুস বলেন, ‘তিন ধাপ পেরিয়ে ইলিশের বড় হওয়ার সুযোগই থাকছে না।’
ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহর বক্তব্যও একই রকম। তিনি বলেন, ইলিশের মূল মজুত সাগরে। কিন্তু সরকারের সংরক্ষণ ও নজরদারি কার্যক্রম মূলত নদীকেন্দ্রিক। এপ্রিলের শেষ থেকে মে মাসে জাটকা নদী থেকে সাগরে চলে গেলে সেখানে অবাধে ধরা পড়ে।
বিশেষ করে নতুন ধরনের ট্রলিং বোটে মোটর ও ট্রল ডোর ব্যবহার করে বড় পরিসরে মাছ ধরা হচ্ছে। এতে ছোট মাছও ধরা পড়ছে। ইলিশের মজুতের ওপর এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।
মা ইলিশ রক্ষা, জাটকা সংরক্ষণ ও কম্বিং অপারেশনসহ সরকারের অধিকাংশ কার্যক্রম নদীকেন্দ্রিক। অথচ ইলিশের মূল মজুত সাগরে। তাই সাগরকেন্দ্রিক কার্যক্রম নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন মোল্লা এমদাদুল্যাহ।
নজরদারির ঘাটতির পেছনে রয়েছে সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। দেশের ২০ জেলায় ইলিশসমৃদ্ধ এলাকার বিস্তৃতি ৪০০ কিলোমিটার। স্পট রয়েছে ১৩৮টি। অথচ নদীতে অভিযান চালানোর জন্য বড় মেকানাইজড স্পিডবোট আছে মাত্র ১৯টি।
শরীয়তপুরের সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, ‘শক্তিশালী ইঞ্জিনের মাছ ধরার নৌযানগুলোকে সাধারণ নৌযান দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ফলে আইন থাকলেও মাঠপর্যায়ে তা কার্যকর করার সক্ষমতা সীমিত।’
নদীর নিজস্ব সংকটও বাড়ছে। পলি জমে চর জেগে ওঠায় ইলিশের চলাচলের পথ, নার্সারি গ্রাউন্ড ও প্রজনন ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ইলিশ গভীর জলের মাছ। পানির গভীরতা কমলে এর স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হয়। দূষণও বাড়ছে। মোহনা-সংলগ্ন অভয়াশ্রমের তীরে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের কারণে পানি দূষিত হচ্ছে। বুড়িগঙ্গার দূষিত পানি মিশে পদ্মা-মেঘনাও ইলিশের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক সামছুল আলম জানান, গত ১০ বছরে ইলিশ নিয়ে গবেষণার জন্য সরকারি কোনো তহবিল পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, ‘ইলিশের পরিবর্তনের ধরন বুঝতে জিনোম সংরক্ষণ প্রয়োজন ছিল। সেটিও কখনো করা হয়নি। ফলে হঠাৎ উৎপাদন কমার কারণ নিয়ে গবেষণা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’
তবে শরীয়তপুরের মৎস্য কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলছেন, ইলিশের প্রাচুর্য সারা বছর একই রকম থাকে না।
তিনি বলেন, ‘প্রজননের আগে সাগর থেকে নদীতে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ বাড়ে। আশ্বিনের ১৫ থেকে ২০ দিন আগে নদীতে ইলিশের প্রাচুর্য বাড়তে শুরু করতে পারে। তাই নির্দিষ্ট সময়ের কম আহরণ দিয়ে পুরো মৌসুমের চূড়ান্ত চিত্র নির্ধারণ করা যায় না।’


