বাংলাদেশের সর্বউত্তরের জেলা হিমালয় কন্যা পঞ্চগড়। ভারত সীমান্তঘেঁষা এই জেলা থেকেই শুরু জাতীয় সংসদের আসন বিন্যাস। পঞ্চগড় সদর, আটোয়ারী ও তেঁতুলিয়া উপজেলা নিয়ে জাতীয় সংসদের প্রথম আসন পঞ্চগড়-১। অতীতে বরাবরই এই আসনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। তবে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিগত ভোট নিয়ে সবসময়ই আলোচনায় ছিলেন জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপার সভাপতি শফিউল আলম প্রধান।
আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেই। সেই নির্বাচনী মাঠে বিএনপির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে এসেছেন তিনটি ছোট দলের বড় নেতা। তারা হলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির(এনসিপি) সারজিস আলম, জাগপা’র রাশেদ প্রধান ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির নাজমুল হক প্রধান। এখানে নির্বাচনের সমীকরণ কঠিন করে তুলেছেন এই তিন প্রার্থী।
বিএনপির ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত পঞ্চগড়-১ আসনে ১৯৯১ সালে নির্বাচিত হয়েছিলেন এই দলের ডাকসাইটে কেন্দ্রীয় নেতা মির্জা গোলাম হাফিজ। সেবার তিনি পেয়েছিলেন ৩৯.৮ শতাংশ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ প্রার্থীর ভোট ছিল ৩১.৫ শতাংশ। অন্যদিকে জাগপা সভাপতি শফিউল আলম পেয়েছিলেন প্রায় ১৫ শতাংশ ভোট। আসনটিতে জাতীয় পার্টির ভোটও কম নয়, সেবার তাদের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৯.৩ শতাংশ। জামায়াতে ইসলামী সেবার এই আসনে কোনো প্রার্থী দেয়নি।
১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে এই আসনে জয়ী হন বিএনপির ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার। তিনি পেয়েছিলেন ৩৫.৪ শতাংশ ভোট, নিকটতম আওয়ামী লীগ প্রার্থীর ভোট ছিল ২৯.৬ শতাংশ। এই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোট বেঁধে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে প্রার্থী জাগপার শফিউল আলম প্রধান পেয়েছিলেন প্রায় ২৩.৫ শতাংশ ভোট। আর এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া জামায়াতের ভোট ছিল ১০.১ শতাংশ।
পরের বার ২০০১ সালেও নির্বাচিত হন বিএনপি-জামায়াত জোটের ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, এবার তার ভোট ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে নিকটতম আওয়ামী লীগ প্রার্থী পেয়েছিলেন ৩৪.৩ শতাংশ ভোট। সেই নির্বাচনেও জাতীয় পার্টির জোট থেকে জাগপা প্রার্থী শফিউল আলম প্রধানের প্রাপ্ত ভোট ছিল ২৪.৮ শতাংশ। ২০০৮ সালের নির্বাচনে মহজোট করে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি। মহাজোটের প্রার্থী আওয়ামী লীগের মজাহারুল হক প্রধানের সঙ্গে আর পেরে ওঠেননি বিএনপি-জামায়াত জোটের জমিরউদ্দিন সরকার। এবারও তার ভোট ছিল ৪০.৪ শতাংশ। আর বিজয়ী প্রার্থী পেয়েছিলেন ৫৮.৭ শতাংশ ভোট।
২০১৮ সালের কুখ্যাত রাতের ভোটের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রার্থী ছিলেন ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমির। সেবার দেশের প্রায় সব আসনেই আগের রাতে ভোট হয়ে গেলেও পঞ্চগড়-১ আসনে ছিল ভিন্ন চিত্র। বাবার চেয়েও কিঞ্চিৎ বেশি ৪১.৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন নওশাদ জমির। আর বিজয়ী আওয়ামী লীগ প্রার্থীর ভোট ছিল ৫৪.২ শতাংশ। আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনেও বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন তিনি।
ছোট দলের বড় নেতা
বাবার মৃত্যুর পর ছোট দলের বড় নেতা হিসাবে ২০১৮ সালে প্রথমবারের মত নির্বাচনে অংশ নেন শফিউল আলম প্রধানের ছেলে জাগপার কেন্দ্রীয় মুখপাত্র রাশেদ প্রধান। তবে সেই কুখ্যাত ভোটে মাঠে পাত্তাই পাননি তিনি। তিনি অবশ্য পঞ্চগড়-২ আসনেও প্রচার চালাচ্ছেন।
তারও আগে এই আসনে ভোটের মাঠে নামেন আরেক ছোটদল বাংলাদেশ জাসদের নাজমুল হক প্রধান। ২০১৪ সালের বিরোধী দলবিহীন সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসাবে সংসদ সদস্য হন তিনি। পরের বার তাকে আর মনোনয়ন দেয়নি ১৪ দলীয় জোট। বরং সেবার প্রার্থীতা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে কয়েকজন নেতা জাসদ ভেঙে বাংলাদেশ জাসদ গঠন করেছেন। এই দলের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান।
আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পঞ্চগড়-১ আসনে মাঠে নেমেছেন আরেক ছোট দল এনসিপির উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম। তবে এই আসনে তার দলের তেমন কোনো প্রভাব নেই। এমনকি উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যক্তিগত ভোটও নেই। অবশ্য বরাবরই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার আশির্বাদ পেয়ে আসছেন তিনি।
এদিকে ১৯৯৬ সালের পর প্রথমবারের মত এই আসনে প্রার্থী দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। তাদের প্রার্থী জেলা আমির অধ্যাপক ইকবাল হোসাইন। তিনিও নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন বেশ আগেভাগে।
বিএনপির নওশাদ জমির আর জামায়াতের ইকবাল হোসাইনের সঙ্গে এবার মাঠে আছেন তিন ছোট দলের বড় নেতা সারজিস আলম, রাশেদ প্রধান ও নাজমুল হক প্রধান। বিএনপি বেশ কয়েকটি দলের সঙ্গে জোট করলেও জোটসঙ্গীদের পঞ্চগড়-১ আসনে মনোনয়নের দাবিদার কোনো প্রার্থী নেই। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করতে যাচ্ছে জাগপা। জামায়াত এই আসনটি রাশেদ প্রধানকে ছেড়ে দিলে তিনি হয়ে ওঠতে পারেন বিএনপির মাথা ব্যাথার বড় কারণ।


