রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হামলার ঘটনায় প্রশাসন যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে।
এর আগেও এই ধরনের নানা ঘটনায় যে তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে, তারা প্রতিবেদন দিতে দীর্ঘ সময় লাগিয়েছে অথবা দেয়নি। আবার প্রতিবেদন দিলেও সেগুলো প্রকাশ করা হয়নি। আবার গত রোববার চার সংবাদকর্মীকে ছাত্রদল কর্মীদের বেধরক পেটানোর ঘটনায় সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ গায়েব করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে শহীদ জিয়াউর রহমান হল প্রশাসনের বিরুদ্ধে। আবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে মামলা করেছে, তাতে কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি।
অথচ সমালোচনার মুখে ছাত্রদল নিজেই তার দুই নেতাকে পদ থেকে এবং এক কর্মীর প্রাথমিক সদস্যপদ কেড়ে নিয়েছে, আরও ছয় জনকে কেন বরখাস্ত করা হবে না, সেই কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা তদন্তে সিন্ডিকেট সদস্য ও প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমকে আহ্বায়ক করে যে কমিটি করা হয়েছে, তাদেরকে আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন দর্শন বিভাগের অধ্যাপক মো. আরিফুল ইসলাম, ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এম আসাদুল হক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. আনিছুর রহমান এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের কাজী মামুন হায়দার।
আন্দোলনরত সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্তের রিপোর্ট পাব, এটাই আশা। এরপর প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী যে শাস্তির বিধান আছে, তা নিশ্চিত করা হবে। এরপর পরবর্তী তদন্তের জন্য সিন্ডিকেট সভা ডেকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা যে সিদ্ধান্ত নেব, সেটার ওপর আস্থা রাখুন।’
তদন্তে দোষী হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের প্রাথমিকভাবে বহিষ্কার ঘটনার পেছনে ইন্ধন ও উসকানিদাতাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর আস্থা না থাকার কথা জানিয়েছেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী শেখ শাহির আহমেদ।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘মামলা করার ক্ষেত্রেও প্রশাসন গড়িমসি করেছে। তাই আমাদের শঙ্কার জায়গাটা থেকেই যায়।’
জিয়াউর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী শাহপরান লিখন বলেন, ‘অতীতেও আমরা অনেক তদন্ত কমিটি গঠন হতে দেখেছি, কিন্তু সেসব কমিটির প্রতিবেদন জমা হয়নি। যে ঘটনায় ছাত্রদল তাদের নেতাকর্মীদের বহিষ্কার করেছে, সেখানে প্রশাসন এখনও তাদের অপরাধী হিসেবে স্বীকার করতে নারাজ।’
গত ২৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে এক শিক্ষার্থীকে ছাত্রলীগ আখ্যা দিয়ে পিটুনির ঘটনায় প্রশাসন যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল, তারা এখনো প্রতিবেদন দেয়নি। অথচ তুমুল সমালোচনার মধ্যে সে সময় এই কমিটিকে যথা সম্ভব দ্রুত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল।
সেই ঘটনার পুরোটাই সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে, মোবাইল ফোনেও ধারণ করা আছে অনেকের।
তারপরেও দুই মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কেন প্রতিবেদন পাওয়া গেল না–এই প্রশ্ন নিয়ে টানা দুই দিন কমিটির প্রধান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমকে পাওয়া যায়নি।
তদন্ত কমিটির সদস্য ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক মো. গোলাম ছাদিক বলেছেন, ‘এখনো প্রতিবেদন জমা পড়েনি, কাজ এখনো প্রক্রিয়াধীন।’
হামলাকারীদের বাঁচাতে চেয়েছেন প্রভোস্ট!
সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাটি ঘটেছে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে। সেখানকার সিসিটিভি ফুটেজে সব কিছু রেকর্ড হয়ে থাকার কথা। কিন্তু পরে ফুটেজে কিছুই পাওয়া যায়নি। অভিযোগ উঠেছে প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহবুবর রহমানের নির্দেশে সেই ফুটেজ মুছে দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনায় তীব্র সমালোচনার মুখে সোমবার রাত দেড়টার দিকে প্রাধ্যক্ষকে তাৎক্ষণিকভাবে অব্যাহতি দেওয়ার কথা জানিয়েছেন উপাচার্য।
ছাত্রদলের হামলায় আক্রান্ত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আরিফ উজ জামান কোরবান টাইমসকে বলেন, ‘আমরা অতীতেও এমন ডজন ডজন তদন্ত কমিটি গঠন হতে দেখেছি। কোনো এক অজানা কারণে এগুলো আলোর মুখ দেখে না। এবারও আমরা সন্দিহান এই তদন্ত কমিটি কতটুকু কাজ করতে পারবে।’
‘প্রায় ৬০০ আবাসিক শিক্ষার্থীর অভিভাবক তথা একজন হল প্রাধ্যক্ষ যেখানে দলীয় সন্ত্রাসীদের বাঁচাতে সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব করে দিতে পারেন, সেখানে প্রশাসনের কাকে বিশ্বাস করব সেই প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে,’ যোগ করেন তিনি।
অন্য যে প্রশ্নটি এখনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বিদ্ধ করেছে, সেটি হলো, কেন মামলায় কারও নাম দেওয়া হয়নি। শহীদ জিয়াউর রহমান হলের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. মনির হোসেন যে মামলা করেছে, তাতে তিনি ‘কতিপয় শিক্ষার্থীর’ কথা লিখেছেন।
অথচ ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি তদন্ত করে সোমবার রাতেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহসভাপতি আহসান হাবিব ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিব হাসানকে সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার করেছে। আরেক হামলাকারী বিশাল চক্রবর্তীকে প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
আরেক বিজ্ঞপ্তিতে সহ-সভাপতি তাকবীর আহমেদ ইমন, বুলবুল রহমান, শরিফুল ইসলাম, ফারুক হোসেন, সহদপ্তর সম্পাদক শাহারিয়ার আলম এবং ছাত্রনেতা সাজুকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


