ইন্দোনেশিয়ায় ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪৭ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া ভূমিকম্প ও পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকবার আফটারশকের কারণে শত শত ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিবিসির খবরে বলা হয়, স্থানীয় সময় শনিবার ভোর ৫টার কিছু আগে ফ্লোরেস দ্বীপে ভূমিকম্পটি আঘান হানে। ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূ-ভৌতিক সংস্থা জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের ১৫ কিলোমিটার গভীরে। সাধারণত ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল যত অগভীর হয়, ভূপৃষ্ঠে এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব তত বেশি হয়ে থাকে।
দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। বেশ কয়েকজন বিভিন্ন মাত্রায় আহত হয়েছেন। পূর্ব ইন্দোনেশিয়ার একই এলাকায় বেশ কয়েকটি শক্তিশালী আফটারশক অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে একটি ছিল ৬ দশমিক ১ মাত্রার। পরে পশ্চিম ইন্দোনেশিয়ার উত্তর সুমাত্রায় ৬ দশমিক ৪ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের ১৬৩ কিলোমিটার গভীরে।
মাউমেরে বন্দরে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, ফেরিতে ওঠার জন্য অপেক্ষারত যাত্রীদের ওপর টার্মিনাল ভবনের কংক্রিটের বড় বড় অংশ ভেঙে পড়ছে। একটি জাহাজের সঙ্গে যুক্ত ওঠানামার পথ বা গ্যাংওয়ে ধসে পড়লে কয়েকজন যাত্রী সাগরে ছিটকে পড়েন।
পূর্ব নুসা তেংগারা প্রদেশের সিক্কা এলাকার উপকূলবর্তী তালিবুরা গ্রামের বাসিন্দা আর্নল্ড ওয়েলিয়ান্তো জানান, “প্রচণ্ড শক্তিশালী কম্পনে” তার ঘুম ভেঙে যায়।
তিনি বলেন, “আমি আতঙ্কে জেগে উঠে সঙ্গে সঙ্গে আমার সন্তানের ঘরে যাই।” বিবিসিকে তিনি জানান, এরই মধ্যে অনেক মানুষ পাহাড়ের দিকে চলে গিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, “অন্য কিছু বাসিন্দা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, কারণ সমুদ্রের পানির উচ্চতাও কমে গিয়েছিল।”
তিনি আরও বলেন, “পানি বেশ কিছু সময় নিচু অবস্থায় ছিল। ফলে সবাই আতঙ্কিত হয়ে দৌড়াতে শুরু করেন। আমি কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে যাই।’’
ভূমিকম্পের পর সুনামির সতর্কতা জারি করা হলেও উল্লেখযোগ্যভাবে সমুদ্রের পানির উচ্চতা না বাড়ায় প্রাথমিক কম্পনের প্রায় তিন ঘণ্টা পর তা প্রত্যাহার করা হয়।
কর্তৃপক্ষ সুনামির সতর্কতা জারি করার পর মোটরসাইকেলে করে মানুষকে উপকূল থেকে ভেতরের দিকে সরে যেতে দেখা যায়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, প্রায় ২ হাজার মানুষ নিজেরাই নিরাপদ স্থানে সরে গেছেন বা অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, মাংগারাই প্রদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি।
সংস্থার তথ্যমতে, ওই প্রদেশে ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া পূর্ব মাংগারাই প্রদেশে ১৭ জন, সিক্কা প্রদেশে তিনজন এবং এনগাদা, এনদে ও পশ্চিম মাংগারাই প্রদেশে অন্তত একজন করে নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া অন্তত দুজন গুরুতর এবং ১১ জন সামান্য আহত হয়েছেন।
ওয়েলিয়ান্তো জানান, আফটারশক অব্যাহত থাকায় তালিবুরার অনেক বাসিন্দা বাড়িতে ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছেন এবং বাইরে অবস্থান করছেন।
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের পশ্চিমে অবস্থিত রুতেং শহরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ইউলিয়ান জুইতা একালিয়া জানান, আরও কম্পনের আশঙ্কায় তিনি নিজের চুলা বাইরে নিয়ে রান্না করছেন।
বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, “আমি কখনো এত বড় ভূমিকম্প অনুভব করিনি। মনে হচ্ছিল আমরা যেন ট্রাম্পোলিনের ওপর আছি—ভীষণ ভয়ংকর ছিল।”
দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকায় ভূমিকম্পে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে সময় লাগবে। প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, ১৫০টির বেশি বাড়ি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া কয়েক ডজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বেশ কয়েকটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, উপাসনালয়, কার্যালয় ও অন্যান্য সরকারি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ত্রাণ সহায়তা পাঠানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিএনপিবি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাটি মানুষকে শান্ত থাকার পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকা এবং ক্ষতিগ্রস্ত বা ধসের ঝুঁকিতে থাকা স্থাপনা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
ইন্দোনেশিয়া ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতপ্রবণ দেশ। দেশটি তিনটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে প্রায়ই ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ দেখা যায়।


