প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর ঘটাতে পারে নতুন মোড়

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর ঘটাতে পারে নতুন মোড়
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: পিএমও
Advertisement
Advertisement

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর ঢাকা ও দিল্লির মধ্যকার সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে সমস্যার সমাধান করতে পারে। একই সঙ্গে এটি আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের সম্পর্কের গতিপথ কোন দিকে যাবে, তা-ও নির্ধারণ করে দিতে পারে।

ভারতের আমন্ত্রণে চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে এই সফর হতে পারে। সফরটি হলে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে মুখোমুখি আলোচনার একটি ভালো সুযোগ তৈরি হবে। এতে একে অপরের অগ্রাধিকার বোঝা সহজ হবে। এ ছাড়া ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার নতুন পথ মিলবে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই সফরের বড় প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, দেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ভারতে চলে যাওয়া শেখ হাসিনা এ বছরের ৫ আগস্ট একটি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে ফেরার কথা জানান। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে, তিনি ৫ থেকে ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরতে পারেন।

এ বিষয়ে জানা সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ সরকার যদি শেখ হাসিনার পর্যাপ্ত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে, তবে ভারত তার ফেরার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে রাজি আছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, বিএনপি শেখ হাসিনার দেশে ফেরায় কোনো বাধা দেবে না।

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেত্রী যদি দেশে আসতে চান, আসবেন। এতে বিএনপির কিছু বলার নেই। তার দেশে ফেরায় বিএনপির কোনো আপত্তি নেই। বরং আমরা চাই শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসুন। তবে আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে।’

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক থেকে হাসিনা ইস্যু আলাদা করা

তারেক রহমানের ভারত সফরের অন্যতম বড় সাফল্য হতে পারে দুই দেশের মূল সম্পর্ক থেকে ‘হাসিনা ইস্যু’কে আলাদা করে ফেলা।

ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় এক অস্বস্তির কারণ হয়ে আছে। ভারতের মাটিতে বসে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো নিয়ে বারবার আপত্তি জানিয়েছে ঢাকা। বিশেষ করে ৫ আগস্টের অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি বাংলাদেশ সরকারের যেসব সমালোচনা করেছেন, ঢাকা তা ভালোভাবে নেয়নি।

ঢাকা আগেই অনুরোধ করেছিল ভারত যেন তাকে ওই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে না দেয়। তবে ভারত সরকার অনুষ্ঠানটি থেকে নিজেদের দূরে রাখলেও তাকে অনুষ্ঠানে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেয়।

শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে যদি দুই দেশ একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে এবং তার ফেরার ব্যবস্থা নিয়ে ঢাকা আশ্বস্ত হয়, তবে এই বিষয়টি ধীরে ধীরে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলা বন্ধ করবে।

আরও পড়ুন

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ যদি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় এবং সব কিছু আইন মেনে হয়, তবে ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে প্রস্তুত। এমন একটি সমঝোতা হলে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বড় একটি রাজনৈতিক বাধা দূর হবে।

নিচ থেকে ওপরে নয়, ওপর থেকে নিচে

প্রস্তাবিত এই সফরটি সমস্যা সমাধানের পুরোনো কূটনৈতিক পথ থেকেও কিছুটা ব্যতিক্রম।

সাধারণত দেখা যায়, প্রথমে দুই দেশের কাজের বা প্রশাসনিক পর্যায়ের প্রতিনিধিরা বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেন। সব আলোচনা শেষে শীর্ষ দুই প্রধানমন্ত্রী তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা দেন।

তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, গত ছয় মাসে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে কোনো উল্লেখযোগ্য বৈঠকই হয়নি।

তাই এবার পদ্ধতিটি উল্টে যেতে পারে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী আগে বড় বড় বিষয়ে রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাবেন, তারপর নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানকে বিস্তারিত কাজ গুছিয়ে আনার নির্দেশ দেবেন।

ওপর থেকে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের পদ্ধতির কারণে জমে থাকা বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা দ্রুত এগোতে পারে।

টেবিলে থাকা আলোচ্য বিষয়সমূহ

পানি বণ্টন, নিরাপত্তা সহযোগিতা, জ্বালানি, বাণিজ্য ও যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে শীর্ষ নেতাদের সরাসরি মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে, তাই এটি নবায়নের আলোচনা দ্রুত শুরু করা দরকার। পাশাপাশি দীর্ঘদিন আটকে থাকা তিস্তার পানি বণ্টন ও নদীর অববাহিকাভিত্তিক সার্বিক ব্যবস্থাপনাও আলোচনায় থাকবে।

দুই দেশের সম্পর্কের আরেকটি জরুরি স্তম্ভ হলো নিরাপত্তা সহযোগিতা। দুটি দেশই উগ্রবাদের কারণে নিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই কেউই চায় না তাদের ভূখণ্ড একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো ক্ষতিকর কাজে ব্যবহার করা হোক।

ঢাকার জন্য জ্বালানি সহযোগিতা দিন দিন খুব জরুরি হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ভারতের কাছে সহায়তা চেয়েছে এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা প্রয়োজন।

বাণিজ্য ও যোগাযোগ বাড়াতে দুই দেশই দীর্ঘদিন ধরে একসাথে কাজ করছে, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক সুযোগ ও আঞ্চলিক যোগাযোগকে আরও সহজ করবে।

নতুন এক সূচনা?

এমন একটি সময়ে সফরটি হতে যাচ্ছে, যখন ঢাকা ও দিল্লি-উভয় পক্ষই বুঝতে পারছে যে দীর্ঘমেয়াদি টানাপোড়েন কারও জন্যই সুবিধাজনক নয়।

অর্থনীতি, জ্বালানি, নিরাপত্তা ও যোগাযোগের স্বার্থেই বাংলাদেশের জন্য তার বড় প্রতিবেশীর সঙ্গে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রয়োজন।

অন্যদিকে, ভারতেরও নিশ্চিত হওয়া দরকার যে বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল ও বন্ধুভাবাপন্ন প্রতিবেশী হিসেবে থাকবে। বাংলাদেশের ভূখণ্ড ভারত বা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। সব মিলিয়ে, তারেক-মোদি বৈঠক কেবল নিয়ম রক্ষার কোনো সাধারণ বৈঠক নাও হতে পারে।

উভয় পক্ষ যদি হাসিনা ইস্যুতে একটি সমাধান খুঁজে পায় এবং আগামী দিনে কীভাবে এক সঙ্গে কাজ করবে তার পথ ঠিক করতে পারে, তবে এই সফর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় শুরু করতে পারে।

এর প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতির ওপরও পড়বে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা স্পষ্ট হবে।

তাই দুই দেশের জন্যই এই সফরের গুরুত্ব কেবল কূটনীতির গণ্ডিতে আটকে নেই। ঢাকা ও দিল্লি কি বর্তমান অনাস্থার ভেতরেই আটকে থাকবে, নাকি একটি বাস্তবসম্মত ও পারস্পরিক লাভজনক সম্পর্কের দিকে এগিয়ে যাবে-এই সফর তা নির্ধারণ করে দিতে পারে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad